ভাবতে ভাবতে মাথা গরম হয়ে গেল সঞ্জয়ের। গলাও শুকিয়ে কাঠ। তাই কুঁজো থেকে গেলাসে জল গড়িয়ে গলায় ঢালল। ঢেলে, গেলাসের তলানিটা অভ্যেসমতো উপুড় করে ধরল পাশে রাখা ক্যাকটাসের টবে।
উপুড় করেই থমকে গেল। স্মৃতির বিদ্যুৎ ঝলসে উঠেছে মাথার মধ্যে। আবার গেলাসটা উপুড় করল সঞ্জয়। আবার! আবার!
এবার মনে পড়েছে। ঠিক এমনি করেই ক্যাকটাসের টবে মদের গেলাস উপুড় করে ধরেছিল অজানা এক সুন্দরী, বারীন বাগচির ফ্ল্যাটে। দিয়ে সঞ্জয়কে বলেছিল চা আনতে। সঞ্জয় চা নিয়ে ফিরে এসে দেখেছিল বারান্দা শূন্য। বহু নীচে পড়ে রক্তাক্ত একটা মাংসপিণ্ড–বারীন বাগচি!
আকাশের বিজলী মানবীরূপে দেখা দিলে যে রূপ হয়, মেয়েটির অঙ্গে সেই রূপ দেখেছিল সঞ্জয়। তাই ভোলা যায়নি। কালিদাস এই মেয়েরই ছবি আঁকছে তন্ময় হয়ে। অন্য ছাঁদে চুল বাঁধার জন্যে চিনি-চিনি করে চিনতে পারেনি সঞ্জয়।
বারীন বাগচির রহস্যজনক আত্মহত্যার (?) পূর্ব মুহূর্তে যে মোহিনীকে দেখা গিয়েছিল–এই সেই কন্যা। বারীনের মৃত্যুর কারণ সে, হয়তো বা হত্যাকারিণীও। কিন্তু কালিদাসের সঙ্গে জুটল কেন মেয়েটা? এত গোপনীয়তাই বা কেন?
হঠাৎ একটা কুৎসিত চিন্তা হুল ফোঁটালো সঞ্জয়ের মগজে। ছিটকে গিয়ে রিসিভার তুলল ও। ডায়াল করল কালিদাসের নাম্বার। কিন্তু ফোন বেজেই গেল। কেউ ধরল না।
কালিদাস কি ঘুমোচ্ছে?
সঞ্জয়ের মাথায় সেই কুৎসিত চিন্তাটা তখনো সমানে হুল ফুটিয়ে চলেছে। কাজেই কিছুক্ষণের মধ্যেই অত রাতেও তাকে দেখা গেল কালিদাসের ফ্ল্যাটের সামনে।
দরজা ভেজানো ছিল। ভেতরে আলো জ্বলছিল। ইজেলের পায়ার কাছে মুখ থুবড়ে পড়েছিল কালিদাস।
একটা তির পিঠের মধ্যে ঢুকে আধখানা বেরিয়েছিল বুক দিয়ে।
পরের দিন।
জেলখানার সামনে এসে ব্রক কষল একটা রক্তরক্তের ক্যাডিলাক। নেমে দাঁড়াল পরমাসুন্দরী একটি তরুণী।
জেল সুপার অবাক হলেন তরুণীকে দেখে। মেয়েটি নাকি ভৈরব সাহার সহোদরা। দাদা হাজতবাস করছে শুনে দেখা করতে এসেছে।
সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র। জেলখানার নিয়মকানুন ছার সে মুখের কাছে। কাজেই অচিরেই গরাদের এপাশে এসে দাঁড়াল মণিকা। ওপাশে ভৈরব।
চোখে চোখ রেখে মণিকা বলল–চিনতে পারছেন?
না।
আপনাকে মুক্তি দিতে এসেছি।
বলে, আঁচল ঢাকা পিস্তল থেকে পর পর তিনবার গুলি করল মণিকা। ভৈরব মুক্তি পেল ধরাধাম থেকে।
সেই সঙ্গে মণিকাও। চতুর্থ গুলিটা দিয়ে নিজের মগজ ফুটো করে দিয়ে সে রওনা হল পরপারে স্বামীর কাছে।
* রহস্য পত্রিকায় প্রকাশিত। শারদীয় সংখ্যা, ১৩৭৮
কাঞ্চনপুর-রহস্য
হত্যা সম্বন্ধে সাধারণের আগ্রহ প্রায়ই দেখা যায় ভ্রমাত্মক অথবা আমার মতে, ভ্রান্তির সম্ভাবনা বিশিষ্ট। উদাহরণ স্বরূপ সেই সামন্তঘটিত কাহিনিটাই ধরা যাক। সতের বছর আগে ঘটনাটা ঘটেছিল এবং এখনও সে ঘটনা প্রত্যেকের কাছে যেন গতদিনের স্মৃতি–এখনও জনসাধারণ সে কাহিনি নিয়ে গভীর আগ্রহে আলোচনা করে। তবুও যে-কোন দিক দিয়ে বিচার করাই যাক না কেন, কোনও মতেই এটাকে প্রথম শ্রেণির হত্যাপর্যায়ে ফেলা যায় না। ব্যাপারটা ঘটেছিল এই রকম?
ইন্ডিয়ান কেমিক্যালস কোম্পানির স্বত্ত্বাধিকারী মিঃ কে. ডি. সামন্ত জীবন-সঙ্গিনীরূপে পেয়েছিলেন একজন অতি খিটখিটে এবং বদমেজাজী মহিলাকে। কাজেই তাঁর অন্তরের যে গভীর অনুরাগ স্ত্রীর প্রাপ্য ছিল–সেই অনুরাগের সবটুকুই দিলেন তার সুন্দরী টাইপিস্ট মিস সান্যালকে। আর তারপর তিনি মিসেস সামন্তকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করলেন এবং দেহটিকে খণ্ড খণ্ড করে কেটে কয়লার গাদার নীচে সমাধিস্ত করলেন। প্রাথমিক হলেও এই অবধি ব্যাপারটা করলেন তিনি সুন্দরভাবে; আর এরপর যদি মূর্খ মিস্টার সামন্ত আর কুটোটি না নেড়ে চুপচাপ থাকতেন, তাহলে সুখেই সারা জীবনটা কাটিয়ে ইহলোক ত্যাগ করতেন। কিন্তু কিসের তাগিদে জানি না নির্বোধের মতো তিনি বাড়ি থেকে উধাও হলেন–প্রেমিকার সঙ্গে ছদ্মবেশে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাত্রা করলেন। এই কাজটি যদি তিনি না করতেন, তাহলে আমি বিনা দ্বিধায় এই হত্যাটিকে অতুলনীয় আখ্যা দিতে বিলম্ব করতাম না। পরিণামে কি হল? বেতারের সুযোগ নিয়ে ভারতীয় পুলিশ তাকে জাহাজেই গ্রেপ্তার করলে। এই হত্যা-ঘটিত বিষয়ে এইটুকুই হল সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক–কিন্তু জনসাধারণ এখনও পর্যন্ত এই অপ্রাসঙ্গিকটুকু নিয়েই করছে মাতামাতি। একজন বিখ্যাত চিত্রসমালোচক যখন কোনও চিত্র সম্বন্ধে একটি প্রথম শ্রেণির সমালোচনা করেন, তখন অল্পজনেই তা পড়ে। কিন্তু যেই কোনও সবজান্তা সংবাদদাতা খবর দেয় যে চিত্রশিল্পী ক্যানভাস সাজানোর সময়ে শেক্সপীয়ারের সনেট আবৃত্তি করতে থাকেন অথবা একাহারী হয়ে এই সব বিখ্যাত চিত্র সৃষ্টি করেন–তখনই সমস্ত জগৎ একবাক্যে স্বীকার করে যে, তিনি বড় দরের শিল্পীই বটে।
যা অপ্রয়োজনীয়, তা আর কিছু করতে না পারলেও অকৃত্রিম সত্যটুকুকে চিরকালই অস্পষ্ট করে তোলে। জনতা যদি মিথ্যার পেছনে ধাওয়া করে, তাহলে সত্য তো অবহেলিত হবেই। সুতরাং বুদ্ধিভ্রষ্ট মিঃ সামন্তর জটিল কার্যকলাপ যখন সংবাদপত্র প্রায় ভরিয়ে রেখে দিয়েছে, সেই সময়ে অত্যাশ্চর্য আলিপুর-হত্যা-রহস্যকে স্থান দেওয়া হল কাগজে চক্ষুর অগোচরে ক্ষুদ্র এক কোণে। বাস্তবিকই, খুঁটিনাটি তথ্যগুলি থেকে এমন ভাবে আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছিল যে, এই স্মৃতিতে তা গেঁথে নেই; ঘটনাটা প্রায় এই : আলিপুরের ছোটখাটো একটি ফ্ল্যাটের দোতলায় একজন যুবক একটি অভিনেত্রীর সঙ্গে কথা বলছে, অভিনেত্রীর বয়সের সীমারেখা, যতদুর আমার মনে পড়ছে, তিরিশ কি চল্লিশের মধ্যে হবে এবং বিগতযৌবনা হওয়ার পরিণামস্বরূপ চিত্রজগতেও খ্যাতি বিলীন হয়েছে অনেকদিন। কথাবার্তার মাঝখানে আচম্বিতে শোনা গেল একটা ফায়ারিংয়ের শব্দ–খুব কাছ থেকেই। যুবকটি ফ্ল্যাট থেকে ছিটকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল এবং বাড়ির সদর দরজায় দেখতে পেল একটি মৃত পুরুষকে তার আপন পিতা–গুলি তাঁর বক্ষে বিদ্ধ হয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে, পিতাও এক সময়ে অভিনেতা ছিলেন এবং ওপরতলার অভিনেত্রীটি তার পুরোনো বান্ধবী। কিন্তু তারপরেই আসছে হত্যার অভিনব এবং আশ্চর্য অংশটুকু। মৃতের পাশে অথবা মৃতের হাতে কিংবা মৃতের কোটের পকেটে–আমার ঠিক মনে পড়ছে না কোনওখানে–ভারি তারের তৈরি একটা অস্ত্র পাওয়া গেল–জঘন্য এবং অত্যন্ত সাংঘাতিক এক মারণাস্ত্র, নিখুঁত নৈপুণ্যে অতি অদ্ভুতভাবে গঠন করা হয়েছে সেই বিচিত্র অস্ত্রটি। তখন রাত্রি, কিন্তু প্রতিপদের শুভ্র চন্দ্রকিরণে চতুর্দিক আলোকিত। যুবকটি বললে, একজনকে সে দৌড়ে গিয়ে পাঁচিল টপকে পালাতে দেখেছে।
