কিন্তু লক্ষ্য করুন পয়েন্টটি? মৃত অভিনেতা তাঁরই পুরোনো বান্ধবীর ফ্ল্যাটের নীচে লুকিয়ে ছিলেন, অন্তরালে থেকে অপেক্ষা করছিলেন, হাতে ছিল তার সেই নির্মম অস্ত্রটি। তিনি কোনও শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার প্রত্যাশায় ছিলেন। যাকে খুন করবার অভিপ্রায় না থাকলেও যার মারাত্মক অনিষ্টের অভিপ্রায় নিয়ে প্রস্তুত হয়েছিলেন।
কে সেই শত্রু? মৃত ব্যক্তির বর্বর ও সুচিন্তিত অভিপ্রায়ের চেয়েও দ্রুতগামী ওই বুলেটটি কার দ্বারা নিক্ষিপ্ত?
খুব সম্ভব আমরা কোনওদিন তা জানতে পারব না, যে হত্যা প্রথম শ্রেণির পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার উপযুক্ত ছিল, যে হত্যা বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতার দিক দিয়ে তুমুল আলোড়নের সৃষ্টি করতে পারত, সেই হত্যাই বিস্মৃতির গর্ভে তলিয়ে যেতে বাধ্য হল–মূর্খ জনতা ততধিক মূর্খ সামন্ত আর তার প্রেমিকাকে নিয়ে সৃষ্টি করলে বছরব্যাপী আলোচনার।
স্বভাবতই এই ধরনের অবহেলার জন্য যুদ্ধ অনেকাংশে দায়ী। সেই আতঙ্কভরা দিনগুলিতে মানুষের মাথায় শুধু একটি চিন্তাই জাগ্রত ছিল–বাদবাকি সব হয়েছিল উপেক্ষিত। সুতরাং ঢাকুরিয়া লেকে যত্ন করে বস্তায় জড়ানো মৃত মহিলাটির বিকৃত দেহটির ওপর খুব অল্পই মনোযোগ দেওয়া হল এবং বেশি বাগাড়ম্বর না করে একটি লোককে ফাঁসিতে দেওয়া হল ঝুলিয়ে। এ কেসে দু-একটি চিত্তাকর্ষক পয়েন্ট প্রত্যেকেরই দৃষ্টি গেল এড়িয়ে।
আর, তারপর শোনা গেল ভবানীপুরে এক আশ্চর্য হত্যা-কাহিনি। একটি সম্ভ্রান্ত পরিবার একটা বড় বাড়িতে নতুন ভাড়া এলেন। তখনও তাঁদের সমস্ত মালপত্র খোলা হয়নি–একরাত্রে গৃহকর্তাকে কে খুন করে কয়েকটি জিনিস নিয়ে সরে পড়ল। লুণ্ঠন সামগ্রীর মধ্যে ছিল কী? একজোড়া বুট জুতো, খুব জোর, পনের টাকার বেশি দাম হওয়া উচিত না। আর একটি ঘড়ি–সেটার দামও পঁচিশ টাকার ওদিকে নয়। এক্ষেত্রেও হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করে বিনাবাক্যব্যয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হল। আর বলতে বাধ্য হচ্ছি, তার গতিবিধির যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা ছিল। কিন্তু যুদ্ধপূর্ব অথবা যুদ্ধকালীন যাবতীয় কেসের মধ্যে সর্বাপেক্ষা চমকপ্রদ যে কেসটি লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে গেছিল, সেটি হল কাঞ্চনপুর-রহস্য। অশ্রুতপূর্ব এই কাহিনি শোনাবার আগে প্রথমেই আমি কাহিনির ঘটনাস্থান ও পাত্রপাত্রীর নাম পরিবর্তনের অবাধ অনুমতি পাঠকের কাছ থেকে চেয়ে রাখছি। কারণ, এই কাহিনি সম্পর্কিত ব্যক্তিরা কোথায় বর্তমান আছেন, তা জানি না, জীবিত কি মৃত, তাও জানি না। সুতরাং পূর্ব থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করা যুক্তিযুক্ত মনে করে এইটুকু অধিকার আমি চেয়ে নিলাম। সংবাদপত্রে যখন এই কাহিনির ছোট্ট একটি শিরোনামা প্রকাশিত হল, তখন অতি ব্যস্ত জগতের নজরই পড়ল না সেদিকে। সংবাদপত্র মারফৎ উজবেক শিল্পীদের নৃত্যকলা প্রদর্শন বা নিখিল ভারত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত সম্মিলন বা ওই জাতীয় কিছু বৈচিত্র্যময় সংবাদ পরিবেশিত হত কিনা মনে নেই, হলেও জনগণ তখন সে সংবাদ রাখার চেয়ে ট্যাঙ্কার, ভি-টু অথবা প্যারাসুট বাহিনীর খবরটাই জেনে রাখা উচিত বলে মনে করত।
কাঞ্চনপুরের রহস্যের সূত্রপাত হয় এইভাবে। প্রথমেই ধরে নেওয়া যাক যে কলকাতা শহরের উপকণ্ঠে অতি মনোহর ক্ষুদ্র একটি কলোনি আছে–মনে করা যাক, সেই সুসজ্জিত কলোনিটার নাম কাঞ্চনপুর। ক্ষুদ্র হলেও প্রয়োজনীয় কিছুরই অভাব সেখানে রাখা হয়নি। থানা, বাজার, পোস্টাফিস ইত্যাদি যাবতীয় সুবিধাই সেখানে সহজ লভ্য। শহরের উপকণ্ঠে থাকায় যাতায়াতেও কোনও অসুবিধা নেই–ট্রাম, বাস এবং ট্রেন, এই ত্রিবিধ যানই যাতায়াতের পথকে সুগম করে তুলেছে। এ হেন কাঞ্চনপুরে চৌরাস্তা থেকে স্টেশনের বিপরীত দিকের পথটায় মিনিট তিনেক হেঁটে গেলে লাল পয়েন্টিং করা যে দোতলা বাড়িটা দেখতে পাওয়া যায়, সেখানে বাস করতেন জগদীশ সরকার এবং তাঁর স্ত্রী। প্রাচীন দুর্গফটকের মতো লোহার বড় বড় কীলক মারা সদর দরজার ওপরেই একটা চকচকে আমার প্লেটে লেখা আছে, Taxidermist : Skeletons Articulated মৃত জন্তুজানোয়ারের চামড়া অবিকৃত রেখে ভেতরে শুষ্ক জিনিস ঠেসে কৃত্রিম জীবন্ত-দর্শন জানোয়ার তৈরির আর্টকেই Taxidermy বলে। এর বাংলা প্রতিশব্দ আমার জানা নেই। জগদীশ সরকার শুধু যে এই শিল্পতেই দক্ষ ছিলেন তা নয়, তিনি বিভিন্ন অস্থির জোড়া লাগিয়ে কঙ্কাল নির্মাণেও সমান পারদর্শী ছিলেন। তার বাড়ির পেছনে ছিল ছোট্ট একফালি বাগান–এই বাগানের একপ্রান্তে জগদীশ সরকার নির্মাণ করেছিলেন ছোট্ট কারখানাটি তাঁর যন্ত্রপাতি থাকত এইখানেই। নিভৃতে প্রতিবেশীদের সাদা-অনুসন্ধিৎসু চক্ষুর অন্তরালে তিনি তাঁর শিল্প নিয়েই দিনের পর দিন যেতেন কাটিয়ে।
যতদূর জানা গেছে, এই অস্থি সংযোজনকারী ট্যাক্সিডারমিস্ট ভদ্রলোকটি নিতান্ত নিরীহ এবং নম্র স্বভাবের মানুষ ছিলেন। প্রতিবেশীরা এই ছোটখাটো মানুষটিকে পছন্দ করতেন। পাশের বাড়ির সরকারি চাকুরে অময়বাবু, মোড়ের স্টেশনারি দোকানের স্বত্ত্বাধিকারী হরিহরবাবু এবং আরও দুজন ভদ্রলোক সুখেন্দু দাস আর রবিপ্রসাদ মুখার্জি–এঁরা সবাই জগদীশ সরকারের বৈঠকখানায় বহু বিকেল দাবা খেলে, চা পান করে এবং গল্প করে কাটিয়ে গেছেন। যুদ্ধপূর্ব শান্তির দিনে বহুবার এই কজন নিরীহ ভদ্রলোক ইডেন গার্ডেনে বেরিয়েছেন এবং গঙ্গার ঘাটে সূর্যাস্ত দেখেছেন।
