মণিকা থমকে গেল। ভৈরব ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কনস্টেবল দুজন এসে দাঁড়িয়েছে দুপাশে তারপর পুরো দলটা এগিয়ে চলল বড় রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশভ্যানের দিকে।
মণিকা আর দাঁড়াল না। ফিরে এল ক্যাডিলাকে। সিটে বসে হ্যান্ডব্যাগ থেকে বার করল একটা কাগজ। তাতে লেখা এই কটি নাম :
বারীন
মঘা
শান্তনু
ভৈরব
কালিদাস
বারীন, মঘা আর শান্তনুর নাম তিনটে পেনসিল দিয়ে কাটা। মণিকা জিজ্ঞাসা চিহ্ন বসালো ভৈরব-এর নামের পাশে।
সত্যিই তো! ভৈরব যে এখন হাজতে!
কালিদাস রায় চিত্রশিল্পী। জীবনধর্মী চিত্রাঙ্কনে পারদর্শী। তাই তার নিভৃত স্টুডিওতে মডেলের আনাগোনা চলে সকাল সন্ধ্যায়।
কালিদাস রায় ব্যাচেলার। সুপুরুষ। ধনী। তাই তার মক্কেল হতে রাজি হয় এমন অনেক কন্যা যাদের রূপ আছে, হয়তো রূপাও আছে।
কাজেই সেদিন সন্ধ্যায় কলিংবেল টিপে যে মেয়েটি কালিদাসের স্টুডিওতে পা দিল, তার প্রস্তাব শুনে বিস্মিত হল না কালিদাস। মেয়েটি কাজ চায়। মডেল হতে চায়। ফি খুব কম। ঘন্টায় পাঁচ টাকা।
কালিদাস আপাদমস্তক দেখল মেয়েটির। দেখে রাজি হল। কারণ, এ মেয়ে কেবল রূপসী নয়, রূপকে কীভাবে মেলে ধরতে হয়, তা জানে। উৎসাহের বশে কালিদাস সঙ্গে সঙ্গে তাকে সিটিং দিল। ইজেলে কাগজ আটকে পেনসিলের লম্বা লম্বা টানে ফুটিয়ে তুলল অপরূপার রূপরেখা।
মোহিনী হেসে বিদায় নিল মেয়েটি। নাম তার মণিকা। বলে গেল সে আবার আসবে। কাল সন্ধ্যায় সে হবে ব্যাধের বউ। কালিদাসের ইচ্ছে তাই।
নীচে নেমে এল মণিকা। চাতাল ঘুরে যেই লন পেরোতে যাচ্ছে, এমন সময়ে পাশ দিয়ে হন হন করে বেরিয়ে গেল একটি মূর্তি।
পুরুষ মূর্তি। এক পলকেই মণিকা তাকে চিনেছিল। তাই আর পেছনে না ফিরে সিধে ফটক পেরিয়ে পড়েছিল রাস্তায়।
পুরুষটিও থমকে দাঁড়িয়েছিল। পেছন ফিরে তাকিয়েছিল অপসৃয়মান তন্বীর দিকে। সন্দিগ্ধ চোখে। মেয়েটাকে এত চেনা চেনা ঠেকছে কেন?
সেই মুহূর্তে মনে পড়েনি। পড়লে অনেকগুলি বন্ধুকৃত্য একসাথেই সারতে পারত। কেননা, যুবা পুরুষের নাম সঞ্জয়। বারীন বাগচির বন্ধু। যে বারীন এই সেদিন নিহত হয়েছে, মণিকার হাতে।
এই সঞ্জয়কে দিয়েই চা আনতে পাঠিয়েছিল মণিকা বারীনের মদের গেলাস ক্যাকটাসের টবে উপুড় করে দিয়ে।
.
পরের দিন সন্ধ্যায় কালিদাসের ফ্ল্যাটে এল মণিকা। একটিমাত্র বাঘের চামড়া পাতলা কোমর জড়িয়ে বুকের ওপর দিয়ে ঝুলে রইল কাঁধের ওপর। আর এক কাঁধে তিরভরা তূণ। হাতে ধনুক। ছিলায় তির। ছিলা টান করে ধরা কান পর্যন্ত।
এই পোজে বিভিন্ন কোণ ধরে অনেকগুলি স্কেচ আঁকলো কালিদাস। প্রতিটি স্কেচের মধ্যেই অনুভব করল কামনার স্বাদ। মেয়েটার অনাবৃত কাঁধ, উরু এবং পিঠ ওকে টানতে লাগল চুম্বকের মতো। পাগলের মতো পরের পর স্কেচ এঁকে চলল ও। ক্লান্তি নেই ওর পেনসিল টানার। ক্লান্তি নেই মণিকার অঙ্গেও। সুবর্ণ সুযোগ হেলায় হারানো চলবে না।
এবার ফ্রন্ট পোজে দাঁড়াল মণিকা। তিরের মুখ সিধে ফেরানো কালিদাসের দিকে। কালিদাসের চোখ পর্যায়ক্রমে ঘুরছে ইজেল আর মণিকার ওপর।
এমন সময় সাঁই করে কালিদাসের পাঁজর ছুঁয়ে তির বেরিয়ে গেল–খটাং করে আটকে গেল ওদিকের দেওয়ালে টাঙানো ছবির ফ্রেমে।
ভীষণ চমকে উঠেছিল কালিদাস। আর মণিকা কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়েছিল পাশের টুলের ওপর–আর পারছি না…বড় হাত-পা কাঁপছে।
তবে থাক, সামলে নিয়ে বলল কালিদাস। কাল হবে-খন।
না। ফ্যাকাসে মুখ মণিকার। আজকের মুড কালকে নাও থাকতে পারে। যত রাতই হোক, ছবি শেষ করুন। একটু ব্রান্ডি দেবেন?
একটু কেন, বেশি করেই ব্র্যান্ডি ঢালল কালিদাস। নিজের রক্তেও আগুন ছোটালো ব্র্যান্ডির প্রসাদে। মণিকাকে দুটো আদরের কথা বলার চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু তার আগেই একটা কাণ্ড ঘটল।
জানলার সামনে দাঁড়িয়েছিল মণিকা। দেখল, একতলার লন পেরিয়ে সঞ্জয় আসছে। আসছে কালিদাসের ফ্ল্যাটেই।
মণিকা বলল–আমি যে এখানে আছি, তা আপনার কোনো বন্ধু-বান্ধবকে জানাতে চাই না। আপনার হেল্প চাই।
একশোবার।
আমি বাথরুমে যাচ্ছি। আপনার বন্ধুটি চলে গেলে আমাকে ডাকবেন।
যথাসময়ে সঞ্জয় এল। ইজেল আঁকা মণিকার ছবি দেখে ভুরু কুঁচকে ভাবল অনেকক্ষণ। গত সন্ধ্যায় ছবিটায় রং চড়িয়েছিল কালিদাস। মণিকা যেন মূর্ত হয়ে উঠেছিল সে ছবিতে। এ ছবিটাও চিনি-চিনি মনে হল সঞ্জয়ের। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ল না প্রথম দেখার ঘটনাটা।
ইচ্ছে ছিল কালিদাসের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা মারার। কিন্তু কালিদাস যেন তাকে তাড়াতে পারলেই বাঁচে, এমনি ভাব দেখালো। বিস্মিত হল সঞ্জয়। হয়তো ইজেলের ছবিটা নিয়েই ব্যস্ত শিল্পীবন্ধু, এই ভেবেই আর দাঁড়ালো না সঞ্জয়। মডেলের মেয়েটি কে, এ প্রশ্ন বলি-বলি করেও বলতে পারল না কালিদাসের ঠোঁটে চাবি-দেওয়া ভাব দেখে।
ভাবিত মনে বাড়ি ফিরল সঞ্জয়। মেয়েটা কে? কার ছবি আঁকছে কালিদাস? কেন এত চেনা-চেনা লাগছে ছবিটা? একেই তো গতকাল সন্ধ্যায় কালিদাসের বাড়ি থেকে বেরোতে দেখা গিয়েছিল? চোখে চোখ পড়েছিল, মেয়েটি চোখ ফিরিয়ে নিয়ে পাশ কাটিয়ে গিয়েছিল–আর ফিরেও তাকায়নি। কিন্তু সঞ্জয়ের কেন জানি মনে হয়েছিল, ফিরে তাকায়নি পাছে সঞ্জয় তাকে চিনে ফেলে তাই। ধরা দিতে চায় না মেয়েটা। কিন্তু কেন? কালিদাস এত রাতে তার ছবি আঁকছে তন্ময় হয়ে কেন? স্কেচ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে মডেলের ছবি। তার মানে, মডেল ঘরের মধ্যেই ছিল। সঞ্জয়কে দেখেই লুকিয়েছে। অথবা কালিদাস লুকিয়ে রেখেছে। কেন এই লুকোচুরি? কে এই রহস্যময়ী? কার প্রভাবে কালিদাসের মতো প্রিয় বন্ধুও এত দূরে সরে যেতে পারে?
