ব্যাগ থেকে নাইলন দড়ি বার করল মণিকা। পিছমোড়া করে বাঁধল শান্তনুকে। মুখের মধ্যে বেশ খানিকটা তুলো ঠেসে দিল। তারপর চওড়া স্টিকিং প্লাস্টারের পটি দিয়ে মুখ আটকে দিল।
টানতে টানতে শান্তনুকে নিয়ে এল ছোট্ট রান্নাঘরে। স্টিকিং প্লাস্টারের পটি দিয়ে প্রতিটি বন্ধ জানলার ফাঁক বন্ধ করল। তারপর একটা টুল নিয়ে বসল শান্তনুর পাশে। ব্যাগ থেকে স্মেলিং সল্টের শিশি নিয়ে ধরল নাকের কাছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝাঁঝালো গন্ধে জ্ঞান ফিরে এল শান্তনু লাহিড়ীর। চেঁচাতে পারল না–মুখ বন্ধ। হাত-পা নাড়তে পারল না–দড়ি দিয়ে বাঁধা।
মণিকা বলল–একটু পরেই মারা যাবেন আপনি। আমার নাম উষা নয়। আমি ঝুমির স্কুলে পড়াই না। মিথ্যে টেলিগ্রাম করে আমিই সরিয়েছি ঝুমির মাকে আপনাকে নিজের হাতে মারব বলে। কেন জানেন? একবছর আগে একটা শিবমন্দিরের সামনে একজন গুলি খেয়ে মরেছিল। মনে আছে? নতুন বর। আমি তার নতুন বউ। বিধবা।
শান্তনু লাহিড়ীর চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দৃশ্য। তিনতলা বাড়ির চিলেকোঠায় বসে ওরা তাসের জুয়ো খেলছিল। মেসবাড়ি। জুয়োর সঙ্গে মদের ব্যবস্থাও রয়েছে। আর রয়েছে শান্তনুর দোনলা বন্দুকটা। ফাঁড়িতে দেখতে চেয়েছিল বন্দুকের চেহারা। নইলে নাকি লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। তাই বন্দুক নিয়ে আসা। ফড়ির কাজ শেষ। এখন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে একটু ফুর্তিতে মত্ত।
চিলেকোঠায় ওরা পাঁচজন ছিল। বারীন, মঘা, শান্তনু, ভৈরব আর কালিদাস। পাঁচজনের কর্মস্থল পাঁচদিকে। দৈবাৎ পাঁচ বন্ধু মিলেছে। তাই এই ফুর্তির আয়োজন।
কে জানত ফুর্তির শেষে এ-ট্র্যাজেডি থাকবে। কেননা, একদান খেলে উঠে জানলায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ভৈরব। হাতে ছিল শান্তনুর দোনলা বন্দুক। নিছক খেয়ালবশেই তাগ করছিল রাস্তার ও পাশে শিবমন্দিরের চুড়োর ত্রিশূলটা। খেলাচ্ছলেই মন্দির দিকে নজর রেখে নলচে নামিয়ে আনছিল চুড়ো বরাবর নীচের দিকে। ত্রিশূলের পর গম্বুজের পলস্তারা। তারপর মন্দিরের চত্বর। ঠিক এই সময়ে মন্দির থেকে বেরিয়ে এসেছিল নবপরিণী একটি দম্পতি। ভৈরবের নলচের সামনেই এসে পড়ল নতুন ব্রিটি। মাছির সঙ্গে একরেখায় যখন বরের হৃৎপিণ্ড, ঠিক তখুনি শান্তনুর চোখে পড়েছিল জানলায় বন্দুক বাগিয়ে কাকে যেন তাগ করছে ভৈরব। সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠে দৌড়ে গিয়েছিল শান্তনু। কেননা সে ছাড়া আর কেউ জানত না বন্দুকে গুলিভরা আছে।
আচমকা শান্তনুর চেঁচানিতে এবং তারপরেই শান্তনুর হেঁচকা টানেতে চমকে গিয়েছিল ভৈরব। এমনই বরাত, সঙ্গে সঙ্গে গুলি বেরিয়ে গিয়েছিল বন্দুক থেকে। এফেঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছিল নতুন বরের হৃৎপিণ্ড।
ওরা আর দাঁড়ায়নি। ফুর্তির ট্র্যাজেডি মাথায় নিয়ে চো-চাঁ চম্পট দিয়েছিল পাঁচ বন্ধু। কে মারা গেল, তা নিয়ে আর মাথা ঘামায়নি।
মণিকার চোখে জল। বলছিল–আমারও স্বপ্ন ছিল, সংসার করব। এ স্বপ্ন হঠাৎ দেখিনি। ছেলেবেলায় কল্প ছিল আমার খেলার সাথী। সেই কল্প বড় হল। কিশোর হল। তরুণ হল। আমি কিশোরী হলাম। তরুণী হলাম। মন দেওয়ার পালাও গড়ে উঠেছে ধাপে ধাপে। স্বপ্নও দেখেছি তিল তিল করে। সে স্বপ্ন মুহূর্তের মধ্যে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছেন আপনারা–আপনারা পাঁচ বন্ধুতে। কল্প মারা গেল। আমি বেঁচে মরে রইলাম শুধু প্রতিহিংসার জন্যে। এক বছরে অনেক টাকা খরচ করেছি, অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছি। তবে বার করেছি আপনাদের পাঁচজনের নাম আর ধাম। বারীন আর মঘা কল্পর কাছে পৌঁছে গেছে। আপনি এখুনি যাবেন। ভৈরব আর কালিদাসও যাবে কয়েকদিনের মধ্যে।
বলে, মণিকা উঠে দাঁড়াল। গ্যাসের চাবি পুরো খুলে দিল। বাইরে এসে বন্ধ করল পাল্লাদুটো। স্টিকিং প্লাস্টারের পটি দিয়ে টিপে টিপে বন্ধ করল পাল্লার ফাঁক।
যথাসময়ে পুলিশ এসেছিল। ঝুমি বার বার বলেছিল, উষাদি এসেছিল স্কুল থেকে। তারপর বাবা মরে গেছে।
পুলিশ স্কুলে গিয়ে উষাদিকে গ্রেপ্তার করেছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ফোন এল ফাঁড়িতে। একটা নারীকণ্ঠ বললে–উষা দেবী নির্দোষ। ওঁর নাম নিয়ে আমিই খুন করেছি শান্তনু লাহিড়ীকে।
.
পেট্রল পাম্পের পাবলিক ফোন থেকে থানায় ফোন করেছিল মণিকা। রিসিভার রেখেই দৌড়ে এসে উঠেছিল গাঢ় রক্ত-রঙের ক্যাডিলাক গাড়িটায়। ড্রাইভ করেছিল নিজেই। ঘণ্টাতিনেক একটানা গাড়ি চালিয়ে পৌঁছেছিল একটা মোটর মেরামতি কারখানায়। জি. টি. রোডের ওপর গাড়ি দাঁড় করিয়ে হেঁটে হেঁটে পৌঁছেছিল গ্যারেজে।
বেশ বড় কারখানা। ভাঙা-আধভাঙা গাড়ি দাঁড় করানো এলোমেলোভাবে। এঁকেবেঁকে আপিসের দিকে এগুলো মণিকা। তেলকালিমাখা একজন মেক্যানিককে বললে ভৈরবকে ডেকে দিতে।
মণিকা দাঁড়িয়ে রইল। জায়গাটা বেশ নির্জন। মাথার ওপর কাক উড়ছে। আশেপাশে মানুষ নেই। ভাঙা গাড়ির ভিড়ে মণিকাকে দেখা যাচ্ছে না।
মণিকা হ্যান্ডব্যাগ খুলে ক্ষুদে পিস্তলটা বার করল। তুষার শুভ্র ওড়না দিয়ে ঢেকে রাখল ডান হাত আর হাতে ধরা পিস্তল।
নলচে ফেরানো রইল আপিসের দিকে। ওই পথেই আসবে ভৈরব। ওই তো আসছে। মাথাজোড়া টাক। গাট্টাগোট্টা চেহারা। এ কারখানার মালিক। একাই আসছে।
মণিকা পিস্তল তাগ করল। ট্রিগার টিপতে যাবে–
এমন সময়ে ভৈরবের পেছনে একটা সোরগোল শোনা গেল। পাহাড়প্রমাণ লোহালক্করের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর, দুজন কনস্টেবল এবং একজন তেলচুকচুকে ভদ্রলোক। চেঁচাচ্ছেন ভদ্রলোক–ওই যে…ওই দেখুন…জোচ্চের কোথাকার…অ্যারেস্ট করুন… মেরামতের নাম করে আমার গাড়ি নিয়ে ভাড়া খাটাচ্ছে একবছর ধরে…গাড়ি দিচ্ছে না…চোর… গুন্ডা..বদমাশ…
