পুরো গ্লাসটা এক ঢোকেই শেষ করল মঘা। মাথার মধ্যে মৃত্যুর ঐক্যতান শুরু হল সেই মুহূর্ত থেকে।
প্রথমে মঘা বোঝেনি। মনে হয়েছিল স্কচের নেশা। তারপর মাথার খোঁচা যখন চোখেও এসে পৌঁছোল, তখন ভাবল জবর স্কচ তো! দু-পেগেই এফেক্ট! তারপর চোখ ঘোলাটে হয়ে এল। বিশ্বসংসার ঝাপসা হয়ে এল। মেঝের ওপর সটান আছড়ে পড়ল মঘা।
মণিকা উঠে দাঁড়াল। মঘার দিকে তাকালো না। গেলাসদুটো নিয়ে বেসিনে ধুয়ে তুলে রাখল। আরকমিশানো হুইস্কির বোতল বেসিনে উপুড় করে ঢেলে দিল। খালি বোতলটা রাখল ব্যাগের মধ্যে।
মঘা তখন পুঁকছে। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে পাশে বসল মণিকা। চেয়ে চেয়ে দেখল, মঘা মরছে; ভয়ানক কষ্ট পাচ্ছে।
বলল–শুনতে পাচ্ছেন?
কাতরে উঠল মঘা।
মণিকা বলল–স্কচে আমি বিষ মিশিয়ে আপনাকে খাইয়েছি। এখুনি মরবেন। আর দেরি নেই। মরবার আগে নিশ্চয় জানতে ইচ্ছে করছে, কেন আপনাকে মারলাম। তাই বলছি। শুনুন, কেন-র উত্তর একবছর আগে একটা শিবমন্দিরের সামনে রয়েছে। নতুন বউ নিয়ে শিবকে প্রণাম করতে গিয়েছিল একজন। মন্দির থেকে বেরোতে না বেরোতেই বিধবা হয়েছিল কনে বউ।
এই পর্যন্ত বলে থামল মণিকা। শোনবার মতো কেউ আর ছিল না ঘরে।
অনেক রাতে রামদাস এসে দেখেছিল মেঝের ওপর মরে কাঠ হয়ে শুয়ে তার বাবু।
.
অন্য একটি শহরতলী।
স্কুল। সবে ছুটি হয়েছে। বাচ্চা মেয়েটার হাত ধরে তার মা রওনা হয়েছে বাড়ির দিকে। মেয়েটি বার বার ফিরে তাকাচ্ছে পেছনে।
কোয়ার্টার এসে গেছে। সামনে খানিকটা সবুজ লন। তারপর দোতলা বাড়ি। হালফ্যাসানি। বোগানভালিয়ার থোকা আর রংবেরঙের ফুল দিয়ে সাজানো চত্বর।
ফটক দিয়ে ঢোকবার সময়ে আবার পেছন ফিরে তাকালো মেয়েটি। স্কুলের উষাদির মতো দেখতে মেয়েটা এখনো আসছে। বেশ দেখতে।
ফটকের সামনে এসে দাঁড়ালো পিছু নেওয়া মেয়েটি; নাম তার মণিকা।
বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হল না। খেলতে বেরিয়েছে বাচ্চা মেয়েটি। রঙিন প্লাস্টিকের বল নিয়ে ছুটোছুটি করছে সবুজ লনে। একবার ফটক দিয়ে রাস্তায় ঠিকরে গেল বলটা। ধরে ফেলল মণিকা। হাসিমুখে তাকিয়ে রইল বাচ্চা মেয়েটির দিকে। কাছে ডাকল হাত নেড়ে।
ভয় পেল না ছোট্ট মেয়েটি। স্কুলের উষাদির মতোই তো দেখতে। কী সুন্দর হাসি। স্কুল থেকেই তো পেছন পেছন এসেছে।
কাছে গেল মেয়েটা। মণিকা বলটা ফিরিয়ে দিয়ে বলল–কী নাম তোমার?
ঝুমি।
বাঃ, কী সুন্দর নাম। আমার নাম উষাদি তোমাদের স্কুলে পড়াই।
তোমার নামও উষাদি?
হ্যাঁ গো। তোমার মায়ের নাম কী? শ্রীমতী বনমালা লাহিড়ী। সাবাস। তোমার মামার বাড়ি কোথায়?
অনেকদূর।
কোথায়?
আগরতলায়।
তোমার মামা আছেন?
হ্যাঁ।
আগরতলায় থাকেন?
হ্যাঁ।
কী নাম জানো?
পন্টু মামা।
দাদু আছেন?
হ্যাঁ।
আগরতলায় থাকেন?
হ্যাঁ।
এইসময়ে দোতলার জানলা দিয়ে ডাক দিল ঝুমির মা–ঝুমি, ভেতরে এসো। বল নিয়ে এক দৌড়ে ভেতরে চলে গেল ঝুমি।
.
মণিকা প্লেনে আগরতলা গেল। সেখান থেকে একটা টেলিগ্রাম পাঠালো ঝুমির মা শ্রীমতী বনমালা লাহিড়ীকে।
টেলিগ্রাম হাতে পেয়ে শ্রীমতী বনমালা লাহিড়ী দেখল, ভাই লিখছে বাবার শেষ অবস্থা; এখুনি না এলেই নয়।
কাজেই পরের প্লেনেই আগরতলা রওনা হল ঝুমির মা। ঝুমির বাবার কাছে রেখে গেল ঝুমিকে। ঘরসংসার দেখার জন্যে ঠিকে ঝি, রাঁধুনি তো আছেই। কোনও অসুবিধে হবে না। ঝুমির বাবা অফিস গেলে ঠিকে ঝি-ই সারাদিন বাড়ি আগলাবে-খন।
সেইদিন রাত্রে ঝড় উঠল। দরজার কড়া নড়ল। ঝুমির বাবা ঝুমিকে নিয়ে একতলায় বসেছিল। উঠে এসে দরজা খুলে দিল।
মণিকা ভেতরে ঢুকল। হাওয়ায় উড়ছে ওর কপালের চুল। বুকের আঁচল। ঝুমির বাবা শান্তনু লাহিড়ী বিস্মিত হলেন অপরূপ মহিলার সহজ আচরণে।
মণিকা বলল–ঝুমি কই?
ওই তো।
স্বচ্ছন্দ পায়ে ঝুমির পাশে গিয়ে বসে পড়ল মণিকা। বলল–আমি ঝুমিদের উষাদি। ওদের স্কুলে পড়াই। তাই না ঝুমি? ঝুমি ঘাড় নেড়ে সায় দিল। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম, যাই দেখে যাই।
শান্তনু লাহিড়ী বললে–ভালোই করেছেন। ওর মা গেল বাপের বাড়ি। একা আমি সামলাতে পারছিলাম না।
হেসে উঠল মণিকা-খাওয়া হয়েছে?
না। কিন্তু–
মণিকা ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে–কোনও কথা নয়। আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। খাইয়ে-দাইয়ে ঝুমিকে ঘুম পাড়িয়ে বাড়ি যাব-খন। একটু থেমে মোনালিসা হাসি হেসে–এ কাজ আমি ভালোবাসি।
শান্তনু লাহিড়ী অপ্রস্তুত হলেন। খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাসও ফেললেন।
রান্নাবান্না করাই ছিল। এটা-সেটা গল্প করতে করতে গ্যাসের উনুনে সব গরম করে নিল মণিকা। এর ফাঁকে পাঁউরুটি কাটা বড় ছরি নিয়ে দরজার পাশের টেলিফোনের তারটা কেটে রাখল। বাপবেটিকে খাওয়াল। নিজে কিছু দাঁতে কাটল না। ঝুমিকে ভুলিয়ে ভালিয়ে দোতলায় নিয়ে গিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল। নীচে নেমে এসে দেখল হলঘরের টেবিলে তখনও বসে শান্তনু লাহিড়ী। মুখে পাইপ। চোখে বিস্ময়।
চলে যাচ্ছেন?
হ্যাঁ। আমার কাজ ফুরিয়েছে।
নিস্তব্ধ রাত। বাইরে ঝিঁঝি ডাকছে। শান্তনু লাহিড়ীর রক্তে দোলা লাগল মণিকার বিশাল চোখজোড়ার আয়ত চাহনি দেখে।
পাইপ সরিয়ে শুধু বলল–আপনার মতো মেয়ে আমি দেখিনি।
তাই নাকি? বলে মণিকা হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে শান্তনু লাহিড়ীর পেছনে গেল। ব্যাগ থেকে ছোট্ট পিস্তল বার করল। নলচেটী মুঠোয় ধরে কুঁদো দিয়ে ব্রহ্মতালুতে খুব জোরে চোট মারল। অজ্ঞান হয়ে গেল শান্তনু লাহিড়ী।
