মণিকা বললে–এনে দেবেন? চোখে অনুনয়।
বারীন ব্যালকনির রেলিং টপকে দাঁড়াল সরু কার্নিশের ওপর। অবাক চাহনি তখনো মণিকার বিশাল চোখের ওপর। তারপর এক হাতে রেলিং ধরে ঘুরে দাঁড়িয়ে যেই আর এক হাত বাড়িয়েছে শালের দিকে, অমনি দু-হাতে তাকে প্রচণ্ড ধাক্কা মারল মণিকা।
রেলিং থেকে হাত খসে গেল বারীনের। দশতলার ব্যালকনি কার্নিশ থেকে দেহটা পাকস্লট খেয়ে আছড়ে পড়ল একতলার লনে।
চেঁচিয়েছিল বারীন, কিন্তু কেউ শুনতে পায়নি। ঘরে তখন জাজ মিউজিকের ধুম পড়েছে।
মণিকা এ-দরজা সে-দরজা দিয়ে উধাও হয়ে গেল। কাশ্মীরী শালটা হাওয়ার টানে এরিয়েল থেকে উড়ে গিয়ে ভেসে গেল নীচতলার একটা বাড়ির ছাদে।
চায়ের ট্রে নিয়ে সঞ্জয় এসে দেখল ব্যালকনি শূন্য।
.
দিনকয়েক পরে।
মঘা দত্ত ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যেতেই রামদাস ঝাড়ন ফেলে আলমারি খুলে বার করল হুইস্কির বোতল। মঘা দত্তর হুইস্কির বোতল। বিপত্নীক মঘার এই এক বদভ্যেস। ফ্ল্যাটে বসে মদ গেলা চাই।
রামদাস তার ফাইফরমাশ খাটে। ঘরদোর সাফ করে। রান্না-বান্নাও করে দেয়। বাবুর দেখাদেখি তারও ইদানীং সখ হয়েছে হুইস্কি গেলার। তাও চুরি করে। মঘা দত্ত বেরিয়ে গেলেই রোজ খাওয়া চাই এক ঢোক। তারপর অবশ্য বেসিন থেকে জল ঢালতে হয় বোতলে। কেননা মঘা ভারি হুঁশিয়ার। হুইস্কির বোতলে রোজ কলম দিয়ে দাগ দিয়ে রাখে। লুকিয়ে-চুরিয়ে রামদাস তবুও হুইস্কি খায়। খেয়ে জল ঢেলে দাগে দাগ মিলিয়ে রাখে।
সেদিনও এক ঢোক গিলল রামদাস। জল মেশালো। বোতলটা আলমারিতে ফিরিয়ে দেওয়ার আগেই দারুণ চমকে উঠল।
খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে এক পরমাসুন্দরী। বিশাল চাহনি রামদাসের ওপর।
বোতলটা তাড়াতাড়ি পেছনে লুকালো রামদাস। বলল–কাকে চাই?
মঘা দত্ত।
নেই।
কখন থাকবেন?
সন্ধের পর।
তোমার নাম?
রামদাস।
বাবুর দেখাশোনা করো?
আজ্ঞে।
বাবুর সময় কাটে কী করে?
আজ্ঞে, সিনেমা দেখে, আড্ডা মেরে, বই পড়ে—
খুব সিনেমা দেখেন?
থিয়েটারও।
ও।
আজ্ঞে, বাবু এলে কি বলব?
হাসল মেয়েটি–পেনসিল আছে? কাগজ আছে। আনো, চিঠি লিখব।
বোতল সামলাতে সামলাতে কাগজ-পেনসিল আনতে পাশের ঘরে গেল রামদাস, ফিরে এসে দেখল মেয়েটি নেই।
.
মঘা দত্ত ফ্ল্যাটে ফিরেই লেটারবক্সে একটা খাম পেল। ভেতরে সবুজ কাগজে দু-লাইন চিঠি আর একটা থিয়েটারের বক্স-টিকিট।
সবুজ কাগজে ল্যাভেন্ডারের সৌরভ। চিঠির দু-লাইনে রোমান্সে ইঙ্গিত।
প্রিয়,
আলাপ করতে চাই। আসছেন তো?
মাথা ঝিমঝিম করে উঠল মেঘা দত্তর। এমন সময়ে রামদাস এল। সেই পরমাসুন্দরীর আবির্ভাব-বৃত্তান্ত রসিয়ে রসিয়ে বলল।
মঘা দত্তর স্থাণুর মতো বসে রইল খাটের ওপর।
.
থিয়েটার-হল।
বক্সে ঢুকে মঘা দেখল, কেউ নেই। এদিকে থিয়েটার শুরু হল বলে। তবে কি ঠাট্টা করল কেউ?
থিয়েটার শুরু হল। আস্তে আস্তে কমে এল মঘার ছটফটানি। মন যখন থিয়েটারের মঞ্চে, ঠিক তখনি বক্সের ছায়ামায়ায় এসে দাঁড়াল সেই মেয়েটি। নাম তার মণিকা।
দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। অনিমেষে চেয়ে রইল মঘার পানে। ভাবলেশহীন চাহনি। তারপর এসে বসল পাশে।
মঘা যেন আইসক্রিমের মতোই গলে গেল। মেয়েটা চেয়ে আছে মঞ্চের দিকে। নিশ্চল তনু।
বলল–আমার নাম মণিকা।
অঃ।
আপনার সঙ্গে অনেক কথা আছে।
অ্যাঁ।
এখানে বলব না।
হোটেলে?
না, আপনার বাড়িতে।
তাই নাকি? এ যে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া। কবে?
কাল। আর কেউ থাকুক আমি চাই না। একটু থেমে, শুধু আপনি আর আমি।
মঘার যেটুকু বাকি ছিল, এবার তাও গেল।
.
মঘা দত্তর ফ্ল্যাটের ধুলো ঝেড়েছে মঘা। সাজিয়েছে। রজনীগন্ধার স্টিক আর বেল-জুইয়ের গন্ধে ঘরে কেমন ফুলশয্যার আমেজ এনেছে।
মঘা নিজেও সেজেছে। বুকে খুশির তুফান।
তুফান ছুটে যেত যদি সেইমুহূর্তে মঘা দত্তর তৃতীয় নয়ন খুলে যেত। এবং সেই তৃতীয় নয়নে ভেসে উঠত সেই শহরেরই একটি দামি হোটেলের কক্ষ।
দেখা যেত, খাটের ওপর একটা গোটা হুইস্কির বোতল নিয়ে বসে মণিকা। এক হাতে একটা ইঞ্জেকশন দেবার সিরিঞ্জ। সিরিঞ্জভর্তি সাদা আরক। চুঁচটা ছিপি ফুঁড়ে বোতলের ভেতর ঢুকিয়ে দিল মণিকা। সাদা আরকটা মিশিয়ে দিল হুইস্কির সঙ্গে।
মঘার ফ্ল্যাটে মণিকা এল ব্যাগের মধ্যে আরকমিশানো বোতল নিয়ে। মঘার প্রথম উচ্ছ্বাস কমতেই ভিজে গলায় বলল–আমি জানি আপনি কী ভালোবাসেন।
কী?
হুইস্কি।
মঘা কাষ্ঠহাসি হাসল।
মণিকা বলল–হুইস্কি আমি খাই না। ভারমুথ ছাড়া কিছু ছুঁই না। কিন্তু আপনি যা ভালোবাসেন তাই দিয়েই শুরু হোক আমাদের প্রথম পরিচয়। ব্যাগ থেকে বেরুলো হুইস্কির বোতল। বিলিতি স্কচ। একশো টাকা এক বোতল। নিন, দু-গেলাস ঢালুন।
মঘার চোখ শামুকের চোখের মতো উদ্ধত হল। মাথায় টাইফুনের ছোঁয়া লাগল। ত্বরিতপদে উঠে গেল বোতল হাতে। ফটাৎ করে খুলল ছিপি। পর দু-গ্লাস খাঁটি (!) স্কচ ঢেলে সোডা পাঞ্চ করে রাখল মণিকার সামনে।
মণিকা আকাঁপা আঙুলে একটা গ্লাস তুলে নিল। আকাঁপা চোখে মঘার পানে চাইল। গ্লাসে গ্লাস ঠেকিয়ে বলল–চিয়ার্স।
গ্লাস শূন্য করে দিল মঘা। মণিকা গ্লাস হাতে রাখল। বলল–আর এক গ্লাস খান। তারপর কথা।
মঘা উঠে গেল গ্লাস ভরতে। সঙ্গে-সঙ্গে রজনীগন্ধার ফুলদানীতে হাতের গ্লাস উপুড় করে ধরল মণিকা।
মঘা ফিরে এসে দেখল শূন্য গ্লাস কোলে নিয়ে বসে মণিকা। বিলোল আঁখিতে কালো ইশারা।
