বউমা, মণিকার শাশুড়ি ঘরে এলেন। বউমা, আমার কথা রাখো। যেও না।
না, মা, যেতে আমাকে হবেই।
শাশুড়ি আর পীড়াপীড়ি করলেন না। একশো টাকার নোটের একটা তাড়া মণিকাকে দিয়ে বললেন–তপনের সারাজীবনের সঞ্চয়। নাও। মনে রেখো আমার শেষ কথাটা–যেদিন মন চাইবে, সেদিনই ফিরে আসবে।
সুটকেস খুলল মণিকা। পাঁচ থাক টাকা একসঙ্গে করল। শাশুড়ির দেওয়া টাকা রাখল তার ওপর। সুটকে বন্ধ করে বলল–মা, চললাম।
শাশুড়ি এবার কেঁদে ফেললেন।
.
রাস্তায় নেমে এল মণিকা। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সেই ফুটফুটে মেয়েটা। সবুজ ফ্রক উড়ছে জোর হাওয়ায়। বেণীর ডগাটা অস্থিরভাবে কামড়াচ্ছে ছোট ছোট দাঁত দিয়ে।
মণিকাকে দেখেই দৌড়ে এল কাছে–মাসিমা, চলে যাচ্ছেন?
হ্যাঁরে।
আমি সঙ্গে যাব?
আয়।
স্টেশন বেশি দূরে নয়; বড় জংশন; ইলেকট্রিক ট্রেন হরবখৎ যাচ্ছে আসছে। প্ল্যাটফর্মে কিছুক্ষণ দাঁড়াতেই এল কলকাতাগামী ট্রেন। ফুটফুটে মেয়েটার গাল টিপে দিয়ে একটা ফাস্ট-ক্লাস কামরায় উঠে পড়ল মণিকা।
উল্টোদিকের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে তখন যদি কেউ মণিকার গতিবিধি নজরে রাখত, তাহলে একটা অদ্ভুত ব্যাপার চোখে পড়ত। দেখত, মণিকা কামরার একদিকের দরজা দিয়ে ভেতরে উঠল বটে–কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আর একদিনের দরজা দিয়ে নেমে পড়ল রেল লাইনের খোয়র ওপর। সেখান থেকে প্ল্যাটফর্মে উঠে ওভারব্রিজ পেরিয়ে মিশে গেল ভিড়ের মধ্যে।
.
চোদ্দোতলা ফ্ল্যাটবাড়ি; একতলায় মেঝে মুছছিল প্রসাদী। প্রসাদী এ বাড়ির ঝাড়ুদারও বটে, দারোয়ানও বটে। কো-অপারেটিভ হাউসিং স্কিমে তৈরি ফ্ল্যাটবাড়ির সবাইকেই সমান যত্ন করার দায়িত্ব তার।
হলঘরের মোজেক মেঝে মুছছে প্রসাদী। ঘরে আর কেউ নেই। তাই গান ধরেছে গলা ছেড়ে। পুরু লেন্সের সুতো বাঁধা চশমাটা মাঝে মাঝে পিছলে নেমে আসছে নাকের ডগায়। সেই অবস্থাতেই মেরে স্বপ্নেকী রাণীকে ডাকছে তারস্বরে।
আচমকা স্তব্ধ হল রাসভ কণ্ঠ। কারণ, প্রসাদীর অদূরে ভোজবাজীর মতো এসে দাঁড়িয়েছে একটি নারীমূর্তি। আগুনের মতো রূপ তার। অঙ্গ ঘিরে বেনারসীর বাহারে সে-রূপ যেন দাবাগ্নির মতো লেলিহান।
মেয়েটি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে প্রসাদীর দিকে। মুখে কথাটি নেই। কিন্তু বিশাল দুটি চোখে যেন কিসের অনুনয়।
প্রসাদী তার কর্তব্য করল–কাকে খুঁজছেন?
ব্যারিস্টান বারীন বাগচিকে।
উনি তো এখন থাকেন না। কখন থাকেন?
সন্ধের পর। আর সকালের দিকে।
কামরা নম্বর?
পঁয়তাল্লিশ। দশতলার বি ব্লক।
ফোন আছে?
হ্যাঁ।
কত নম্বর?
নম্বর জানতে বারীন বাগচির চিঠির খুপরির সামনে গেল প্রসাদী। তারপর নম্বর বলতে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখল, মেয়েটি নেই।
.
সেইদিনই সন্ধ্যের পর বারীন বাগচির টেলিফোনে ভেসে এল নারীকণ্ঠ।
আপনি ব্যারিস্টার বাগচি?
দ্যাটস মি।
মেয়েটি আর কোনও জবাব দিল না। রিসিভার রাখার শব্দ ভেসে এল।
ভুরু কুঁচকে সিগার কামড়ে ধরল বারীন বাগচি। ব্যাপারটা যেন কেমনতর। এই মেয়েটিই কি আজ দুপুরে তার খবরাখবর নিয়ে গেছে প্রসাদীর কাছে?
পরের দিন সকালবেলা আবার টেলিফোন ভেসে এল সেই নারীকণ্ঠ।
বারীন বাগচি?
স্পিকিং।
টুকরো হাসি–আপনার সঙ্গে আলাপ করতে চাই।
কেন?
আলাপ হলেই বুঝবেন।
আজকে আসুন। ফ্ল্যাটে একটা টি-পার্টি দিচ্ছি। সন্ধ্যে ৭টা। আলাপ করার উপযুক্ত সময়।
থ্যাকংস। লাইন কেটে গেল।
.
সারাদিন রহস্যময়ীর কথাগুলো পাক খেল বারীন বাগচির ব্যাচেলার মগজে। রোমান্স? মন্দ কি!
সন্ধে নাগাদ ফ্ল্যাটে যখন টি-এর ফাঁকে ফাঁকে দু-চারটে গেলাসের রঙিন পানীয় বিলি হচ্ছে। ঠিক তখনি একটি আশ্চর্য সুন্দরী মেয়ের দিকে বারীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করল তার বন্ধু সঞ্চয়।
বলল–বারীন, মেয়েটাকে কখনো দেখেছি বলে তো মনে হচ্ছে না। তোর নতুন বান্ধবী নাকি? সমানে তোর দিকেই তাকিয়ে আছে।
চকিতে তাকাল বারীন। দেখল, দরজার ঠিক পাশটিতে দাঁড়িয়ে যেন মূর্তিমতী প্রদীপশিখা। মানুষ এত রূপবতীও হয়?
মন্ত্রমুগ্ধের মতো পায়ে পায়ে মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল বারীন। হাতের মদের গ্লাস হাতেই রইল। চোখে চোখ লেগে রইল চুম্বকের মতো।
আপনি?
মেয়েটি হাসল। বারীন দেখল, মোনালিসা যেন মূর্ত হল হাসির মধ্যে।
বারীন বলল–আপনি ফোন করেছিলেন?
জবাব দিল না অপরূপা। বিশাল নয়নের চাহনি ফিরল চওড়া বারান্দার দিকে। বারান্দায় আলো-আঁধারি, জাপানি ফানুস আর ক্যাকটাস।
বুঝল বারীন। পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়াল ব্যালকনিতে। একপাশে সেই মেয়েটি। আর একপাশে সঞ্জয়।
জাপানি ফানুসের রামধনু-রশ্মির মধ্যে পরীর মতো চেয়ে আছে মেয়েটি।
বারীন বিস্মিত। বিস্মিত সঞ্জয়ও। বিস্ময়ের মাঝেই হাতের গ্লাস ঠোঁটের কাছে তুলেছিল বারীন। কিন্তু ঠোঁটের সঙ্গে পানীয়র মিলন হওয়ার আগেই হাত থেকে গ্লাসটা টেনে নিল মেয়েটি। নিয়ে গেলাস উপুড় করে ধরল পাশের ক্যাকটাসের টবে।
বলল সঞ্জয়কে–চা আনবেন?
সঞ্জয় বেরিয়ে গেল।
মেয়েটি বলল–হ্যাঁ, আমিই ফোন করেছিলাম। আমিই দেখা করতে এসেছিলাম। আমার নাম মণিকা। আমি বড় একা।
বারীন কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
মণিকা কাশ্মিরী শালটা গা থেকে খুলে মেলে ধরল বারান্দার বাইরে। হাওয়ায় বেশ টান। ঝড়ের টান। হাত থেকে শালটা খসে গিয়ে আটকে গেল হাততিনেক দূরে ঝুলন্ত রেডিও এরিয়ালের কঞ্চিতে।
