অসম্ভব।
এ ক্ষমতা অনেকেরই আছে, মিসেস দত্ত। রাবেয়ারও আছে। কিন্তু আপনি একা থাকেন, আপনার ঘরে রাত্রে ঘুরঘুর করে কেন সূক্ষ্ম শরীরে–এটাই একটা রহস্য।
নিন, নিন, কফি খানসারাদিন খেটে মাথা গরম হয়েছে আপনার।
সেইদিন রাত্রেই খুন হয়ে গেল ললিতা।
.
ভোরবেলা দুধের লাইন দিয়ে বোতল নিয়ে এসে ললিতাকে ডেকে তোলা মণিরামের বিশ বছরের অভ্যেস। সেদিন হাঁকডাক দরজায় ধাক্কা মেরেও কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে ঠেলে খুলেছিল পাল্লা।
পরক্ষণেই তার বিকট চিৎকারে চমকে উঠেছিল বাড়ির সকলে। ছুটতে ছুটতে এসে দেখেছিল, খাটে পড়ে ললিতার নগ্ন দেহ। ব্রা পড়ে আছে মেঝেতে। ব্লাউজটা ঠেসে ঢোকানো মুখে। সায়ার দড়ি দিয়ে হাত আর পা বাঁধা।
ঘর লণ্ডভণ্ড। দেরাজ তছনছ। স্টিল আলমারি খোলা–ভেতরকার সিক্রেট চেম্বার থেকে জড়োয়া গয়নার বাক্স উধাও। এমনকী ললিতার কান থেকে হিরের দুল আর টেবিল থেকে সোনার হাতঘড়িও নিপাত্তা।
পুলিশ এল। ঘণ্টাচারেক লাগল সবাইকে জেরা করতে, হারানো জিনিসপত্রের ফর্দ বানাতে, মৃতদেহের ফটো নিতে, নানা জায়গায় পাউডার ছড়িয়ে আঙুলের ছাপ তুলতে এবং কিছু বস্তু ফোরেনসিক পরীক্ষার জন্যে বাছাই করতে। সবশেষে মৃতদেহ মুড়ে পাঠিয়ে দেওয়া হল পোস্টমর্টেম করার জন্যে।
জেরার ফলে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু জানা গেল না। মণিরাম আর মাসুদ দুজনেই একসঙ্গে রোজ ভোরবেলা দুধের লাইন দেয়। সেদিন মণিরাম একাই দুধ এনেছে। তার চিৎকার শুনে মিঃ মালকানি দৌড়ে এসেছেন। একটু পরে এসেছেন রাবেয়া। রাত একটায় ক্লাব থেকে ফিরেছিলেন মিস্টার মালকানি। বাড়ি ফিরেই অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘুম ভাঙে মণিরামের চিৎকারে। রাবেয়া তখন ছিল রান্নাঘরে। মাসুদ যে সেদিন দুধ আনতে যায়নি, একথা জানা গেল মণিরামের কাছেই। তার আগে পর্যন্ত রাবেয়া মালকানি কেন বলল না মাসুদ দুধ এনে দেয়নি রোজ সকালের মতো– ভেবে পেল না অফিসার। সে যে বাড়িতেই নেই, একথাটাও প্রকাশ পেল পুলিশ অফিসার যখন তাকে ডেকে পাঠাল জেরা করার জন্যে। মেরীকে জেরা করে জানা গেল সে গেছিল নাইট শোতে সিনেমা দেখতে।
মাসুদকে আর পাওয়া যায়নি। পাওয়া যায়নি জহরতের বাক্স।
একটা রহস্যই কেবল ধাঁধা হয়ে রইল অফিসারের কাছে। জহরতের বাক্স যে গোপন চেম্বারে থাকত, সেটা খোলবার বিশেষ তালাটার সংখ্যাগুলো ললিতা ছাড়া কেউ জানত না। তা সত্ত্বেও তালা খুলল কে?
ললিতা নিজে নয়তো? ফোরেনসিক রিপোর্টেও প্রকাশ পেল, মৃত্যুর আগে সহবাস করেছিল। ললিতা। কার সঙ্গে?
তারপর তার হাত-পা সায়ার দড়ি দিয়ে বেঁধে, মুখে ব্লাউজ ঢুকিয়ে, মারা হয়েছে গলা টিপে। মাসুদের হাতে জহরতের বাক্স তুলে দেওয়ার পরই কি মৃত্যু এসেছিল এইভাবে?
বিপুল চৌধুরী সবই জানল যথাসময়ে। বুঝলও অনেক কিছু। কিন্তু মুখ খুলল না।
কাহিনি শেষ করে আবার চাপাগলায় ফিসফিস করে সেই গানটা গেয়ে উঠল পাগলটা, তারা আসছে…তারা আসছে..রোজ রাতে তারা আসছে..আসছে..আসছে…। …রাতের অন্ধকারে হুহু হাওয়ায় বুকফাটা হাহাকারের মতো শব্দগুলো ভেসে গেল বাতাসে।
ইন্দ্রনাথ বললে, জহরতের বাক্সর তালা খোলার সিক্রেট নাম্বার জেনেছিল রাবেয়া সূক্ষ্ম শরীরে রোজ রাতে ঘরে আসত ওই জন্যেই।
ঠিক কথা। বললে পাগলটা।
মাসুদের কাছে রাবেয়াই জানিয়ে দিয়েছিল সিক্রেট নাম্বারটা।
তাও ঠিক।
ললিতাকে আগে খুন করেছিল মাসুদ–পরে ধর্ষণ করেছিল ব্যাপারটাকে কদর্যভাবে সাজানোর জন্যে। ফোরেনসিক রিপোর্টেও নিশ্চয় তা প্রকাশ পেয়েছে।
পেয়েছিল। খুনিকে ধরতে না পেরে অফিসার তা চেপে গেছিল।
কিন্তু মাসুদ, কারা আসছে রোজ রাতে তোমার কাছে…তা তো বললে না?
রাবেয়ার সূক্ষ্ম শরীর–এখনও সে চায় আমাকে। জহরতের বখরা পেয়েও খুশি নয়।
আর একজন?
লিলিতার প্রেতাত্মা।
কেন?
চোখে চোখ চাইল মাসুদ। অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করছে দুই চোখ।
কেন? কেন? কেন? আমি নিজেই জানি না কেন? কী চায় সে? জহরত ফেরত চায় না– তবে? রাবেয়া যা চায়, তাই কি? চোখেমুখে তাই কি অমন মিনতি ফুটিয়ে তোলে? কিন্তু কেন? কেন? কেন? সব তো শেষ হয়ে গেছে–আবার কেন চাই সেই কদাকার–
উঠে দাঁড়াল মাসুদ। আস্তে-আস্তে দূর হতে দূরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল তার মূর্তি। চাপাগলায় গানটা কিন্তু লেগে রইল ইন্দ্রনাথের কানে।
তারা আসছে…তারা আসছে…রোজ রাতে তারা আসছে…আসছে…আসছে…।
*পরিবর্তন পত্রিকায় প্রকাশিত (শারদীয় সংখ্যা)।
কনে হল বিধবা
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো নিজেকে দেখল মণিকা। বিধবার বেশে কোনও ত্রুটি নেই। অথচ এই সেদিন বেনারসী পরে শিবমন্দিরে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল সে। আশা ছিল এই আয়নার সামনে বেনারসী পরেই স্বামীর পাশে দেখবে নিজেকে। কিন্তু…।
মণিকার চোখ শুকনো কেন? জবাব দিল মণিকার মন। বলল–মণিকা তো বেঁচে নেই।
আলমারি থেকে টাকার বাণ্ডিলটা বার করে আনল মণিকা। পাঁচ ভাগ করে রাখল সুটকেসের ওপর। প্রতিটি ভাগে রইল সমান পরিমাণ টাকা। একদৃষ্টে অনেকক্ষণ চেয়ে রইল পাঁচ থাক টাকার দিকে। বুকের তুফানের ছায়াও পড়ল না চোখের তারায়। কী করে পড়বে? মণিকা তো বেঁচে নেই!
কেবল পাঁচ থাক টাকার প্রতিফলন পাঁচ-পাঁচটি ধিকিধিকি প্রতিজ্ঞাস্বরূপ জ্বলতে লাগল ওর বিশাল দুই চোখে।
