কিন্তু এখন আমি ক্লান্ত। খুব একা। আপনি রমেশের বন্ধু। আমারও। তাই আপনার কাছেই মন খুলে কথা বলা যায়। আপনি জানেন নিশ্চয়, রমেশের মৃত্যুর পর আমার কাছে বিয়ের অফার পাঠিয়েছিল অনেকে?
জানি। আবার বিয়ের বয়স তো আপনার পেরিয়ে যায়নি। যৌবনকেও, এক্সকিউজ মি ফর মাই ফ্র্যাঙ্কনেস, আপনি টিকিয়ে রেখেছেন। নিঃসঙ্গতা একটা অভিশাপ তা সত্ত্বেও ফিরিয়ে দিয়েছেন সবাইকে।
কারণ, একলা থাকাটাই আমার সয়ে গেছে। রমেশের জায়গায় আর কারও আসার দরকার নেই। যাক সে কথা, আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছি একটা বড় রকমের সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য।
বলুন।
আমি কারবার বেচে দেব। আপনি খদ্দের দেখুন।
সেকী! চালু কারবার, এত গুডউইল–
ভালো দর এখনই পাওয়া যাবে। অনেক ভেবে এই ডিসিশন নিয়েছি আমি। এর আর নড়চড় হবে না। আপনি ব্যবস্থা করুন।
বেশ তাই হোক।
.
মিসেস দত্ত, বিজনেস তো বিক্রি করে দিলেন, বাড়িটাকে দুভাগ করছেন কেন?
ভাড়াটে বসাব বলে।
ভাড়াটে! টাকার অভাব তো আপনার নেই।
মিঃ চৌধুরী, আপনি সেদিন বলে গেছিলেন না নিঃসঙ্গতা একটা অভিশাপ? হাড়ে হাড়ে তা ফিল করছি। আপনি বন্ধু মানুষ। সবই জানেন। কফি পার্টি, কিটি ক্লাব, মিক্সড ক্লাব, সোস্যাল সারভিস, লাইব্রেরি-বই–কোনও কিছুই আমার এই ফাঁকা জীবনটাকে ভরিয়ে তুলতে পারছে না। বিজ্ঞাপন লাইনেও কিছুদিন মন ঠেলে দিলাম–মন ভরল না। তাই–
ভাড়াটে বসাবেন। কিন্তু যেচে উৎপাতকে ডেকে আনা হবে না?
বিজ্ঞাপনের জবাব এসেছে অনেক। উৎপাতের ভয়ে কাউকে বেছে নিতে পারছি না। আপনার পরামর্শ চাই সেই কারণেই। কীরকম ভাড়াটে হলে উৎপাত থাকবে না, অথচ নিঃসঙ্গতা ঘুচবে– বলতে পারেন?
নিতান্তই যদি ভাড়াটে বসাতে চান কথাবার্তা বলে নিঃসঙ্গতা ঘুচোনোর জন্যে, তাহলে বলব রিটায়ারড ফ্যামিলি রাখুন। এমন ফ্যামিলি যাদের ছেলেপুলে নেই।
ঠিক বলেছেন। এরকম একটা ফ্যামিলি নিজেই এসেছিল সেদিন। মিস্টার অ্যান্ড মিসেস মালকানি। ননবেঙ্গলি কিন্তু অত্যন্ত ভদ্র। নিঃসন্তান।
মালকানি। মিসেস কি খুব মোটা? দেখতে শুনতে মোটেই ভালো নয়।
আপনি চেনেন?
খুব ভালোভাবে চিনি। সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের বড় অফিসার ছিলেন। আমাদের অনেক অর্ডার পাইয়ে দিয়েছেন। কিন্তু–
কীসের কিন্তু—
ওঁর স্ত্রী সম্বন্ধে অনেক রকম কথা শুনেছি তো!
কীরকম কথা বলুন তো?
মিসেস মালকানির ছেলেপুলে না হওয়ার কারণটা আপনাদের ক্ষেত্রে যা হয়েছে, ঠিক তার উলটো। কিছু মনে করবেন না খোলাখুলি কথা বলছি বলে।
না, না, বলুন আপনি। সবই জানা দরকার।
তাহলে আরও কিছু জানিয়ে রাখি। যেহেতু রাবেয়া মালকানির গর্ভে কোনওদিনই সন্তান আসবে না তাই…
বলুন?
তাই উনি একটু উচ্ছঙ্খল প্রকৃতির। মানে…
থাক, কারওর চাহিদা বেশি থাকে। রাবেয়া যে পন্থায় সুখে থাকতে চায়, তাতে আমার অসুখী হওয়ার কোনও কারণ নেই। মিঃ মালকানি লোক কীরকম?
অত্যন্ত অনেস্ট। ক্লাব নিয়েই সময় কাটিয়ে দেন। নিষ্কলঙ্ক চরিত্র।
তাহলে এই ফ্যামিলিকেই ভাড়া দেব। আপনার হেল্প পাব তো?
চিরকাল পাবেন।
.
কিন্তু এমন সব ঘটনা ঘটতে লাগল মালকানি দম্পতিকে বাড়ি ভাড়া দেওয়ার পর থেকে যে বিশেষ সেই ঘটনাগুলো মস্ত প্রহেলিকা হয়ে দাঁড়াল রমেশের প্রিয় বন্ধু বিপুল চৌধুরীর কাছে।
ললিতা যে বড় একা, এই কথা শোনার পর থেকেই বিপুল চৌধুরী প্রায় আসত তার কাছে। কোম্পানির মালিক এখন অন্য ব্যক্তি, কিন্তু ললিতার সঙ্গে বন্ধুত্বে ছেদ পড়েনি। সময় পেলেই সন্ধে নাগাদ এসে চা-কফি খেত আর গল্প করত।
একদিন বললে ললিতা, মিঃ চৌধুরী, আপনি ভূত মানেন?
হেসে বললে বিপুল চৌধুরী, একেবারেই না।
কিন্তু আমি ইদানীং প্রায় রাতে ছায়ার মতো কাকে যেন ঘুরতে দেখি আমার ঘরে। আলো জ্বাললেই আর তাকে দেখতে পাই না। দরজাও দেখি বন্ধ রয়েছে ভেতর থেকে।
আপনার মনের ভুল। এক কাজ করতে পারেন।
কী?
আপনার মেড সারভেন্টটার কী যেন নাম?
মেরী। কেন বলুন তো?
ওকে এনে ঘরে শোয়াতে পারেন। হাসছেন কেন?
মেরীর চরিত্রটা আপনি জানেন না বলে। সন্ধের পর ওর ঘরে নাগর আসে–থাকে তো সারভেন্ট কোয়ার্টারে। সব্বাই জানে।
রাত্রে?
প্রায় সারা রাত চলে এই কাণ্ড। হাড় জ্বালিয়ে খেল আমার। মালকানিদের ওই যে ছোকরা চাকরটা আছে। দেখেছেন তো?
মাসুদ?
হ্যাঁ। মেরীর নাগর।
আপনি কিছু বলেন না?
বলে কোনও লাভ নেই। কারণ, রাবেয়া সম্বন্ধে আপনি যা বলেছিলেন, তা অক্ষরে-অক্ষরে সত্যি। তবে রুচিটা যে এত নীচে নামতে পারে, সেটাই ভাবা যায় না। মাসুদ শুধু মেরীর নয়…রাবেয়ারও।
বলছেন কি!
এ বাড়ির সব্বাই জানে। মিঃ মালকানিই বোধহয় জানেন না।
জানেন নিশ্চয়। কিছু করার নেই বলেই ক্লাব নিয়ে পড়ে থাকেন। আচ্ছা, একটা কথা জিগ্যেস করব?
আপনি যে ছায়ামূর্তিকে মাঝে-মাঝে ঘরের মধ্যে দেখেন, তাকে দেখতে কীরকম বলুন তো?
স্পষ্ট দেখতে পাই না। তবে খুব মোটা।
অনেকটা রাবেয়ার মতো দেখতে কী?
রাবেয়ার মতো..তা…হ্যাঁ…প্রায়ই তাই। কিন্তু রাবেয়া আসবে কী করে বন্ধ ঘরে?
আসে ওর সূক্ষ্ম শরীর!
সূক্ষ্ম শরীর! কী বলছেন বুঝছি না।
রাবেয়া মালকানির এই অলৌকিক ক্ষমতাটার কথা আগে আপনাকে বলিনি বিশ্বাস করবেন বলে। কোনও ভাড়াবাড়িতেই টিকতে পারেনি এই কারণেই। সূক্ষ্ম শরীরে রাত্রে অন্যের ঘরে গিয়ে সেক্স দেখা ওর একটা অত্যন্ত কদর্য অভ্যেস।
