ব্যাবসা।
চাকরি করবে না?
জীবনেও না। বাবার এত টাকা ব্যাবসা করে। আমিও যাব সেই পথে।
মাত্র পাঁচশো টাকা পুঁজি নিয়ে?
ওর চাইতেও বড় পুঁজি যে আমার আছে, তা তো তুমি জানো ললিতা?
জানি, জানি, জানি। পুরুষের সব চাইতে বড় পুঁজি তার সাহস, তার উদ্যম–তা তোমার আছে। আর আছে ব্যক্তিত্ব, আছে স্মার্টনেস–তুমি পারবে, রমেশ, তুমি পারবে, কিন্তু ব্যাবসাটা কীসের?
পাইকারি বাজার থেকে মাল কিনে বাড়ি-বাড়ি ডেলিভারি দেব। টেন পারসেন্ট প্রফিটই যথেষ্ট। পাঁচশো টাকা পুঁজি নিয়ে–
এর বেশি হয় না। বেশ, আমি রইলাম চাকরি নিয়ে তুমি ভাগ্য ফেরাও বাণিজ্য করে। দেখা যাক কী আছে অদৃষ্টে।
আবার অট্টহেসে উঠেছিল অদৃষ্ট। এবারও তা শুনতে পায়নি দুজনের কেউই।
.
রমেশ, সত্যিই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুললে। দু-বছরেই ডেলিভারি ভ্যান!
নিজেই চালাব। অর্ডার সাপ্লাই বিজনেসে ভ্যানটা খুবই দরকার।
বলেছিলাম না তোমাকে, উদ্যোগী পুরুষেরই সহায় হয় ভাগ্য।
অদৃষ্টকে তো তৈরি করে নেওয়া যায় পুরুষকার দিয়ে, তাই নয় কি ললিতা?
আবার বিপুল রবে অট্টহেসে উঠেছিল অদৃষ্ট–না, শুনতে পায়নি কেউই।
রমেশ, আজ আমাদের পঞ্চম বিবাহ বার্ষিকী।
আর আজকের দিনেই উদ্বোধন হবে আমার নতুন ব্যাবসার বিলডিং আর ব্রিজ কনস্ট্রাকসন।
হিন্দি ফিল্মের কাহিনির মতো অলীক মনে হচ্ছে। তাই না রমেশ? মাত্র পাঁচশো টাকা পুঁজি নিয়ে পাঁচ বছরেই সল্টলেকে বাড়ি, গাড়ি—
এইবার তোমার শেষ সাধটা পূর্ণ করা দরকার, ললিতা। এবার আর না বলতে পারবে না।
আসলে সাধটা তোমার নিজেরই। বাবা হওয়ার ইচ্ছে হয়েছে বললেই হয়।
কার না হয়, ললিতা? যে আসবে, সে ছেলেই তোক কি মেয়েই হোক–তার চোখ যদি তোমার মতো সুন্দর না হয়–
আর তার হাইট যদি তোমার মতো ছফুট না হয়—
সর্বনাশ ললিতা, ছফুট হাইটের মেয়ের বর জুটবে না যে।
রমেশ, যে পৌরুষ দিয়ে এই বিপুল সম্পত্তি অর্জন করেছ, সেই পৌরুষ দিয়েই তুমি আমাকে ছেলেই উপহার দেবে–মেয়ে নয়।
অট্টহেসে উঠেছিল দীর্ঘদেহী, অত্যন্ত সুপুরুষ, প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী রমেশ। তাই সম্ভবত শুনতে পায়নি অদৃষ্টের অট্টহাসি!
.
অত ভেঙে পড়লে কি চলে রমেশ?
যে পুরুষ বউকে সন্তান উপহার দিতে পারে না, তার ভেঙে পড়াই তো স্বাভাবিক, ললিতা।
ইউরোপ আমেরিকার ডাক্তাররা তোমার শরীরের হরমোন ঘাটতি মিটিয়ে দিতে পারবে। চল, সেখানেই যাই। আমিও যাব।
কিছু হবে কি?
চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করাই পুরুষের ধর্ম। তুমি না পুরুষ?
আমি?
রমেশ, তোমার ওই হতাশ হাসি আমার বুক ভেঙে দিচ্ছে–দেখাই যাক না অদৃষ্টে কী আছে?
অদৃষ্ট স্বয়ং তা জানতেন বইকি। তাই এবার আর তিনি অট্টহাস্য করলেন না। কেবল মুচকি হাসলেন।
তাবড়-বড় ডাক্তারদের দোরে ঘুরে মুখ চুন করে ফিরে এলে স্বামী-স্ত্রী। রমেশের ঔরসে ললিতার মা হওয়ার সম্ভবনা নেই একেবারেই।
.
লিলিতা, একটা কথা বলব?
অমনভাবে বলছ কেন? না ঘুমিয়ে চোখমুখের অবস্থাটা কী করেছ আয়নায় গিয়ে দেখে এসো।
আগে কথাটা বলি–
তোমার কোনও কথা এখন শুনতে চাই না। এতবড় কারবারের দিকে একেবারেই নজর দিচ্ছ না। আকাশপাতাল চিন্তা করে সমস্যার সমাধান তো হবে না। অদৃষ্টে যা আছে, তা মেনে নেওয়াই ভালো।
অদৃষ্ট?…হ্যাঁ, অদৃষ্টই বটে! এই প্রথম অদৃষ্টের কাছে হার মানলাম আমি। কিন্তু সমস্যার সমাধান একটা আছে।
কী শুনি?
রাগ করবে না তো?
কোন কালে করেছি?
ললিতা…ব্যাপারটা ডেলিকেট…মানে, আমার কোনও আপত্তি নেই…তোমার সবচেয়ে বড় সাধপূরণ করার জন্যে আমি সবকিছুই মেনে নিতে পারি। আমি বলছিলাম…আমি বলছিলাম…
বল না? অত কিন্তু কিন্তু করছ কেন?
তুমি…তুমি…
কী হল? ফ্যাকাশে মেরে গেলে যে?
তুমি…আর কাউকে দিয়ে…মানে, এরকম নজির তো সমাজে আছে…
ছিঃ! রমেশ! ছিঃ! এত নোংরা সমাধানটা তোমার মাথায় এল কী করে?
নোংরা!
কদর্য! অত্যন্ত কদর্য! ভবিষ্যতে আর এ নিয়ে কোনও কথা আমাকে বলবে না।
শোন ললিতা, এখন তোমার বয়স ঊনচল্লিশ–এখনও সময় আছে।
চল্লিশ থেকেই শুরু হোক তোমার নতুন জীবন আমাদের দুজনের ছোট্ট সংসারে নাই বা এল তৃতীয় জন? সেই হোক আমাদের–
কিন্তু–
আর কোনও কথা নয়। কারবারের মধ্যে ডুবে যাও—
তোমার শেষ সাধটা–
শিকেয় তোলা থাক।যাও, দয়া করে নিজে গাড়ি ড্রাইভ আর কোরো না। দু-দুটো অ্যাকসিডেন্ট থেকে বেঁচ্ছে। যার মাথার ঠিক নেই–তার হাতে স্টিয়ারিং যেন না থাকে–
আমার কথাটা—
আবার ওই কদর্য কথা?
.
মেমসাব।
কী হয়েছে, রামলোচন? অমন করছ কেন? সাব কোথায়?
হাসপাতালে?
আবার অ্যাকসিডেন্ট? কে ড্রাইভ করছিল?
সাব নিজেই। আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে—
চল যাই।
মেমসাব।
অমন করে চেয়ে আছ কেন? কী হয়েছে, রামলোচন? কী হয়েছে? বল কী হয়েছে?
সাব আর বেঁচে নেই।
চল্লিশেই জীবন ফুরিয়ে গেল জীবনযুদ্ধে জয়ী রমেশের নতুন করে নতুন জীবন শুরু করার আগেই।
কৌতূহলী অদৃষ্ট কি সরে গেলেন?
তাই কি হয়? ললিতার অদৃষ্ট লিখন ফলিয়ে যেতে হবে না?
.
সেক্রেটারিবাবু এসেছেন মেমসাব।
ভেতরে নিয়ে এসো।আসুন মিঃ চৌধুরী। সিরিয়াস ব্যাপার নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই–অফিসে সেটা সম্ভব নয়। এই একবছর বিজনেস চালিয়েছি আপনার সাহায্য নিয়েই নইলে পারতাম না।
এটা আপনার বিনয়, মিসেস দত্ত। মিস্টার দত্তর চাইতে আপনি কোনও অংশে কম যান না, তা হাতেনাতে দেখিয়ে দিয়েছেন।
