আর্নেস্টার তালুর ছাপের সঙ্গে বোতলের ছাপ মিলিয়ে দেখলাম। না দেখলেও চলত। কিন্তু নিয়মের খাতিরে এটুকু করতে হল। দেখলাম, অবিকল মিলে গেল দুটি ছাপ।
কেসের পরিসমাপ্তি শুনে কিন্তু অবাক হয়ে গিয়েছিল আর্নেস্টো। বিচারপতির মুখে যাবজ্জীবন কারাবাসের দন্ডাজ্ঞা শুনেও কিন্তু যতখানি বিচলিত হওয়া উচিত ছিল, তার অর্ধেকও হয়নি আর্নেস্টো। কারণ কী জানেন? ওকে আমি বলেছিলাম, এলসা কোনওদিনই বিশ্বাসঘাতকতা করেনি তার সঙ্গে। আর্নেস্টো জেল খেটে বেরিয়ে আসার পর এলসাকে খুঁজতে গিয়ে তাকে পায়নি। কেননা, এলসাও তো তখন ভিক্ষুকবৃত্তির অপরাধে শ্রীঘরে চালান হয়েছে । আর্নেসেটা ভেবেছিল এলসা বুঝি কোনও প্রেমিকের সঙ্গে ফুর্তি লুটতে গেছে–আসলে সে তখন ছিল পুলিশেরই হেফাজতে।
চার বছর পরে আজ আমার শুধু বয়সই বাড়েনি, রিও-ডি-জেনেরিও-র সি আই ডি-র চিফ হিসেবে নতুন খেতাবও পেয়েছি। কিন্তু আজও আমি মনে করতে পারি সেই রাতটির কথা যখন বাড়ি ফিরে আসার পর দেখেছিলাম ডিনার সাজিয়ে বসে রয়েছে আমার স্ত্রী। খাবার যে এত সুস্বাদু হতে পারে, তা আগে জানতাম না। স্ত্রীর পাকা হাতের কেক তৈরির সূত্ৰ-কাহিনি যখন বললাম, তখন তো হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ল ও। হাসিমুখে গিন্নি সেদিন বলেছিল–অফিসে যে সময়টা কাটাও, তার চাইতে বেশি সময় যদি আমার রান্নাঘরে খরচ করো, তাহলে হয়তো দেখা যাবে আরও অনেক কেস সমাধান করতে পারছ তুমি।
* আলফোনসো মার্তিনেল্লি (ব্রাজিল) রচিত কাহিনি অবলম্বনে।
কদাকার কেস
সল্টলেক স্টেডিয়ামের সামনে দিয়ে যে নতুন রাস্তাটা সোজা উত্তর দিকে চলে গেছে, সেই রাস্তা বরাবর করুণাময়ী স্টেট পর্যন্ত গেলে মাঝে অনেকগুলো সারকেল পড়ে চার রাস্তার মোড়ে।
থারড সারকেলটায় রোজ বিকেলবেলা একা গিয়ে বসে ইন্দ্রনাথ। বৃদ্ধ বায়ুসেবীরা এদিকে ততটা ভিড় করেন না। চারদিকে ফাঁকা মাঠ। এখানে ওখানে দু-একটা বাড়ি তৈরি হচ্ছে। আর বছরকয়েকের মধ্যে এখানে আর এভাবে হু-হুঁ করে বাতাস বইবে না, জায়গাটা আর এরকম নির্জন থাকবে না।
শুধু একজন এসে রোজ বসে ইন্দ্রনাথের অদুরে। চাপাগলায় প্রায় ফিসফিসানি স্বরে এক লাইনের একটা গানই গায় প্রতিদিন। উদাস চোখে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে হঠাৎ ফিসফিস করে তান ধরে আপন মনে।
তারা আসছে…তারা আসছে…রোজ রাতে তারা আসছে…আসছে…আসছে…আসছে।
শেষের দিকের আসছে শব্দ তিনটে যেন খাদের মধ্যে নামতে নামতে হারিয়ে যায় গলার মধ্যে।
গায়কের বয়স বেশি নয়। বড় জোর পঁচিশ। চেহারা সাধারণ, পোশাকও সাধারণ। উচ্চতা মাঝারি। গায়ের রং না ময়লা, না ফরসা। চোখমুখের মধ্যে এমন কোনও বৈশিষ্ট্য নেই যে মনে দাগ কেটে যায়।
দাগ কেটে যায় শুধু তার ওই চাপাগলার গানটা। একই গান। একই সুর। কিছুক্ষণ অন্তর একইভাবে গাওয়া। সন্ধে ঘনিয়ে এলে একইভাবে আস্তে-আস্তে হাঁটতে-হাঁটতে আর গাইতে গাইতে চলে যায় দূরের নতুন ফ্ল্যাট বাড়িগুলোর দিকে। নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় হু-হুঁ বাতাস বয়ে আনে অদ্ভুত শব্দগুলো চাপা হাহাকারের মতো?
তারা আসছে…তারা আসছে..রোজ রাতে তারা আসছে…আসছে…আসছে… আসছে।
একদিন উঠে গিয়ে তার পাশে বসল ইন্দ্রনাথ। সে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালে ইন্দ্রনাথের দিকে। চোখের চাহনি সুস্থ মানুষের চাহনির মতো নয়। পাগল। সন্দেহ নেই।
নরম গলায় বললে ইন্দ্রনাথ, গানটার মানে কী?
মানে শুনতে হলে একটা কেস শুনতে হবে খুবই কদাকার কেস, আস্তে-আস্তে থেমে থেমে বললে সে।
আমি শুনব। বললে ইন্দ্রনাথ।
তখন সে বলল কদাকার কেসের কদর্য কাহিনি। এবং তা লোমহর্ষকও বটে!
.
ললিতা ঘাড় বেঁকিয়ে বললে, রমেশ, এখন কী করবে?
গ্রানাইট কঠিন চোখে রমেশ বললে, তুমি যা চাও, তাই হবে।
তুমি খ্রিস্টান, আমি হিন্দু। তোমার বাবা বড়লোক, আমার বাবা গরিব মাস্টার। তা সত্ত্বেও বিয়ে করবে?
এখনও সন্দেহ আছে?
কিন্তু আমি তো তোমাকে বলেছি, আমার বিয়েতে শাঁখ বাজবে, উলুধ্বনি হবে, নিজের হাতে সিঁদুর টেনে দেবে সিঁথিতে। কিন্তু তোমার বাবা
চায় বিয়ে হবে গির্জেতে।
যদি আমি তা না করি।
আইনের পথে যাবে বাবা। সম্পত্তিচ্যুত হব, বাড়ির দরজা চিরকালের মতো বন্ধ হয়ে যাবে। কাগজে কাগজে লিগ্যাল নোটিশ ছাপা হবে।
তা সত্ত্বেও চাও হিন্দুমতে হোক বিয়ে?
তোমার এই সেন্টিমেন্ট বাবার সম্পত্তির চেয়ে অনেক বেশি দামি আমার কাছে।
রমেশ, আর এক বছর কাটিয়ে দিলেই মাস্টারস ডিগ্রি পেয়ে যাব দুজনে।
একটা ডিগ্রির লোভে আমাদের জীবন থেকে একটা বছরকেও আমি হারাতে চাই না, ললিতা।
বেশ, তবে তাই হোক।
হ্যাঁ। ঠিক তাই হবে। তোমার কোনও ইচ্ছেই অপূর্ণ রাখব না আমি।
অদৃষ্টের অট্টহাসি শোনা গিয়েছিল তখন অন্তরালে–শুনতে পায়নি দুজনের কেউই।
.
রমেশ, বিয়ে তো হল। পথের ফকির হলে। কলেজ ছাড়লাম। পকেটে মাত্র পাঁচশো টাকা। এবার?
শুরু হোক অদৃষ্টের সঙ্গে পাঞ্জা কষা। ব্যাচেলরস ডিগ্রিটা যখন আছে, টিচারের চাকরি একটা পাবেই।
রমেশ, আমার বাবা সারা জীবন মাস্টারি করেছে। সংসারের অভাব কোনওদিনই ঘোচাতে পারেনি। ও লাইনে আমি যাব না।
তবে কী করবে?
কেরানির কাজ।
পেয়ে গেছ মনে হচ্ছে?
এই তো অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। এবার বল, তুমি কী করবে?
