শুধোলাম–সোমবার রাতে কোথায় ছিলে তুমি? ওই রাতেই খুন হয়েছে এলসা।
ঠোঁট চেটে নিলে আর্নেস্টো। বলল–বন্দর অঞ্চলে ছিলাম। সারারাত সেইখানেই ঘুমিয়েছি আমি।
কেউ দেখেছিল তোমাকে? প্রমাণ করতে পারো তোমার কথা?
না, পারব বলে মনে হয় না আমার।
সে রাতে তাহলে এলসার ধারে কাছে যাওনি তুমি?
দিব্যি গেলে বলছি যাইনি।
ঠিক তো?
বেঠিক কিছু বলিনি সিনর মার্টিনেলি। ওই রাতে ওকে আমি দেখিইনি। একাজও আমি করিনি।
আর্নেস্টোকে সেলের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার হুকুম দেওয়া ছাড়া করণীয় আর কিছুই ছিল না। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল, এই সেই লোক যাকে আমি খুঁজছি। ভিখিরিরা সবসময়ে জটলা পাকিয়ে বাস করে। সে রাতে যদি বন্দর অঞ্চলেই থাকত আর্নেস্টো, তাহলে সমশ্রেণির কেউ না কেউ ওকে ঠিকই দেখতে পেত। এবং সেক্ষেত্রে নিজে থেকেই ওর অ্যালিবি আমাকে জানিয়ে দিত আর্নেস্টো।
আর্নেস্টোই হত্যাকারী। কিন্তু কী করে তা প্রমাণ করা যায়? সন্দেহের অভিযোগ কাউকে যে ফাঁসিতে ঝোলানো যায় না, এ তথ্য আর্নেস্টো জানে। আদালতে হাজির করলে এই মস্ত সুবিধেটাই পেয়ে যাবে সে।
এর পর কিছুদিন ধরে অনেকভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনেক প্রশ্ন করেছিলাম আর্নেস্টোকে। যতই ওকে চাপ দিতে থাকি, ততই মনে হতে লাগল ও যেন বুঝতে পারছে যে অকাট্য কোনও প্রমাণ হাতে না নিয়ে স্রেফ সন্দেহের বশে জেরা করে চলেছি ওকে। এক এক দফা সওয়ালজবাব হয়ে যাবার পরে ক্রমে ক্রমে অত্যন্ত অসভ্য হয়ে উঠতে লাগল আর্নেস্টো এবং দফায় দফায় আমিও ভেঙে পড়তে লাগলাম, রেণু রেণু হয়ে যেতে থাকে আমার মনোবল।
খুনের প্রায় দিন-দশেক পরে এক রাত্রে আর একবার শুরু করলাম আমার নিষ্ফল প্রচেষ্টা। শেষকালে যখন বুঝলাম আমার সমস্ত উদ্যমই নিরর্থক এবং কোনও মতেই পরিস্থিতির এতটুকু উন্নতিসাধন সম্ভব নয়, তখন কোটটাকে খামচে তুলে নিয়ে সিধে রওনা হলাম বাড়িমুখো। রীতিমতো নিরুৎসাহ হয়ে পড়েছিলাম আমি। শরীর-মন ভরে উঠেছিল অপরিসীম অবসাদে।
আমার ছোট্ট ফ্ল্যাটের দরজায় চৌকাঠ পেরোনোর আগেই লক্ষ্য করলাম পালটে গেছে সমস্ত আবহাওয়া রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছিল ভালো ভালো খাবার রাঁধার সুগন্ধ। দরজা খুলতেই ময়দা মাখা দু-হাত বাড়িয়ে সাদরে অভ্যর্থনা জানালে আমার স্ত্রী। হাতের তালুতে চারু অধরোষ্ঠের চুম্বন তুলে নিয়ে আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে খুশি-উচ্ছল স্বরে বলে উঠল–দু-এক মিনিটের মধ্যেই সব তৈরি হয়ে যাবে।
আমার খুব খিদে পায়নি। আর্নেস্টোর ইস্পাত-কঠিন আত্মপ্রত্যয়ের কথা ভাবতে ভাবতে জবাব দিলাম আমি।
হেসে উঠল আমরা স্ত্রী, বলল–টেবিলে খাবার এসে পৌঁছোনোর আগে পর্যন্ত চিরকালই ওই কথাই বলেছ তুমি।
একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়লাম। দেখলাম, এক বোতল মদ তুলে নিয়ে একটা কেকের মিশ্রণের ওপর খানিকটা মদ ও ঢালছে। ঢালা শেষ হলে বোতলটা নামিয়ে রাখল ও। দেখলাম ওর ময়দা-মাখা তালুর পরিষ্কার ছাপ উঠে এসেছে বোতলটার ঘাড়ের কাছে।…হৃদয়রেখা আর আয়ুরেখা দুটি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে এসেছে ওপরে বোতলের মুখের দিকে।
আর একবার তাকালাম ছাপটার দিকে এবং তার পরেই বিদ্যুৎচমকের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল সবকিছু।
কোটটাকে ঝপ করে তুলে নিয়ে এমনভাবে বিকট চিৎকার করে উঠেছিলাম যা শুনলে মনে হত যেন একটা উন্মাদ তারস্বরে সম্বোধন করছে তার বউকে।
এখুনি ফিরে আসছি, বলেই বোঁ করে উধাও হয়ে গেলাম রান্নাঘর থেকে।
পিছু পিছু এল না আমার স্ত্রী। এমনকী ডিনার ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার অনুযোগ নিয়ে উন্মাও প্রকাশ করল না। বহুদিন ধরে ঘর করতে হয়েছে তাকে গোয়েন্দার সঙ্গে–তাই এসব তার গা-সওয়া।
আমি তিরবেগে ফিরে চললাম অফিসে। সেটার প্রমাণ রয়েছে সেইখানেই।
ঠোঁটের কোনে উপহাসের হাসি ঝুলিয়ে এল আর্নেস্টো। কিন্তু আমার চোখের দৃষ্টি দেখেই এ হাসি মিলোতে বিশেষ দেরি লাগল না।
শান্তস্বরে বললাম–খুনের চার্জ আনছি আমি তোমার বিরুদ্ধে।
বলে, টেবিলের ড্রয়ার থেকে বার করলাম কাশাকার বোতলটা–যে বোতলটা দিয়ে পরপারে পাঠানো হয়েছে এলসাকে।
বোতলটা দেখামাত্র আর্নেস্টো বুঝলে তার বরাত মন্দ। আমতা-আমতা করতে থাকে ও।, না, আমি ইচ্ছা করে করিনি ও কাজ। ভুল হয়ে গিয়েছিল।
আর একটা শব্দও সহ্য করার মতো মনের অবস্থা আমার ছিল না। এক ধমকে ওকে চুপ করিয়ে দিয়ে বললাম–হ্যাঁ, ভুলই বটে, তোমারই ভুল। বোতলটাকে ওখানে ফেলে যাওয়াটাই হয়েছে। মহাভুল। বোতলের ওপর তালুর ছাপটা দেখে প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম ও ছাপ এলসার।
জিনিসটা আরও লক্ষ্য করা উচিত ছিল আমার। তালুর লম্বা লম্বা রেখাগুলো নীচের দিকে নামতে নামতে কাছাকাছি চলে এসেছে। তার মানে এই যে, বোতলটা যার হাতে ছিল, সে মদ ঢালবার জন্যে বোতল ধরেনি, ধরেছিল উল্টোভাবে হাতিয়ার হিসেবে, ঠিক এইভাবে।
মুগুর ভঁজার মতো বোতলটাকে এক পা ঘোরাতেই সে রাতের স্মৃতি হু-হুঁ করে ভাসিয়ে দিল আর্নেস্টোর মনের দুকূল। শুরু হল দয়াভিক্ষার পালা। এলসার সঙ্গে মদ্যপান করার সময়ে নাকি কথা কাটাকাটি শুরু হয় ওর সঙ্গে আর্নেস্টোর। ঝগড়ার বিষয় সেই একই–এলসার ওপর সন্দেহ। তখনই, বোতল দিয়ে ওর মাথায় দড়াম করে এক ঘা বসিয়ে দিয়ে পালিয়ে যাই আমি–স্বীকার করলে আর্নেস্টো।
