বেশ কিছুদিন একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম তালুর ছাপটার দিকে। হৃদয় রেখা আর আয়ু রেখাদুটো নিবিড় হয়ে নেমে এসেছিল বোতলের তলার দিকে। একটু আবেগের সঞ্চার হয় আমার মনে। ভাবি, হাতের এই রেখা দেখে কোনওও হস্তরেখাবিদ কী বলতে পারত আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে ছিল এলসার ললাটলিপি? কিন্তু দিবাস্বপ্নর অথবা অনুধ্যান করার সময় এটা নয়।
ভাবলাম, কী করা যায় এবার? আচ্ছা, এলসার তো পেশা ছিল ভিক্ষে করা। পৃথিবীর যে-কোনও বড় শহরে আছে এই বিপুল অথচ একান্ত ঘনিষ্ঠ সমাজটার উৎপাত। আমার সুযোগ খুবই ক্ষীণ ও সমপেশার কাউকে পাকড়াও করে আলাপ করা ছাড়া আপাতত আর কোনও উপায় আমি দেখি না।
.
নগরবাসী ভিখিরিরা সাধারণত মামুলি শ্রেণির বদমাশ হয়। খুনটুন করা এদের ইতিহাসে বড় একটা দেখা যায় না। শুধু তাই নয় নিজের পেশার কেউ যে খুন হয় এটাও কেউ চায় না।
ল্যাটিন ভিখিরি জানে খুনিরা অনায়াসেই খুন করতে পারে তাকে। কেননা, দু-একটা ভিখিরিকে নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো সময় সাধারণত সমাজের নেই। কাজেকাজেই এলসার সহকর্মীরা যখন দেখলে যে ওর হত্যাকারীকে খুঁজে বার করার সমস্যা নিয়ে বেজায় দুশ্চিন্তায় পড়েছি আমি এবং এমনভাবে সেই খুনিটার সন্ধান করছি যেন একটা নামকরা লোককে খুন করে বসেছে সে, তখন ওরা আমায় সাহায্য করতে শুরু করল। ওদের কথার মধ্যে থেকেই এল অভীপ্সিত সাহায্য। এলসা সম্বন্ধে যা কিছু জানত সব বলল ওরা। এক সময়ে একটা রাঞ্চের পরিচারিকা ছিল সে। তখন তার যৌবন ছিল, রূপ ছিল, তারপর তাকে ব্যাভিচারের পথে নামিয়ে আনে রাঞ্চের মালিকের ছেলে এবং বাসনা পরিতৃপ্তির পর তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যায় ভাঙাচোরা লোহার টুকরোর একটা স্কুপের ওপর।
বন্ধুবান্ধব? প্রত্যেকেই ভালোবাসত ওকে। বিশেষ কোনও বন্ধু? আর্নেস্টো নামে একটা ভিখিরির সঙ্গে কিছুদিন ছিল এলসা। কিন্তু পরে ওদের মধ্যে ঝগড়া হয়ে যায়।
ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। ভিখিরিদের মধ্যে ভালোবাসা, থ্যাবড়া চালাঘরের ভেতরে মদের বেঁকে কোদল, মাথার ওপর আচম্বিতে চোট.., এইভাবেই হয়তো ঘটেছে ব্যাপারটা।
কিন্তু আর্নেস্টো কোথায়? ভিখিরিরা তা জানে না। গত দিনদুয়েক ওকে দেখা যায়নি। কিন্তু সে নাকি রিও-র ব্রডওয়ে সিনেলাডিয়া ডিস্ট্রিক্ট-এর থিয়েটারের ভিড়ে কাজ করতো।
একজন ভিখিরি আমার সঙ্গে ফিরে এল পুলিশ হেডকোয়োর্টারে। জুয়াচোর বদমাশদের গ্যালারিতে আর্নেস্টোর ফোটোগ্রাফ দেখেই চিনতে পারল সে। সঙ্গে সঙ্গে হুলিয়া বেরিয়ে গেল তাকে গ্রেপ্তার করে আনার। কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার তাকে। আর, তারপরেই শুরু হল আমাদের ডিপার্টমেন্টের সেই কাজটি, যে কাজ সব গোয়েন্দাদের জীবনের একটা বিরাট অংশ জুড়ে থাকে এবং তা হচ্ছে প্রতীক্ষা–নিছক প্রতীক্ষা।
.
তিনদিন পরে নিয়ে আসা হল আর্নেস্টোকে।
ওর খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখের কোনাগুলো লাল, আর নোংরা চেহারার সঙ্গে পুলিশের ফটোগ্রাফের সাদৃশ্য বার করাই মহামুশকিলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। জেলখানার মধ্যে দাড়ি-গোঁফ কামানোর পর এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার পর তোলা হয়েছিল ফোটোগ্রাফটি। সনাক্তকরণে একটু প্রাথমিক অসুবিধা দেখা গেলেও লোকটা আর্নেস্টোই বটে।
মানুষটি ছোটখাটো কৃশকায়। নার্ভাস চোখে মিটমিট করেও বার বার তাকাতে লাগল আমার পালিশকরা টেবিল আর অফিসের পুরোনো দেওয়ালের দিকে।
মেয়েটাকে চেনো? টেবিলের ওপর থেকে এলসার ছবি ঠেলে দিয়ে শুধোলাম আমি।
এক পলক ছবিটার দিকে তাকালে আর্নেস্টো।
তারপর জবাব দিলে মদে-ভাঙা গলায়–নিশ্চয়। আমরা–আমরা খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। হলদে-হলদে দাঁত বার করে নার্ভাসভাবে একটু হাসবার চেষ্টা করল ও।
এলসা যে মারা গেছে, এ খবর তুমি পেয়েছ কি? প্রশ্নটা তিরের মতো ছুঁড়ে দিলাম ওকে লক্ষ্য করে।
বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে ওঠে আর্নেস্টোর চোখ।
মরবার আগে তোমার সঙ্গে তার একচোট হাতাহাতি হয়েছিল–খুন হওয়ার একটু আগেই, তাই নয় কি?
চুপ করে রইল আর্নেস্টো। অথবা মৃত্যুসংবাদ পেয়ে কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলল
সে।
কী জন্যে এ কাজ করলে আর্নেস্টো?
আমি? দিব্যি কেটে বলছি, আমি ওকে খুন করিনি… কাশির ধমকে মাঝপথেই আটকে গেল বাকি কথাটা এবং তখনই দেখা গেল সে যক্ষ্মারোগগ্রস্ত।
সামলে না নেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম আমি। তারপর আবার শুরু করলাম–ঠিক আছে, ঠিক আছে, এবার আমি শুনতে চাই সব কিছু, গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত। এলসাকে তুমি কতদিন থেকে চিনতে? ঝগড়াই বা করলে কেন? সমস্ত বলো। বুঝেছ?
সাগ্রহে মাথা নেড়ে সায় দিলে আর্নেস্টো। কাহিনিটা চটপট বলে ফেলার খুব ইচ্ছে দেখা গেল ওর মধ্যে। চার কি পাঁচ বছর হল এলসার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে তার। গত দু-বছর ওরা একসঙ্গে বাস করে এসেছে। কিন্তু ইদানীং ওর বিশ্বস্ততা সম্পর্কে সন্দেহ দানা বেঁধে উঠেছিল আর্নেস্টোর মনে। হপ্তা তিনেক আগে পুলিশের জালে ধরা পড়ে আর্নেস্টো। তারপর জেলের মধ্যেই কাটাতে হয়েছে কয়েকটা দিন।
জেল থেকে বেরিয়েই এলসার খোঁজ করতে লাগল ও। কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না ওকে। ও ভেবেছিল, নিশ্চয় অন্য কোনও ভিখিরির সঙ্গে সটকান দিয়েছে এলসা। তারপর কিন্তু এলসাকে আবার দেখতে পায় আর্নেস্টো। কিন্তু ওর অভিযোগ অস্বীকার করে এলসা। দারুণ ঝগড়া হয় দুজনের মধ্যে। তার বেশি কিছু নয়। এলসাকে খুন করেনি আর্নেস্টো।
