প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। বেশি প্রশ্ন নয়। কেননা আমি জানতাম এদের কাছ থেকে বিশেষ সাহায্য আমি পাব না। আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা–এই দুইয়ের তাড়নায় ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে ওরা কেউই চায় না অপরকে ফাঁসিয়ে দিতে। তাছাড়া পাশের চালাঘরের লোক কতটা খবর রাখে, তা তো কেউই জানে না। ওরা নাকি কাউকেই দেখেনি এবং অস্বাভাবিক কিছু শোনেও নি। কিছু দেখলে বা শুনতে পেলে তখুনি পুলিশকে না জানিয়ে কি তারা বসে থাকে হাত-পা গুটিয়ে?
মনে মনেই বলি, তাই বটে আইনকে অক্ষরে অক্ষরে তোমরা মেনে চলো কিনা। পুলিশকে সাহায্য করতেও কসুর করো না। কিন্তু তবুও যদিও বা কোনওদিন পাকড়াও করতে পারি খুনিকে–জানি তোমাদের এককণা সাহায্যও থাকবে না তার মধ্যে।
ভিড়ের মধ্যে সামনে এগিয়ে গিয়ে এমনই একটা প্রশ্ন করলাম যার উত্তরে সত্য না বললেই নয়।
জিজ্ঞেস করলাম–নিহত স্ত্রীলোকটি কে? একজন উত্তর দিলে–এলসা।
পুরো নাম কী?
পুরো নাম কোনওদিনই আমাদের বলেনি ও।
পেট চলত কী করে? ভিক্ষে করে।
আর কোনওপথে টাকা রোজগার করতো কি?
আমরা অন্তত জানি না।
বিয়ে করেছে?
যদিও বা করে থাকে, কোনওদিন দেখিনি ওর স্বামীকে।
ওর সঙ্গে আর কেউ থাকত এখানে?
দেখিনি কোনওদিন।
তোমাদের মধ্যে কেউ কিছু জানে কি?
সিনর মার্টিনেলি, আপনি তো জানেনই এর চেয়ে বেশি আর কিছু জানলে কতখানি খুশি হতাম আমরা।
সেই একঘেয়ে পুরোনো গল্প। পেছন ফিরে আবার গেলাম চালাঘরটার ভেতরে। ওদের কাছ থেকে আর কোনও খবর জানার সম্ভাবনা নেই। সম্ভবত, বেশি কিছু জানেও না ওরা। খুনখারাপি করাটা চালাঘরবাসীদের আওতার মধ্যে পড়লেও জিনিসটা ওরা ফ্যামিলির চৌহদ্দির বাইরে সরিয়ে রাখাই পছন্দ করে।
পুলিশের ডাক্তার জানত নিছক পয়েন্ট নিয়ে লেখা খুব সংক্ষিপ্ত রিপোর্টই পছন্দ করি আমি। ফিরে এসে দেখি লাশ পরীক্ষাপর্ব সাঙ্গ করে ফেললে সে। আমাকে দেখেই বলল–মাথায় চোট লাগছিল। খুলি চুরমার হয়ে গেছে। মারা গেছে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স মেয়েটার। পুষ্টিকর খাবার না খেতে পাওয়ায় চেহারা হয়েছে অস্থিসার। ঘণ্টা দশেক হল মারা গেছে।
তার মানে দাঁড়াচ্ছে–এই যে গত রাতে দশটা নাগাদ খুন হয়েছে এলসা। ঠিক এই সময়টায় স্ত্রীকে নিয়ে আমি বাড়ির কাছাকাছি একটা সিনেমা হাউসে মিকিমাউজ-এর ছবি দেখতে দেখতে মনের আনন্দে হাসছিলাম। আবার ঠিক সেই সময়টাতেই কোপাকাবানায় শুরু হয়েছিল প্রথম ফ্লোর-শো এবং ঝলমলে আলোয় আনন্দে ফুর্তিতে উচ্ছল হয়ে উঠেছিল রিও-র একটা অংশ।
ডাক্তারকে শুধোলাম–এই কী সব? আর কিছু নেই?
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে যায় ডাক্তার দরজার কাছে। বলে–আর একটা খবর। আকণ্ঠ মদ গিলেছিল মেয়েটা।
মদ গিলেছিল! চিন্তার আনাগোনা শুরু হয় মস্তিষ্কের কোষগুলোয়। ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট। পয়সার লোভে নিশ্চয় একাজ কেউ করেনি। কেননা, পকেট হাতড়ে কয়েকটা ক্রুজিরোজও পাওয়া গেল না। তাছাড়া, নিজের পয়সায় সাধারণত কেউ মদ্য পান করে না। আর একবার চোখ বুলিয়ে দেখা যাক কী পাওয়া যায় আশেপাশে।
আর একবার তল্লাসি চালিয়ে নতুন তথ্য বলতে বিশেষ কিছুই পাওয়া গেল না শুধু একটা খালি বোতল ছাড়া। মেঝের ওপর গড়াগড়ি যাচ্ছিল বোতলটা। তর্জনীটা বোতলের মুখে আঁকশির মতো আটকে দিয়ে তুলে ধরলাম নাকের কাছে। তখনও কাশাকার বিশ্রি অস্বস্তিকর গন্ধ পাচ্ছিলাম বোতলের মধ্যে। কাশাকা এক রকমের সস্তা মদ। আখ থেকে এখানকার লোকেরা চোলাই করে নেয় কাশাকা। বিশেষ করে এই কাশাকাটি যে সবচেয়ে সস্তা আর সবচেয়ে মারাত্মক, সে বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহই ছিল না। সামান্য কয়েকটা ক্রুজিরোজ-এর বিনিময়ে ধীরে ধীরে নিভিয়ে দিতে পারে তা যত কিছু যন্ত্রণা-চিন্তা-উদ্বেগ-ক্লেশ।
সন্তর্পণে বোতলটাকে কাগজ দিয়ে মুড়ে শেষবারের মতো চোখ বুলিয়ে নিলাম চারধারে। তারপর অ্যাসিস্ট্যান্টদের ডেকে হুকুম দিলাম লাশটাকে স্ট্রেচারে করে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিতে। পাহাড়ের পাশেই দাঁড়িয়েছিল অ্যাম্বুলেন্স।
ভিড় ঠেলে এগুচ্ছি, আস্তে আস্তে পা ফেলে নেমে আসছি ঢালু পথ বেয়ে এমন সময় শ্লেষতীক্ষ্ণ সুরে কে যেন পেছন থেকে বলে উঠল–গুড মর্নিং, সিনর মার্টিনেলি।
কণ্ঠস্বরের অধিকারী যদি জানত যে আমার দুজন সহকারী ওইদিনই আবার ফিরে আসবে শহরে–হোল্ড-আপ চার্জের বলে তাকে গ্রেপ্তার করতে–তাহলে এতখানি চ্যাংড়ামি করতে সে যেত না।
.
এ ধরনের খুনের তদন্তের একটা বিরাট অংশই হচ্ছে নিরানন্দ কর্মসূচীর একঘেয়েমি। পুলিশ হেড কোয়ার্টারে ফিরে আসার পরেই শুরু হল এই চক্রবৎ কর্মসূচীর পুনরাবর্তন।
লাশটা আনার পর আঙুলের ছাপ নিয়ে সনাক্ত করা হয়েছিল। এলসা কোয়েলহার বয়স সাতচল্লিশ। রেসিফি শহরের উত্তরাঞ্চল তার আদি নিবাস। বহু বছর ধরে ভিক্ষুক-বৃত্তি আর যাযাবর বৃত্তির অভিযোগের রেকর্ড পাওয়া গেল এলসার। তার সর্বশেষ জেলখাটার মেয়াদ ছিল দশ দিনের এবং সে মেয়াদ শেষ হয়েছে তার মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে।
কাশাকা বোতলের ল্যাবরেটরি রিপোর্ট তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। আঙুলের ছাপ মৃত মেয়েটারই। নীল কাঁচের সরু হয়ে ওঠা ঘাড়ের কাছে একটা ধ্যাবড়া তালুর ছাপ পাওয়া গিয়েছিল। ব্যস আর কিছু না।
