মেয়েটা হেথার্লিকে বললে তিনতলার জানলা থেকে লাফ দিয়ে পড়তে। কিন্তু কর্নেল ততক্ষণে ছুটে এসেছে কৃপাণ হাতে। দরজা আটকে দাঁড়াল মেয়েটা। ঠেলে ফেলে দিয়ে ছুটে এল কর্নেল। হেথার্লি তখন চৌকাঠ ধরে বাইরে ঝুলছে। কৃপাণের কোপে বুড়ো আঙুলটা রয়ে গেল ঘরের মধ্যে।
তারপর আর কিছু মনে নেই হেথার্লির। জ্ঞান হলে দেখল কোথায় সেই বাগানবাড়ি? ও শুয়ে আছে স্টেশনের ধারে একটা ঝোঁপের মধ্যে। রক্তপাতে প্রাণটা গলায় এসে ঠেকেছে।
শার্লক হোমস্ তক্ষুনি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড থেকে লোকজন নিয়ে রওনা হল রিডিং স্টেশনে। সঙ্গে হেথার্লি আর ওয়াটসন। আর একটা ম্যাপ। রিডিং স্টেশনকে ঘিরে দশ মাইল মত জায়গা নিয়ে একটা বৃত্ত টানা হয়েছে ম্যাপের ওপর। বাগানবাড়িটা এই বৃত্তের মধ্যেই নিশ্চয় পড়বে। কিন্তু কোথায়? ট্রেনে বসেই আরম্ভ হল জল্পনাকল্পনা।
ওয়াটসন, ইন্সপেক্টর সার্জেন্ট আর ইঞ্জিনিয়ার–এই চারজনে দেখিয়ে দিলে স্টেশনের উত্তর, দক্ষিণ, পুব, পশ্চিম দিক। কিন্তু সবাইকে বোকা বানিয়ে শার্লক হোমস্ আঙুল টিপে ধরল বৃত্তের ঠিক মাঝখানে রিডিং স্টেশনের ওপর।
আশ্চর্য! ট্রেন রিডিং স্টেশনে পৌঁছতে-না-পৌঁছতেই দেখা গেল ছাতার মতো ধোঁয়ার কুণ্ডলী। স্টেশনের পাশেই একটা গাছপালা ঘেরা বাগানবাড়িতে আগুন জ্বলছে। হেথার্লির বুড়ো আঙুল সেই বাড়িতেই পাওয়া গেল। একজোড়া ছোট পায়ের ছাপ, আরেক জোড়া ভারী পায়ের ছাপ। অচেতন হেথার্লিকে এই দুজন বয়ে নিয়ে ফেলে গেছে স্টেশনের ধারে। তারপর পালিয়েছে বাড়ি ছেড়ে। মেশিন ঘরে কেবল পাওয়া গেল টিন আর নিকেলের গুঁড়ো।
এবার আসুন রহস্য সমাধানে।
এক নম্বর রহস্য–শার্লক হোমস জানল কী করে রিডিং স্টেশনের ধারেই ওদের বাড়ি?
দুনম্বর রহস্য–কে আগুন লাগাল বাড়িতে?
তিন নম্বর রহস্য–হাইড্রলিক মেশিন কী কাজে লাগান হত?
চার নম্বর রহস্য–অচেতন হেথার্লিকে কারা বয়ে নিয়ে এসেছিল স্টেশনের ধারে?
.
গোয়েন্দা ধাঁধার সমাধান
এক নম্বর সমাধান–হেথার্লিকে নিয়ে ঘোড়ার গাড়িটা ছমাইল গিয়ে আবার ফিরে এসেছিল। বারো মাইল দূর থেকে যদি আসতে হত, তাহলে ঘোড়াটার গায়ে ধুলোবালি ঘাম থাকত। কিন্তু হেথার্লি দেখেছিল ঘোড়াটা একেবারে ঝকঝকে তাজা।
দু-নম্বর সমাধান–হেথার্লি নিজেই। তেলের বাতিটা ফেলে এসেছিল মেশিন ঘরে। সে ঘরে দেওয়ালগুলো কাঠের। বাতি ভেঙে যেতেই কাঠে আগুন লেগে গেছিল।
তিন নম্বর সমাধান–টিন আর নিকেলের গুঁড়ো দেখেই হেথার্লি টের পেয়েছিল মেকি টাকার কারখানা খুলে বসেছে কর্নেল।
চার নম্বর সমাধান–ছোট পা একজন মহিলার, ভারী পা ভারী লোকের। অর্থাৎ জার্মান মেয়েটা মোটা ইংরেজকে নিয়ে হেথার্লিকে পাঁজাকোলা করে তুলে এনেছিল নিরাপদ জায়গায়। বাড়িতে আগুন লাগার পর পালানো ছাড়া আর পথ ছিল না। ইংরেজের প্রাণটা একটু নরম ছিল বলেই হেথার্লিকে আর প্রাণে মারেনি।
* সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকায় প্রকাশিত। ১৩৮১।
স্যার আর্থার কোনান ডয়ালের গল্প নিয়ে গোয়েন্দা ধাঁধা
বউ উধাও। শার্লক হোমস
গোয়েন্দা হওয়ার ঝকমারি অনেক। বিশেষ করে আইবুড়ো গোয়েন্দার। বউ হারালেও বউকে খুঁজে আনতে হয়-বউয়ের মর্যাদা না বুঝেও।
বেচারা শার্লক হোমস-কেও এই জোয়াল কাঁধে বইতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কেলেঙ্কারির কথা কে না জানে। আরেকবার প্রায় একই ঘটনা ঘটল লর্ড সাইমনের বিয়ের পর।
কী বিশ্রী ব্যাপার! টি-টি পড়ে গেল সারা লন্ডন শহরে। তারপরেই অবশ্য দরদে বুক উথলে উঠল যখন লেডি সাইমনের জামাকাপড় পাওয়া গেল একটা লেকে। আহারে! বিয়ের পরেই বিপত্নীক।
ঘটনাটা গোড়া থেকে না বললে জমবে না। লর্ড সাইমন ইংল্যান্ডের সেইসব জমিদার-তনয় যাদের বংশের নামের ডাকেই গগন ফাটে, কিন্তু তালপুকুরে ঘটি ডোবে না। মাঝখানে খুব হিড়িক উঠেছিল আমেরিকার টাকাওলা মেয়েদের পটিয়ে বিয়ে করে ফেলা এবং মোটা বরপণ নিয়ে নতুন করে কাপ্তেনি করা।
লর্ড সাইমন তার ব্যতিক্রম নন। লন্ডনের কাগজে কাগজে এই নিয়ে ঝালমশলা মুড়ির মত জিভে জল ঝরানো খবর ছাপা হল অনেকবার। কনের বাবার নাকি টাকা গুণে শেষ করা যায় ্না –খনির মালিক তো। মেয়েটারও কেবল ডানা দুটো নেই বাদবাকি অবিকল পরির মতোই। কিন্তু এইসব দেখে কোনওক্রমে ভোলো উচিত হয়নি লর্ড সাইমনের ইত্যাদি ইত্যাদি।
ফালতু কথায় কান না দিয়ে ঝটপট বিয়েটা সেরে ফেললেন লর্ড মহাশয়। বয়স তার কম। হুকুম করার জন্যেই জন্মেছেন হুকুমমাফিক কাজ করিয়ে নিতেও জানেন। বিয়েটাও একটা হুকুম। সুতরাং বউ বেচারিকেও আশা করেছিলেন সেবাদাসীর মতো খাটাবেন–দরকার মতো মোচড় মেরে টাকাও বার করে নেবেন।
কিন্তু কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য! বিয়ে সেরে বাড়ি পৌঁছতে না পৌঁছতেই বাতাসে মিলিয়ে গেল বউ! লর্ড সাইমন মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। ঘরভরতি লোক তখন একপেট খিদে নিয়ে বসে আছে খাওয়ার টেবিলে কনেবউ এসে বসলেই মুরগির ঠ্যাং চিবোবে–এমন সময়ে খবর এল কনে উধাও।
সঙ্গে-সঙ্গে পুলিশ এসে গেল। পুলিশ মানে ইন্সপেক্টর লেসট্রেড। যার চেহারা খর্বকায় নেউলের মতো। বেজায় চটপটে। বেজায় ধুরন্ধর। বেজায় প্র্যাকটিক্যাল। অনুমান ফনুমানের ধার ধারে না। সে এসে দেখলে ফ্লোরা মিলার বলে একটা নাচুনে মেয়ে এসে বাড়িতে হামলা জুড়েছিল। লর্ড সাইমনকে নাকি এত সহজে সে হাতছাড়া করতে রাজি নয়। ফুর্তি করার সময়ে মনে ছিল না? ফ্লোরাকে নাকি ঘাড় ধরে বার করে দেওয়া হয় বাড়ি থেকে। তারপর সেই ফ্লোরার সঙ্গেই নাকি লেডি সাইমনকে বাগানে পাশাপাশি হাঁটতে দেখা গেছে। সুতরাং কেসটা জলবৎ তরলম। অর্থাৎ ফ্লোরাই গায়েব করেছে লেডি সাইমনকে। মেয়েরা ভারী হিংসুটে হয়। হবুবর পালালে বাঘিনী হতেও আপত্তি নেই। সুতরাং পাকড়াও ফ্লোরা মিলারকে।
