প্রমাণ? লেসট্রেড অত কাঁচা ছেলে নয়। তাও জুটিয়ে ফেলল সার্পেন্টাইন লেকের জল থেকে। লেডি সাইমনের পরিত্যক্ত জামাকাপড় পাওয়া গেলেও অবশ্য লাশটা পাওয়া গেল না। তাই বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দেওয়ার জন্যে প্রতিবারের মতো এবারও শখের গোয়েন্দার পায়ে তেল দেওয়ার জন্যে বেকার স্ট্রিটের আইবুড়ো মন্দিরে হাজির হল সরকারি গোয়েন্দা।
শার্লক হোমস তখন সবে বিদেয় করেছে লর্ড সাইমনকে। কেসটা গোড়া থেকে শেষপর্যন্ত শুনে নিয়ে মনে-মনে সাজিয়েও ফেলেছে। সামান্য দু-চারটে প্রশ্ন অবশ্য করেছিল। লর্ড সাইমন তার জবাবে বলেছেন, ক্লারা, মানে তার সদ্য উধাও বউয়ের মাথাটা বিয়ের আগে থেকেই একটু বেসামাল ছিল বলে মনে হয়। নইলে ফ্লোরার ভয়ে এভাবে কেউ পালায়? ফ্লোরার সঙ্গে লটঘট ছিল কিনা? তা হ্যাঁ, একটু-আধটু ছিল বইকি। বিয়ের আগে কার না থাকে? তাই বলে বাড়ি বয়ে বিয়ে ভণ্ডুল করতে আসবে? এত বড় স্পর্ধা? ক্লারাকেও বলিহারি যাই। বিয়ে করতে গেল হাসতে-হাসতে। বরকে নিয়ে ফিরে এল মুখখানা তোলা হাঁড়ির মতো করে। গির্জের মধ্যে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যাওয়ার সময়ে হাতের ফুলের তোড়াটা পড়ে গেল মেঝেতে। একজন গেঁইয়া টাইপের লোক তুলে দিল হাতে। তারপরেই বাড়ি ফিরে এসে ওর বাপের বাড়ির ঝি-কে ডেকে কী যে বলল ভগবান জানেন। একটা কথা শুধু কানে এসেছিল। কথাটা আমেরিকার চাষাড়ে লোকদের মধ্যেই চালু। কথাটার সাদা মানে হল, আগের জিনিসের ওপর দাবি নিয়ে তা দখল করা।
ঝি-য়ের সঙ্গে গজর-গজর করার পরেই হাওয়া হয়ে গেল ক্লারা। ব্যাপারটা সিরিয়াস। লর্ড সাইমনের ইজ্জৎ বলে একটা কথা আছে।
সব শুনে নিয়ে লর্ডকে বাড়ি ফেরত পাঠাল হোমস। তারপরেই ধূর্ত হাসি হেসে ঘরে ঢুকল লেসট্রেড।
সোল্লাসে বলল হোমস, আসা হোক! আসা হোক! কিন্তু কোটের হাতা ভিজে কেন বৎস?
সার্পেন্টইনে জাল ফেলেছিলাম যে।
জাল! সার্পেন্টাইনে। কেন? চোখ কপালে উঠে গেল হোমসের।
লেডী সাইমনের লাশ তোলার জন্যে। হোমসের অজ্ঞতা দেখে অনুকম্পার সঙ্গেই বলল লেসট্রেড। সেইসঙ্গে বললে লেডির জামাকাপড় পাওয়ার বৃত্তান্ত। এমনকী ফ্লোরা মিলার যে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত তার প্রমাণ পর্যন্ত নাকি পাওয়া গেছে লেডির পোশাকের পকেটে।
অতি তুচ্ছ প্রমাণ। একটুকরো ছেঁড়া কাগজ। তার ওপর পেনসিল দিয়ে লেখা?
একটু সামলে নিয়ে দেখা করো আমার সঙ্গে।
–এফ, এইচ এম।
মোক্ষম প্রমাণ। ফ্লোরা মিলারকে ঘানি ঘুরিয়ে ছাড়বে লেসট্রেড এই একটা প্রমাণের জোরে।
ভীষণ উৎসুক হয়ে কাগজটা হাত পেতে নিল হোমস। দেখতে-দেখতে চোখেমুখে ফুটে উঠল প্রচণ্ড কৌতুক। অট্টহাসি হেসে বললে, সাবাস!
কিন্তু একী! আপনি উলটোদিকে দেখছেন কেন? আঁতকে উঠল লেসট্রেড।
উলটো কোথায়? ওইটাই তো সোজা দিক হে! হোটেলের বিলের ভেঁড়া টুকরো তো! পেছনের হিসেবটাই আসল।
ও হিসেব আমিও দেখেছি। চৌঠা আগস্টের তারিখ আর ঘরভাড়ার জন্যে ৮ সিলিং দেওয়া হয়েছে জেনে আমার লাভ? রেটটা যদিও চড়া–
আরেক দফা অট্টহাসি হেসে হোমস বললে, বৎস লেসট্রেড, শুধু একটা কথাই শুনে যাও। লেডি সাইমন বলে কেউ নেই, কোনওকালেই ছিল না!
বিমূঢ় লেসট্রেড বিদেয় হতেই সুট করে বেরিয়ে পড়ল শার্লক হোমস। ওয়াটসন বেচারি বসে রইল একা-একা। কিছুক্ষণ পরেই হোটেল থেকে লোকজন এসে পাঁচজনের খাবার সাজিয়ে দিয়ে গেল টেবিলে। ওয়াটসন বুঝল না কেন এই রাজসিক আয়োজন। তারও অনেকক্ষণ পরে
হোমস ফিরে এসে বললে, যাক, খাবার এসে গেছে। তারাও এলেন বলে।
কারা?
লর্ড সাইমন এবং আরও দুজন।
বলতে না বলতেই ঘরে ঢুকলেন সাইমন। চোখমুখ লাল। ভীষণ উত্তেজিত, বিচলিত এবং হতচকিত।
কী বলছেন মশায়? টেবিল চাপড়াতে-চাপড়াতে বললেন লর্ড। আপনি ঠিক জেনে বলছেন তো?
ঠিকই বলছি।
কিন্তু এ যে সাংঘাতিক অপমান, ঠকাঠক-ঠকাঠক শব্দে টেবিলে আঙুল বাজাতে লাগলেন লর্ড। পরক্ষণেই তড়াক করে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে কটমট করে চেয়ে রইলেন দরজার দিকে।
দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন একজন ডানাকাটা পরি। পাশে একজন ছোটখাটো চেহারার চটপটে লোক।
পরিচয় করিয়ে দিল শার্লক হোমস, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ফ্রান্সিস হে মুলটন!
ক্লারা! বজ্রকণ্ঠে হুঙ্কার ছাড়লেন লর্ড।
ডানাকাটা পরিটি এগিয়ে এসে মিষ্টি হেসে বললে, রবার্ট, খামোকা রাগ করো না। ফ্রান্সিসের সঙ্গে অনেক আগেই গোপনে বিয়ে হয়ে গেছিল আমার। বাবা জানতেন না। ফ্রান্সিস গরিব ছিল বলে জানাইনি। কিন্তু ও পণ করেছিল আরও বড় খনির মালিক হয়ে এসে তবে আমাকে ঘরে নিয়ে যাবে। কিন্তু বছর খানেক পরেই খবরের কাগজে ওর নাম দেখলাম–খনি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। তারপরেও অনেকদিন বসে থাকার পরেও যখন ও এল না, বাবার জেদে আমার দেহটা তোমাকে দেব ঠিক করলাম–মনটা নয়। তুমি বলো, আমি ঠিক করেছি না বেঠিক করেছি?
আমি চললাম কাঠের পুতুলের মতো পা বাড়ালেন লর্ড।
কোথায় যাবেন? খেয়েদেয়ে তারপর যাবেন। বলল হোমস।
এরপরেও খাওয়া নামবে গলা দিয়ে? বলে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে উধাও হলেন লর্ড সাইমন।
বেচারা! নাকের ডগা দিয়ে ফস্কে গেল রাজকন্যা এবং আধখানা রাজত্ব। কিন্তু রহস্য সমাধানের সূত্রগুলো এখনও আপনার সামনে থেকে পালাতে পারেনি। সামনেই আছে। বলুন দিকি কী?
