সুতরাং সেই সকালেই সটান বেকার স্ট্রিটে এসে পৌঁছল ওয়াটসন। হোমস যথারীতি বসে আছে আরাম কেদারায়। মুখে-পাইপ, ঘরে তামাকের ধোঁয়া। পেট খালি। হাতে খবরের কাগজ।
ইঞ্জিনিয়ারের অবস্থা তখন শোচনীয়। বিপুল রক্তপাত আর ক্লান্তিতে কথা বলার শক্তিও নেই। হোমস্ ব্র্যান্ডি খাইয়ে দিতে একটু চাঙ্গা হল ভদ্রলোক। ইজিচেয়ারে আরাম করে শুয়ে শুরু করল অতি ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার অত্যাশ্চর্য কাহিনি।
নাম তার ভিক্টর হেথার্লি। হাইড্রলিক ইঞ্জিনিয়ার। আপিস সাজিয়ে বসেও সুবিধে করে উঠতে পারছিল না। এমন সময়ে গতকাল একটা অদ্ভুত লোক এসে দেখা করল তার সঙ্গে।
লোকটার নাম কর্নেল স্টার্ক। ভীষণ ঢ্যাঙা আর পাকানো চেহারা। গালের চামড়া যেন হাড়ের ওপর সেলাই করা। নাকটা খাঁড়ার মতো। চোখ ঝকঝকে, চলন-বলন চটপটে। কথার মধ্যে জার্মান টান।
শকুনের মতো তীক্ষ্ণ চোখে হেথার্লিকে বিঁধে ফেলল কর্নেল। ঝট করে লাফিয়ে গিয়ে দেখে এল দরজায় কেউ আড়ি পাতছে কিনা। তারপর শপথ করিয়ে নিল হেথার্লিকে দিয়ে কোনও কথা যেন কেউ জানতে না পারে। যেহেতু হেথার্লি অনাথ আর আইবুড়ো–তাই তার কাছেই এসেছে কর্নেল। কেন না অনাথ আর আইবুড়ো লোকেরা পেটে কথা রাখতে জানে। কাজটা অবশ্য সামান্য ঘণ্টা কয়েকের মতো। দক্ষিণাটা অসামান্য। পঞ্চাশ গিনি নগদ।
শুনেই হেথার্লির টনক নড়ল। পঞ্চাশ গিনি চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু কাজটা কী?
কর্নেল তখন ফিসফাস করে বলল, তার একটা হাইড্রলিক মেশিন আছে। মেশিনটার কোথায় যেন একটি গলদ হয়েছে। হেথার্লিকে গিয়ে তা বার করে দিতে হবে।
কিন্তু একাজ এত চুপিসাড়ে করার দরকারটা কী? কর্নেল সেঁতো হাসি হেসে বুঝিয়ে দিল কারণটা। রিডিংয়ের কাছে খানিকটা জমি কিনেছিল সে। তারপর একদিন দেখল, জমির তলায় সাজিমাটির স্তর হয়েছে যা কিনা সোনার চেয়েও দামি। তার চাইতেও বড় কথা–স্তরটা বেশি করে ছড়িয়ে পড়েছে পাশের দুই ভদ্রলোকের জমিতে। তারাও জানে না তাদের জমিতে সোনার চেয়েও দামি জিনিস পড়ে আছে। জানলে চড়চড় করে দাম উঠে যাবে জমিগুলোর। কিন্তু জলের দরে ও জমি কিনতে চায় কর্নেল। তাই আগে নিজের জমি থেকে সাজিমাটি তুলে দু-পয়সা জমিয়ে নিয়ে সেই টাকা দিয়ে কিনবে পাশের জমিগুলো। এত গোপনতা সেই কারণেই। নিজের জমিতে মেশিন চলছে–এ খবর একবার প্রকাশ পেলে পাশের জমিওলা আর তো জমি বেচতে চাইবে না। সুতরাং হেথার্লি যেন সন্ধের দিকে রিডিং স্টেশনে চুপিসাড়ে হাজির থাকে। কর্নেল এসে তাকে নিয়ে যাবে তার খামারবাড়িতে।
সব শুনে শুধু, একটা প্রশ্নই করেছিল হেথর্লি, সাজিমাটি তো মাটি খুঁড়ে বার করতে হয়– কিন্তু হাইড্রলিক মেশিনের দরকার তো চাপাচাপির জন্যে।
ও সব আপনি বুঝবেন না। আমাদেরও চাপ দেওয়া দরকার আছে বলে হেথার্লিকে যেন তোপের মুখে উড়িয়ে দিল কর্নেল।
অত কৌতূহলে দরকারটা কী? পঞ্চাশ গিনি পেলেই হল। সুতরাং যথাসময়ে রিডিং স্টেশনে হাজির হল হেথার্লি। স্টেশনের বাইরে কর্নেল দাঁড়িয়েছিল একটা এক-ঘোড়া গাড়ি নিয়ে। ঘোড়াটা বেশ তেজালো বাদামি রঙের, গায়ে ধূলোবালি, ঘামের চিহ্নমাত্র নেই।
গাড়ির মধ্যে হেথার্লিকে উঠিয়ে নিয়ে কোচোয়ানকে চলতে হুকুম দিল কর্নেল। দরজা-জানলা বন্ধ থাকায় হেথার্লি দেখতে পেল না কোন পথে চলেছে গাড়ি। তবে ওইরকম বেগে ঘণ্টাখানেক একনাগাড়ে ছুটে চলা মানে মাইল বারো পথ যেতে হয়েছিল নিশ্চয়। পাহাড়ি পথ হলে টের পাওয়া যেত। রাস্তাটা এবড়োখেবড়ো কিন্তু চড়াই উত্রাই পেরোতে হয়নি।
একঘণ্টা পরে একটা বাগানের মধ্যে গাড়ি ঢুকল। হেথার্লিকে নামিয়ে বেরিয়ে গেল গাড়িটা। একজন জার্মান মহিলা আলো হাতে সভয়ে দরজা খুলে কী যেন বলল কর্নেলকে। তারপর বেরিয়ে এল একজন মোটা ইংরেজ। কর্নেলের ম্যানেজার। মেয়েটাকে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে কর্নেল আর ম্যানেজার হেথার্লিকে নিয়ে এল হাইড্রলিক মেশিনের ঠিক তলায় একটা ছোট্ট খুপরি ঘরে।
ঘরটার তলায় লোহার প্লেট–ওপরে লোহার প্লেট। চারদিকে কাঠের দেওয়াল। মেশিন চললেই ওপরের লোহা নেমে এসে মিশে যায় নীচের লোহার সঙ্গে।
হেথার্লি সামান্য একটু ঘটাং-ঘটাং করেই বুঝে ফেলল রবারের ঢাকনি দিয়ে প্রেসার বেরিয়ে যাচ্ছে। তাই সেরকম চাপ উঠছে না অত বড় মেশিনেও।
তারপরেই তেলের বাতি হাতে একা ফিরে এল খুপরি ঘরে। মনটা খুঁতখুঁত করছিল মেশিনের সাইজ দেখে। এত বড় মেশিন দিয়ে সাজিমাটি চাপ দেওয়ার কথাটা যে মিথ্যে, তা ধরে ফেলল লোহার পাত দুটোয় হাত বুলোতেই। অদ্ভুত কতকগুলো ধাতুর গুড়ো লেগে সেখানে।
ঠিক এই সময়ে পেছনে পায়ের শব্দ শোনা গেল। কর্নেল জ্বলন্ত চোখে দেখছে হেথার্লিকে। তারপরেই আর সময় পাওয়া গেল না। চক্ষের নিমেষে বেরিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল কর্নেল।
মেশিনের চাপ-ঘরে বন্দি হল হেথার্লি। পরক্ষণেই কানে ভেসে এল সোঁ-সোঁ শব্দ। মেশিন চালিয়ে দিয়েছে কর্নেল। ওপরের লোহার প্লেট নীচে নেমে আসছে হেথার্লিকে চিঁড়েচ্যাপটা করতে। আচম্বিতে পাশের কাঠের দেওয়ালে খুলে গেল আর একটা দরজা। সেই জার্মান মহিলাটা ওকে টেনে নিয়ে এল বাইরে। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে তেলের বাতি গুঁড়ো হওয়ার এবং ধাতুতে-ধাতুতে ঠোকাঠুকির আওয়াজ শোনা গেল মেশিন ঘরের ভেতর থেকে।
