যা বলবার তা বলে দিলাম, বাচ্চুর গলাতে ভয়ঙ্করের সঙ্কেত, একলা মেয়েছেলেকে থাকতে দিয়েছি দুর্নাম কুড়োনোর জন্যে নয়। এ পাড়ার একটা সুনাম আছে।
নিজের চরকায় তেল দিন, কঠিন গলায় বলে কমলা। পেশায় আমি সাংবাদিক, আপনাকে আগেই বলে দিয়েছি। যখন খুশি ঘরে থাকব, যখন খুশি বেরোয়, যার সঙ্গে খুশি কথা বলব। আপনি বাড়িওলার মতো থাকবেন, গার্জেনগিরি করতে আসবেন না।
কটমট করে চেয়ে রইল বাচ্চু সেন। মেয়েদের মুখে এরকম চঁচাছোলা কথা বোধহয় কখনও শোনেনি। হিংস্রতা প্রকট হল দাঁতে দাঁত চেপে ধরার মধ্যে।
মাতালকে বিশ্বাস নেই। আমি উঠে দাঁড়ালাম। সহজ গলায় বললাম, বাচ্চুবাবু, আপনি ঘরে যান। এটা অবাধ মেলামেশার যুগ। এর মধ্যে খারাপ কিছু নেই। আপনি কিছু ভাববেন না। আমাদের নিয়ে আপনাকে আর মাথা ঘামাতে হবে না। যান, যান।
বাচ্চু যত বড় লোফারই হোক আমার পেটাই চেহারা দেখেই বুঝেছিল, তর্জন-গর্জন করলে ফল হবে না। তাই আর একবার কমলার দিকে রক্তচক্ষু হেনে উঠে গেল ওপরে।
আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে বললাম কমলাকে, এ রকম মেজাজ আর দেখাবেন না, আমাদের কৌশলে ঠান্ডা মাথায় কাজ উদ্ধার করতে হবে। হারামজাদা যখন বাড়ি থেকে বেরোয় না, তখন আমি ওর বাড়ি ঢুকব–আজ, রাতেই।
মানে?
করিডরটা গিয়ে শেষ হয়েছে সরু উঠোনে–দুপাশে আমাদের বাথরুম। তার ঠিক ওপরেই সরু বারান্দাটা বাচ্চু সেনের। পাইপ বেয়ে উঠে যাওয়াটা এমন কিছু নয়। কেউ দেখতেও পাবে
পেয়ারা গাছটার জন্যে। আজকের এই মাথা গরমের পর গিন্নির কাছে নিশ্চয় খানিকটা লম্ফজ করবে বাচ্চু রাস্কেল। কী বলে, তা শুনতে চাই।
তখন সাতটা বাজে। বাচ্চুর শোওয়ার ঘরে সবুজ আলো জ্বলে রাত দশটা নাগাদ। হাতে তখনও তিনঘণ্টা ছিল। আমি খেয়ে এলাম ফরডাইস লেনে। তারপর গেল কমলা। বাচ্চু ওপর থেকে আর নামেনি। দশটা নাগাদ রান্নাঘর আর খাওয়ার ঘরের আলো নিভে গেল। আমি পেছনের উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। শোওয়ার ঘরে সবুজ আলো জ্বলে উঠতেই বৃষ্টির জলের মোটা পাইপ ধরে উঠে এলাম দোতলায় বারান্দায়। শোওয়ার ঘরের একটা জানলা এই বারান্দায় দিকে। খোলা রয়েছে। তাই পাইপ বেয়ে আর একটু উঠে তিনতলার ছাদের আলসের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম। কান রইল জানলার দিকে। শুনলাম স্বামী-স্ত্রীর কথা।
বাচ্চুর বউ বলছে, আজকালকার মেয়েরা মেলামেশা করে, নিজেদের বাঁচিয়েও চলে। তোমার নাক গলানো ঠিক হয়নি।
তুমি থামো, গরগর করে ওঠে বাচ্চু, এত বড় স্পর্ধা..চোখ রাঙায়…চুলের মুঠি ধরে… ছোঁড়াটাও কম নয়।
ওকেই আমার ভয়।
কীসের ভয়? বাচ্চু সেন কাউকে ভয় পায় না।
তুমি কিছু বোঝোনি?
কী..কী…বুঝবটা কী?
নতুন ভাড়াটে এলে কত কথাই তো জিগ্যেস করো–একে তো জিগ্যেস করলে না?
অ্যাশ কোম্পানির সেলসম্যান। ঠিকই বলেছে। কার্ড তো দেখিয়েছে।
তাতেই সব জানা হয়ে গেল? আবার কী জানব?
ওর বাবা কে, মা কে এইসব।
জেনে আমার লাভ? টাকার দরকার টাকা পেয়েছি।
ওগো তুমি কি অন্ধ?
মানে?
ওর চাহনি দেখেছ?
চাউনি…চাউনি নিয়ে কি ধুয়ে খাব?
সেই চাউনি…ঠিক তার মতো..ও সে-ই।
কিছুক্ষণ ঘর নিস্তব্ধ। তারপর চাপা গলায় বললে বাচ্চু, ঠিক বলছ?
বাচ্চুর বউ এমনিতে খুব আস্তে কথা বলে। সব সময়ে যেন মুষড়ে আছে। এখন একটু কান্নার ছোঁয়া লাগল গলার সুরে। হা…হা…মায়ের মন সেই সর্বনাশের পর থেকে…
আবার সেই কথা! সর্বনাশ হতই।
তাই বলে ওইভাবে।
আঃ!
বাচ্চুর বউ আর একটা কথাও বলল না। ঘরের আলো নিভে গেল। একটু পরেই বাচ্চুর নাকডাকার শব্দ পেলাম।
পাইপ বেয়ে নেমে এলাম। কমলাকে বললাম যা শুনেছি।
পরের দিন সন্ধ্যায় বাচ্চু বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। আমি তখন বাড়ি ছিলাম না। কমলা ওর পিছু নিয়েছিল। কিন্তু সুরী লেনের মোড় পর্যন্ত। স্যার দেবপ্রসাদ সর্বাধিকারীর বাড়ির সামনে কোলে-দের গ্যারেজে ঢুকেছিল বাচ্চু। বুলেট মোটর সাইকেল হাঁকিয়ে বেরিয়ে এসেছিল।
কমলা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে এসেছিল ফ্ল্যাটে। আমি তখন সবে ফিরেছি। বাচ্চু ফিরে এল গভীর রাতে।
.
তারপরের দিন তিনতলায় এল নতুন ভাড়াটে।
রিক্সা থেকে যখন নামছে, তখন দেখেছিলাম তাকে। যথেষ্ট বয়স হয়েছে। চুলদাড়িতে সাদা চুল অনেক। দাড়িও রবিঠাকুরের দাড়ির মতো বুক পর্যন্ত ঝুলছে। চুল সাধু সন্ন্যাসির মতো। জট পাকিয়ে গেছে। লম্বা আর নোংরা। খুব রোগা। পোশাক কিম্ভুত। পুরো হাতা ফতুয়া। কালো রঙের। পাজামাও কালো রঙের। পিঠে একটা পুঁটলি। হাতে বাঁশের লাঠি। চোখে কালো চশমা।
জানলা দিয়ে দেখলাম, রিক্সাওলা তাকে হাত ধরে নামিয়ে দিল। অতি কষ্টে সে নীচে নামল। লাঠি সামনে বাড়িয়ে ঠুকে-ঠুকে দরজার দিকে এগোল–রিক্সাওলা তার হাত ধরে নিয়ে গেল করিডর দিয়ে, সিঁড়ির ওপর দিয়ে, দোতলায় চাতাল পেরিয়ে, তিনতলার। একটু পরেই শুনলাম, বাচ্চু ওঘর থেকে বেরিয়ে ভারী পায়ে উঠে গেল ওপরে।
রিক্সাওলা নেমে আসতেই করিডরে বেরিয়ে এসে জিগ্যেস করলাম, কে রে? অন্ধ নাকি?
সে বললে, হ্যাঁ।
পরের দিন থেকে সে রোজ নেমে আসত লাঠি ঠুকে-ঠুকে, সার্পেন্টাইন লেন আর সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের বাড়িগুলোর দেওয়াল ঘেঁষে চলে যেত শিয়ালদা স্টেশনে। ফিরত রাত্রে। পেছন পেছন গিয়ে দেখেছি মেন স্টেশনের সামনে ইসকনের গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ভিক্ষে করছে। মুখে একটাই একঘেয়ে বুকনি : বুড়ো অন্ধকে দশটা পয়সা দিয়ে যাও বাবা। কাতারে কাতারে লোক যে অঞ্চলে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত যাতায়াত করছে, সেখানে অন্ধ ভিখিরি একজনই। রোজগার ভালোই চলছিল।
