আমি নিজেও একদিন দশ পয়সা ফেলে দিলাম কেঁচড়ে। জিগ্যেস করলাম, নাম কী তোমার?
সাধুচরণ।
রাত নটা নাগাদ ফিরত সাধুচরণ। সারাদিন থাকত শিয়ালদা স্টেশনের আশেপাশে। খেয়ে নিত কোর্টের সামনের ফুটপাতের দোকানে। ও অঞ্চলের সব্বাই ওকে চিনে গেল ছমাসে। ছমাস আমি তাকে চোখে-চোখে রেখেছি। তিনতলায় সে উঠে গেলে দেখেছি, ছাদের ঘরে পরদার ফাঁকে আলো জ্বলছে। আলো যখন নিভে যেত, আমি পাইপ বেয়ে পেয়ারা গাছের আড়াল রেখে উঠে যেতাম দোতলায়, কখনও তিনতলায়। ছাদেও উঠেছি। কিন্তু সাধুচরণের ঘর বন্ধ থাকত, জানলায় পরদা ঝুলত, ঘর অন্ধকার; কিচ্ছু দেখতে পেতাম না।
বাচ্চু আর বউয়ের কথাবার্তা শুনে খটকা লেগেছিল একদিন। যেদিন সাধুচরণ ভাড়াটে হয়ে এল সেই দিন।
রাতে উঠেছিলাম পাইপ বেয়ে। শুনেছিলাম ওর বউ বলছে, নতুন ভাড়াটে আনলে, দেখেশুনে এনেছ তো?
হ্যাঁ-হ্যাঁ। অন্ধ বলেই তো আনলাম। তোমার ছাদে উঠতে অসুবিধে হবে না।
কাপড় মেলতে বাচ্চুর বউ রোজ সকালে উঠত ছাদে। বিষ্ণুপদ যখন থাকতেন, তখনও নিশ্চয় উঠত।
ছমাস ধরে আড়ি পেতেও কিন্তু বাচ্চু আর ওর বউয়ের মুখে আমাকে নিয়ে আর একটা কথাও শুনিনি, নির্জনে স্বামী-স্ত্রীরা প্রাণ খুলেই তো কথা বলে। বাচ্চু অতীতকে যেন কবর দিয়ে রাখতে চায়। বউ তা জানে। ভয়ে কথা বলে না।
বাচ্চু কিন্তু সেই রাতের পর থেকে আমার দিকে যখন তাকায়, তখন ওর চোখে দেখি অদ্ভুত এক চাহনি। কী যেন খুঁজছে আমার চোখ-মুখের মধ্যে। একদিন সটান জিগ্যেস করেছিল, আপনার পুরো নাম কী বলুন তো? কার্ডে তো লেখা আছে এস বোস।
আমি গলা ছেড়ে অট্টহাসি হেসেছিলাম। বলেছিলাম, সত্য বোস।
তারপরেই উঠেছিল হেঁচকি। উপুড় হয়ে খাটে শুয়েও হেঁচকি থামাতে পারিনি। বাচ্চু কিন্তু আর আমার কাছে ঘেঁষেনি ঝি-কে দিয়ে পাঠিয়ে দিত ভাড়ার রসিদ ঝি-এর হাতেই দিতাম টাকা।
ছমাস পরে মেট্রো রেলের খাদে পাওয়া গেল সাধুচরণের মৃতদেহ।
.
খবরটা কাগজে বেরিয়েছিল। মেট্রো রেলের মুণ্ডপাত করেছিল সাংবাদিক। রাত নামলে যখন লোডশেডিং হয়, তখন খুঁড়ে ফেলে রাখা এই মৃত্যুকূপগুলো আরও কতজনের প্রাণ নেবে, এই নিয়ে কর্তৃপক্ষের পিণ্ডি চটকেই হাত ধুয়ে ফেলেছিল জার্নালিস্ট। সাধুচরণের নাম ঠিকানাটা অবশ্য ছাপিয়ে দিয়েছিল। ফতুয়ার পকেটে পাওয়া গেছিল ভাড়ার রসিদ। তাতেই লেখা ছিল নামধাম।
পুলিশও এসেছিল। বাচ্চুর সঙ্গে নামকাওয়াস্তে দেখা করে, তদন্ত সেরে চলে গেছিল। আমার ঘরে যখন এসেছিল, আমি শুধু বলেছিলাম, তিনতলায় থাকত জানি, শিয়ালদায় ভিক্ষে করত। মেট্রো রেলের ওদিকে মরতে গেছিল কেন?
মরতে! ভিক্ষের লোভ বড় লোভ। বলে চলে গেছিল পুলিশ।
সাধুচরণকে পাওয়া গেছিল বৌবাজার আর চিত্তরঞ্জন এভিনুর চৌমাথায়–পাতালে।
সেই রাতে খাটে শুয়ে বাচ্চুর বউও জিগ্যেস করেছিল একই কথা, আহারে। অতদূরে গেল কেন?
একই জবাব দিয়েছিল বাচ্চু, মরতে।
.
তারপরের দিন সকাল বেলা সার্ট প্যান্ট পরে করিডর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল বাচ্চু। এটা ওর বাইরে বেরোনোর পোশাক। ছমাসে এই প্রথম বাইরে যাচ্ছে। এরকম কুয়োর ব্যাঙ জীবনে দেখিনি।
ও বেরিয়ে যেতেই কমলা এল আমার ঘরে। আমরা এখন পরস্পরকে তুমি বলে সম্বোধন করি। নাম ধরে ডাকি। মেয়েটাকে আমার ভালো লাগে। আমার জীবনে যে লোকটা সর্বনাশ ঘটিয়েছে, তার মেয়ে সে। তবুও ভালো লাগে। বাপের রক্ত ধমনীতে নিয়েও কমলা অন্য জাতের মানুষ।
যা বলছিলাম। হন্তদন্ত হয়ে আমার ঘরে ঢুকে কমলা বললে, যাও-যাও! নিশ্চয় মোটর সাইকেল বের করতে যাচ্ছে। সেদিনও এই ড্রেস করে বেরিয়েছিল।
আমাকে আর কিছু বলতে হয়নি। বেরোবার জন্যে আমিও জামাকাপড় পরে নিয়েছিলাম। সেলসম্যানের ব্যাগটা হাতে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেলাম রাস্তায়। দেখলাম, মোড় ঘুরে সুরী লেনে ঢুকছে বাচ্চু। ও গেল গ্যারেজে। অনেকদূর থেকে দেখলাম, বুলেট আর স্টার্ট নিচ্ছে না। ছমাস ফেলে রেখে দিলে এত সহজে স্টার্ট নেয় না। বেশ ভোগাবে। মিস্ত্রি প্লাগ সাফ করতে বসে গেল। আমি চলে গেলাম ট্রাম রাস্তায়। হাসপাতাল থেকে ট্যাক্সি বেরোচ্ছিল। মিটার ডাউন করে ঢুকলাম সুরী লেনে। ইঞ্জিন বন্ধ করিয়ে বসে রইলাম ভেতরে।
প্রায় আধঘণ্টা পরে মাথায় হেলমেট এঁটে, শাঁখারিতলা দিয়ে বেরিয়ে গেল বাচ্চু আর বুলেট। পেছনে আমার ট্যাক্সি।
ডায়মন্ডহারবার যাওয়ার পথে আজকাল বেশ কয়েকটা হলিডে হোম হয়েছে। কলকাতার কালো টাকার বাবুরা এখানে এসে সারাদিন পরের বাড়ির মেয়ে-বউ নিয়ে ফুর্তি করে। সন্ধ্যায় কলকাতা ফেরে। কেউ-কেউ রাতেও ফুর্তি চালায়।
এরই পাশ দিয়ে একটা সরু রাস্তা চলে গেছে অনেক ভেতরে। বড় রাস্তা থেকে ভেতরের সেই অঞ্চলের সৌন্দর্য টের পাওয়া যায় না। এককালে নিশ্চয় কোনও জমিদারের বাগানবাড়ি ছিল। টলটলে জলের ঝিল আর দীঘি, ফুলে ভরা বাগান, বড়-বড় গাছ। পুরো জায়গাটা উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সে যে কত বিঘের জমি, সে আন্দাজ করবার মতো অবস্থা আমার ছিল না। পাঁচিলের ওপর দিয়ে শুধু একটা বাড়ির ওপর দিক দেখেছিলাম। অনেকদূরে রয়েছে। রোদ্দুরে ঝকঝক করছে। আলট্রামডার্ন ডিজাইনের প্রাসাদ নয়। আগের যুগের সুন্দর স্থাপত্যের অনুপম নিদর্শন। বড়-বড় থাম। ব্রিটিশ আমলের খিলেন। যেন কোনও রাজারাজড়ার বাড়ি।
