কমলা বললে, নিজেকে বড় ধড়িবাজ মনে করেন আপনি। তাই না? আপনি আমার বাবার পিছু নিয়েছিলেন, আর আমি পিছু নিয়েছিলাম আপনার।
আ…আমার!
আজ্ঞে। সুকুজ হোটেল থেকে ফিরেই একটা সাবান কিনতে গেছিলাম লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে।
আমি চেয়ে রইলাম। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার হল সেই মনিহারি দোকানটার নাম, যার দোতলায় থাকে কমলা আর তার মা। দোকানিরও নামও লক্ষ্মী।
লক্ষ্মীদার মুখেই শুনলাম, আপনি একটু আগেই ওপরে গেছিলেন, নেমে এসে বারান্দার তলায় দাঁড়িয়েছিলেন, আমার পেছন-পেছন গেছিলেন। লক্ষ্মীদা মন্তব্য করে বলেছিল, আপনি নাকি আমার সঙ্গে ভাব করতে চাইছেন। আমি কিন্তু বুঝেছিলাম, আপনার মতলব তা নয়। কী করে বুঝলাম জানেন?
আমি শুধু চেয়েই রইলাম।
কমলা বলে গেল, দেড়তলার চাতালে অনেক জল আর কাদা মাখা জুতোর ছাপ ছিল। ওখানে কেউ দাঁড়িয়েছিল। দেড়তলা থেকে দোতলায় আর ওঠেনি। ফের কাদামাখা জুতোর ছাপ এঁকে নেমে গেছে সিঁড়ি দিয়ে। কেন সে ওখানে দাঁড়িয়েছিল? কারণ, সে আড়ি পেতে শুনছিল আমার সঙ্গে মায়ের কথা। শোনবার পর সে আমার পিছু নিয়ে গেছিল সুকুজ হোটেলে। কেন গেছিল? এটা জানার জন্যে তক্ষুনি আমি ফিরে গেলাম সুকুজ হোটেলে। দেখলাম হোটেলে বসে আপনি চা খাচ্ছেন। দেখলাম, একটু পরে ওপরে উঠে গেলেন। নেমে এসে ম্যানেজারকে বললেন, কাল ননম্বর খালি হচ্ছে ভোরে–আমি আসছি আটটায়। ননম্বরে আমার বাবা উঠেছে, সে খবর আমি নিয়েই গেছিলাম। বাবা ভোরে চলে যাচ্ছে জেনে ঠিক করলাম, বাবার পেছনই নেব আপনাকে পরে এক হাত নেব। ভোর পাঁচটায় সুকুজ হোটেলের সামনে পৌঁছে দেখলাম, আপনি ফলো করছেন বাবাকে। এলেন এখানে। এখন দেখছি আমার আগেই ঘর নিয়েও ফেলেছেন। কে আপনি? পুলিশ?
না। এতক্ষণে কথা বলার মতো মনের অবস্থা ফিরে পেলাম। বললাম, আমি এক পাগল।
সব কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল কমলা।
আমি বললাম, আপনার বাবার পেছন নিয়েছি শুধু এই কারণেই। আমি জানতে চাই, কেন উনি চার বছরের একটা সুস্থ বাচ্চাকে পাগল বলে সার্টিফাই করেছিলেন?
আর জানতে চান আপনার বাবা আর মায়ের ঠিকানা? জানতে চান, কেন তারা আপনাকে পাগলাগারদে ফেলে রেখে উধাও হয়ে গেলেন? কমলার চোখ আর গলা দুটোই এখন নরম হয়ে এসেছে।
যদি তারা বেঁচে থাকে, বললাম আমি।
কমলা কিছুক্ষণ কথা বলল না। মেঝের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। তারপর হঠাৎ মাথা তুলে বললে, আমাদের দুজনকেই বোকা বানিয়ে গেল বাবা।
কেন?
কাল রাতেই তিন তলার ঘর ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে।
সেকী!
বাড়িওলাকে সেলামি আর ভাড়ার টাকা দিয়ে আলগোছে জিগ্যেস করেছিলাম ছাদের ঘরে যিনি থাকেন, তিনি বেশ আছেন। ছাদ পাচ্ছেন, হাওয়া পাচ্ছেন। বাড়িওলা বললে–এখন আর নেই। কাল রাতেই চলে গেল। আমি চমকে উঠেও সামলে নিয়ে বললাম–তাহলে ওই ঘরটাই দিন না। বাড়িওলা বললেনা, না। ও ঘরে খুব জানাশুনা ছাড়া কাউকে থাকতে দিই না আমি।
আমি বললাম, আপনার বাবাকে তাহলে বাড়িওলা ভালো করেই চেনেন?
তাই তো মনে হল।
তাহলে, বলে আমার চোখ রাখলাম কমলার চোখের ওপর। চোখে-চোখে বাকি কথা হয়ে গেল।
সেই থেকে আমরা দুজনে পালা করে বাড়িওলার পেছনে লেগে রয়েছি। লোফারটার নাম বাচ্চু সেন। ছেলেপুলে কেউ নেই। বাচ্চুবাবুর চেহারা যতখানি কর্কশ, ওর স্ত্রীর চেহারা ততখানি মোলায়েম। টিপিক্যাল বাংলার বধূর মতো যে ধরনের বন্ধুদের কথা শৈলজানন্দ শরৎচন্দ্রের গল্প উপন্যাসে পড়েছি। ফরসা, গোলগাল মুখ, কপালে আর সিঁথিতে সিঁদুর, চওড়া লালপেড়ে শাড়ি ছাড়া বাহারি শাড়ি কোনওদিন পরতে দেখিনি। চোখে বা মুখে বা কথায় উগ্রতার লেশ মাত্র নেই। হাসিখুশিও নয়। গোটা মুখখানায় যেন বিষাদ লেগে রয়েছে। চাহনির মধ্যেও বিষাদের ছোঁয়া রয়েছে। বিষাদ রোগে ভুগছে নিশ্চয়। নয়নতারায় এরকম পেসেন্ট অনেক দেখেছি।
বাচ্চু সেন বাড়ি থেকে খুব একটা বেরোয় না। একটা ঠিকে ঝি দুবেলা এসে বাজার হাট, রেশন ধরা, দুধ এনে দেওয়া, ঘর মোছা এইসব করে দেয়। বাচ্চুর বউকে কোনওদিন দোতলা থেকে একতলাতেও নামতে দেখিনি।
আমার আর কমলার মধ্যে চুক্তি হয়েছিল, আমি যখন সারাদিন কাজে থাকব, কমলা তখন নীচের ঘাঁটি আগলাবে। আমি ফিরে এলে ওর ছুটি। তখন করিডোরে চোখ রাখব আমি। এ কাজটা আমি করতাম কমলার ঘরে বসেই। উঠতি বয়সি ছেলেমেয়েদের আলাদা রাখা যায় না।
কিন্তু এটা সহ্য হয়নি বাচ্চু সেনের। একদিন সন্ধ্যায় দরজা খোলা রেখে আমি বসে রয়েছি কমলার ঘরে, এমন সময়ে সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ শুনলাম। ভারী আওয়াজ। নির্ঘাত বাচ্চু নামছে। সঙ্গে-সঙ্গে দুজনেই চেয়ে রইলাম দরজার দিকে। বাচ্চু বেরিয়ে গেলেই ওর পেছন নেব–এইটাই ছিল আমাদের প্ল্যান।
ও বাড়িতে ঠাঁই নেওয়ার ষষ্ঠ দিনের ঘটনা এটা।
বাচ্চু সেন দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল। রক্তচক্ষু মেলে দেখল আমাকে আর কমলাকে। পায়ের আওয়াজ শুনেই আঁচ করেছিলাম। মদে চুর-চুর হয়ে আছে। এখন ঘামে ভেজা মুখ আর লাল চোখ দেখে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। গায়ে একটা হাতকাটা গেঞ্জি। চেককাটা লুঙ্গিতে মাংসের ঝোল পড়েছিল বোধহয় দাগ ধরেছে।
বিষাক্ত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বাচ্চু জঘন্য গলায় বললে, এটা প্রেমপট্টি নয়।
নিমেষে ঝলসে উঠল ভোজালি। কমলার স্বভাব-তীব্র চোখে যেন আগুন ঠিকরে গেল, কী বললেন?
