চাই। হোটেল প্যারি আমার ভালো লাগছে না।
ওখানেই আছেন এখন?
হ্যাঁ। এখানে ঘর পেলেই চলে আসব।
কিন্তু কাল সকালের আগে তো পাবেন না।
খালি হবে তখন?
হ্যাঁ। ননম্বরের লোক কলকাতার ট্রেন ধরবেন।
বোর্ডে চোখ বুলিয়ে নিলাম। প্রত্যেক ঘরের চাবি ঝোলে সেই বোর্ডে। ঘরে লোক থাকলে, তার নাম লেখা কার্ড থাকে–তখন আর চাবি থাকে না।
ননম্বর ঘরের চাবি নেই। কার্ড আছে। কার্ডে লেখা রয়েছে, যাকে খুঁজতে এসেছি তার নাম। ডাঃ বি নায়েক।
বুক ধড়াস করে উঠেছিল নামটা দেখেই।
সহজভাবে জিগ্যেস করেছিলাম, ঘরটা এখন দেখে যেতে পারি?
কিন্তু উনি তো চাবি দিয়ে বেরিয়েছেন।
তাহলে একটু ঘুরে আসি।
আসুন। নটা নাগাদ আসবেন।
নটার সময়ে বোর্ডাররা খেতে বসে। বিষ্ণুপদও ওই সময়ে খাবেন। তারপর ওপরে উঠবেন। আমি তাকে চিনি না। এই প্রথম দেখব। তাই নটার আগেই হাজির হলাম হোটেলে। এক কাপ চা খেলাম। আরও আধঘণ্টা বসবার পর এক ছোকরা এসে বললে, চলুন ননম্বর ঘর দেখে যাবেন।
তিনতলায় লম্বা করিডরের দু-ধারে খুপরি ঘর। ননম্বরের দরজা ভেজানো। ছোকরা বাইরে থেকে হেঁকে বললে, আসব?
ভারি গলা ভেসে এল ভেতর থেকে, এসো।
ছোকরা দরজাটা দু-হাট করে খুলে রেখে ঢুকে গেল ভেতরে। টেবিল থেকে খালি গেলাস, চায়ের কাপ নিতে নিতে বিষ্ণুপদকে জিগ্যেস করলে, কিছু লাগবে?
না। কে রে বাইরে?
উনি ঘর দেখছেন। আপনি চলে গেলে কাল আসবেন।
আমি কিন্তু ঘর দেখছিলাম না। আমার মনের ক্যামেরায় বিষ্ণুপদর ফটো তুলে নিচ্ছিলাম। রোগা লিকলিকে মাঝবয়সি লোকটাকে দেখে রাগতে পারিনি–অনুকম্পা হচ্ছিল। দু-চোখ ছলছল করছে–ঘোলাটে–মদের ক্রিয়া। পুষ্টির অভাব গোটা শরীরে। গালের হাড় উঁচু, চোয়ালের হাড় খোঁচা হয়ে বেরিয়ে–চামড়া দিয়ে মোড়া একটা কঙ্কাল। গেঞ্জি গায়ে লুঙ্গি পরে বসে খাটের ওপর, চব্বিশ বছর আগে এই লোকটাই আমাকে পাগল সাজিয়ে নয়নতারায় ঢুকিয়েছিল।
চলে এলাম। ম্যানেজারকে বলে এলাম, কাল সকালেই আসছি। ঘর পছন্দ হয়েছে।
কলকাতার ট্রেন ছাড়ে খুব ভোরে। আমি পাঁচটার আগেই আমার সামান্য জিনিসপত্র সাইকেল রিক্সায় চাপিয়ে হাজির হলাম সুকুজ হোটেলের সামনে। একটু পরেই কলকাতার যাত্রী বেরিয়ে এলেন বাইরে। বিষ্ণুপদ নায়েক।
আমি তার পেছন নিয়ে এসেছিলাম কলকাতায়, দেখে গেছিলাম ১০০ নম্বর সার্পেন্টাইন লেনে তাঁর আস্তানা। এ ঠিকানায় আগে পেল্লায় বস্তি ছিল। চারদিকে উঁচু-উঁচু পাকা বাড়ি। মধ্য কলকাতায় এত বড় বস্তি কি চিরকাল বস্তি হয়ে থাকতে পারে? তাই খানিকটা অঞ্চলে বদখৎ টাইপের কয়েকটা নতুন বাড়ি উঠেছে। সরু তিনতলা বাড়িটার তিনতলায় থাকেন বিষ্ণুপদ।
এসব আমি পরের দিন জেনেছিলাম। সকালেই বাড়িওলার সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তিনি থাকেন দোতলায়। জিগ্যেস করেছিলাম, ঘর খালি আছে কি না।
লোকটা লোফার টাইপের। চোয়াড়ে চেহারা, কথাবার্তায় ইতোরামি। খোঁচা দাড়ির জন্য আরও জঘন্য লাগছিল। চোখ লাল, মাথায় কঁকড়া চুল। বিশাল বপু। দেখলেই গুন্ডা বলে মনে হয়। এরাই এখন কলকাতার চটজলদি বাড়িওলা। ওদের সমীহ করে চলতেই হয়।
সেলামি দিতে হবে। কর্কশ গলাকে একটুও নরম করবার চেষ্টা করেনি ইতোর লোকটা।
কত?
দশ হাজার।
ভাড়া?
দুশো। লাইট ফ্যানের চার্জ আলাদা।
কোন ঘর?
একতলায় মুখোমুখি দুটো ফ্ল্যাট আছে। ওয়ানরুম ফ্ল্যাট, অ্যাটাচড বাথ। দুটোই খালি।
তিনতলায় নেই?
না।
আর কথা বাড়াইনি। তিনতলায় ঘর তো একখানা। চিলেকোঠার ঘর। বিষ্ণুপদ তাহলে ওইখানেই থাকেন।
.
সঙ্গে হাজার টাকা ছিল। অ্যাডভান্স করে দিলাম। একতলার দক্ষিণের ফ্ল্যাট নেব বলে দিলাম। হাওয়া পাওয়া যাবে। বলে গেলাম কাল-পরশুর মধ্যেই চলে আসছি।
কলকাতায় যেখানে ছিলাম, সেখানকার আস্তানায় রইল সব জিনিস। সামান্য কিছু মালপত্র নিয়ে দু-দিন পরে চলে এলাম মুচিপাড়ার বাড়িতে। সকালবেলা গেছিলাম। নহাজার দুশো টাকা ইতোর বাড়িওলার হাতে তুলে দিয়ে ঘরের দখল নিলাম। তারপর ঘরে তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কাজকর্ম শেষ করে, ফরডাইস লেনের হোটেলে একপেট খেয়ে ঢুকলাম নতুন আস্তানায়।
দরজা খুলে ঢুকে ঘুরে দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছি, চোখ পড়ল সামনের ফ্ল্যাটের দরজায়। সে দরজায় এখন আর তালা নেই। ভেজানো রয়েছে। ভেতরে আলো জ্বলছে। তাই দেখা যাচ্ছে, দুই পাল্লার ফাঁকে কে যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্পষ্ট বুঝলাম, নিজেকে আড়ালে রেখে সে আমাকে দেখছে।
আমার আর দরজা বন্ধ করা হল না। সামনের ফ্ল্যাটে তাহলে নতুন ভাড়াটে এসেছে। আমাকে দেখার তার যখন এত কৌতূহল, তাকে দেখার কৌতূহল আমাকে পেয়ে বসল। তাই দুই কপাটে দু-হাত রেখে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
নতুন ভাড়াটে যখন দেখল আমিও তাকে দেখছি, মানে দেখবার চেষ্টা করছি, তখন তো আর দরজা বন্ধ করে খিল তুলে দেওয়া যায় না। দরজা খুলেই তাকে বেরিয়ে আসতে হল।
ভোজালি হেসে সে বললে, চিনতে পারছেন?
কমলা! এখানে?
আমি থ হয়ে গেছিলাম। মুখ দিয়ে কথা বেরোয়নি।
কমলা বললে, ভেতরে আসতে আজ্ঞা হোক।
যন্ত্রচালিতের মতো তার ঘরে বসলাম।
ঘরের একখানামাত্র চেয়ারে আমাকে ইঙ্গিতে বসতে বলে কমলা গিয়ে বসল নোংরা সরু খাটে।
বললে বাঁকা সুরে, আপনি আমার বাবার পেছনে লেগেছেন কেন?
আরও শোচনীয় হল আমার অবস্থা।
