এসব ব্যাপার চাপা থাকে না। জানাজানি হতেই টি-টি পড়ে যায়। তার স্ত্রী আক্ষরিকভাবেই ঝটা মেরে ডাক্তারবাবুকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। ডাক্তারখানা তুলে দেন। একমাত্র মেয়েকে দার্জিলিং অঞ্চলের এক কনভেন্ট স্কুলে পাঠিয়ে দেন।
ডাঃ বিষ্ণুপদ নায়েক আর ফিরে আসেননি। এলে দোকানদার তা জানতে পারতেন। কেন, পাড়ার লোক তাকে ঠেঙাত। ঠেঙাত বাড়িওলার গুন্ডাও। ইনি বড় ভয়ানক লোক। বিষ্ণুপদ নায়েকের ছেলেকে তিনি নিজের ছেলে বলে মেনে নিতে চাননি। বউকেও দূর করে দিয়েছিলেন বাড়ি থেকে। সে ভদ্রমহিলা এখন বলতে গেলে ঝিগিরি করে বাপের বাড়িতে দাদাদের সংসারে। আমি কিন্তু হাল ছাড়লাম না। দোতলা বাড়িটার একতলায় মনিহারি দোকান। দোতলায় দুটো ঘর। একটায় থাকেন ডাঃ বিষ্ণুপদ নায়েকের স্ত্রী-আর-একটা ঘর বন্ধ থাকে। ওঁর মেয়ে কনভেন্ট থেকে এলে দিন কয়েক সেখানে থেকে যায়।
আমি একদিন স্যুটেড বুটেড অবস্থায় গট গটিয়ে উঠে গেলাম দোতলায়। মাসিমা, মাসিমা বলে ডাকতে ডাকতে সোজা ঢুকলাম তার ঘরে। ফেরিওয়ালারা কথা দিয়ে মানুষ কেনে–জিনিস বেচে। এই বিদ্যে আমিও শিখে গেছিলাম। ডাঃ নায়েকের স্ত্রীকেও জয় করতে বেশি সময় লাগেনি। সরলভাবেই নিজের পরিচয় দিয়েছিলাম। আমি সেলসম্যান। কনজিউমার ডিভিশনের কিছু প্রসাধন দ্রব্য ঘরে-ঘরে ইনট্রোডিউস করতে হবে। ওঁর সাহায্য চাই।
সাহায্য পেয়েছিলাম। আলাপও জমে গেছিল। সাহস করে শুধু ডাঃ নায়েকের প্রসঙ্গটা তুলতে পারিনি। ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো ফ্যামিলি ফটোগ্রাফেও ডাক্তারবাবুর কোনও ছবি দেখিনি। ওঁর মেয়ের অনেক ছবি আছে। বেশ চটপটে চৌকস এক কিশোরী।
এই কিশোরীর সঙ্গেও আলাপ হল একদিন। স্কুলের পাট চুকিয়ে তখন সে বাড়ি চলে এসেছে। কলকাতায় যাবে। হস্টেলে থেকে কী সব পড়াশুনো করবে প্ল্যান করছে। মেয়েটি মায়ের মতোই সুন্দরী। কনভেন্টের শিক্ষা আর অবাধ মেলামেশার সুযোগ পাওয়ায় বেঁকা ভোজালি বললেই চলে। দু-দিকে কাটে। বেস কথা বললেই ভোজালি চালায়।
এরপর অনেক দিন, অনেক মাস, অনেক বছর গেছে। আমি আঠার মতো লেগে আছি নায়েক পরিবারের মা আর মেয়ের পেছনে। বিষ্ণুপদর ঠিকানা আমাকে বের করতেই হবে। একমাত্র তিনিই বলতে পারেন, আমি কতখানি পাগল ছিলাম, আর আমার বাবা-মা এখন কোথায়।
সুযোগ একদিন পেলাম।
মাসছয়েক আগের কথা। খুব বৃষ্টি পড়ছিল। পুরুলিয়া ভিজিটে গিয়ে নির্দিষ্ট হোটলে উঠেছি। সকালবেলা আদুরে মায়ের কাছে গিয়ে আদর খেয়ে এসেছি। মা এখন চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। একা বাড়িতে থাকে। হাসপাতাল থেকে পেনশন পায়, জমানো টাকার সুদ খায়, আমিও টাকা পাঠাই। আমি গেলেই ঘ্যানর-ঘ্যানর করে, এবারে একটা বিয়ে কর সতু। আমি বলি, পাগলের কখনও বিয়ে হয়? মা বলে, কে তোকে পাগল বলেছে? আমি বলি, বিষ্ণুপদ নায়েক। তাকে আমি চাই।
আদুরে মা সব জানত। মায়ের কাছে কিছুই গোপন করিনি। সেই বৃষ্টির দিনে রঘুনাথপুর থেকে ফিরে এসে ভাবলাম যাই মাসিমার সঙ্গে একটু গল্প করে আসি। কমলার খবরটাও নেওয়া যাক।
কমলা তার নাম। ডাক্তার নায়েকের মেয়ের নাম।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে থমকে দাঁড়ালাম। শুনলাম, মায়ের সঙ্গে মেয়ের কথা চলছে। দুজনেই খুব উত্তেজিত। এত জোরে কথা বলছে যে মাঝের চাতালে দাঁড়িয়ে শোনা যাচ্ছে।
মেয়ে বলছে, আবার এসেছিল?
মা বলছে, হ্যাঁ।
মেয়ে–টাকা চাইতে?
মা–হ্যাঁ।
মেয়ে–দিয়েছ?
মা–না।
মেয়ে–ইস, আমার সঙ্গে যেদিন দেখা হবে—
মা–মুখ ঘুরিয়ে থাকবি।
মেয়ে–কেন?
মা–-ওর টাকাতেই তো এতগুলো বছর বসে খাচ্ছি, বাড়িভাড়া দিচ্ছি তোর লেখাপড়া হচ্ছে–
মেয়ে–ভাগ্যিস জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা তুলে নিজের অ্যাকাউন্টে রেখেছিলে।
মা–ওই উড়নচণ্ডের ভয়েই করতে হয়েছিল। কিন্তু কী অবস্থাই দাঁড়িয়েছে…খেতে পাচ্ছে না …শরীর ভেঙে পড়েছে…।
মেয়ে–মদ তো ছাড়েনি।
মা–ছাড়তেও পারবে না।
মেয়ে–এখন কোথায়?
মা–সুকুজ হোটেলে।
মেয়ে–বোম্বাইয়ের কাজ?
মা–-ছেড়ে দিয়েছে। কলকাতায় কী যেন করছে।
মেয়ে–যাচ্ছি আমি সুকুজ হোটেলে।
মা–-কমলা!
আমি আর দাঁড়াইনি। তরতরিয়ে নেমে এসেছিলাম নীচে। তখনও বৃষ্টি পড়ছে। রাত হয়েছে। উলটো দিকের বাড়ির বারান্দার তলায় দাঁড়িয়ে রইলাম অন্ধকারে গা ঢেকে।
মিনিট দশেক পরেই দেখলাম কমলা নেমে এল রাস্তায়। মুখ থমথম করছে। এখন ওর বয়স তেইশ কি চব্বিশ। অপরূপা। সালোয়ার কামিজের দৌলতে ভোজালি চেহারা আরও ধারাল হয়েছে। সেই সন্ধ্যায় মনে হয়েছিল, ভোজালিতে যেন নতুন শান পড়েছে।
আমি ওর পেছন-পেছন গেছিলাম। সুকুজ হোটেল পুরুলিয়ার খুব বাজে হোটেল। যত নীচুস্তরের লোকের আস্তানা। এখানে কমলার মতো মেয়ের আসা উচিত হয়নি।
আমি ভেতরে ঢুকলাম। হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। ভেবেছিলাম অনেকক্ষণ দাঁড়াতে হবে। মেয়ে-বাপে কথা ফুরোলেই আমি ঢুকব।
কিন্তু কমলা বেরিয়ে এল পাঁচ মিনিটেই। মুখে হতাশা। বুঝলাম বাপের দেখা পায়নি।
ও চলে যেতেই আমি ঢুকলাম। ম্যানেজার সামনেই বসে। আমার মতো চকচকে চেহারার লোক এ হোটেলে আসে না। তাই সে অবাক চোখে তাকাল আমার দিকে। আমি যে সেলসম্যান, সেটা আঁচ করতে পেরেছিল। হাতের ব্যাগ দেখেই বুঝে নেয়। তাই আমি মুখ খোলবার আগেই বলেছিল, ঘর চাই?
