আর এই সবের ফলেই হাসপাতালের সব জায়গায় যেতে পারতাম, সবকিছু দেখতে পারতাম। বিশেষ করে আমার আদুরে মা যখন ওখানকার নামী নার্স।
দিনকয়েক নজর রাখলাম অফিস ঘরের ওপর। রোজ গিয়ে বসে থাকতাম। কোন আলমারিতে কী ফাইল আছে, সব দেখতাম। রুগিদের কেস-হিস্ট্রি থাকত আলাদা-আলাদা ফাইলে। প্রত্যেক মানসিক রুগির আলাদা ফাইল। মূল্যবান ডকুমেন্ট। অনেক সময়ে আদালত পর্যন্ত যখন কোনও ব্যাপার গড়ায়, তখন হাকিম দেখতে চান হাসপাতালের রেকর্ড। এরকম অনেকবার ঘটেছে বলে আমি সব জানতাম।
সম্পত্তি হাতানোর মতলবেই বিশেষ করে এটা ঘটে। আসল উত্তরাধিকারকে পাগল সাজিয়ে রাখা হয়। পাগলামি এমনিই একটা ব্যায়রাম যা যন্ত্রে ধরা পড়ে না। ভালোমনের ডাক্তার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যা বলেন হাকিম তা বিশ্বাস করে।
আমি তো বাবার ওয়ারিশ। তাহলে বাবা আমাকে পাগল সাজিয়ে হাসপাতালে রেখে উধাও হয়ে গেল কেন?
তক্কেতক্কে রইলাম। একদিন সুযোগ বুঝে ফাঁকা অফিসঘরে ঢুকে বিশেষ একটা আলমারি খুললাম। সেখানে থাকে পুরোনো রুগিদের ফাইল। আমার ফাইল বের করলাম। রিলিজ সার্টিফিকেটের কপি দেখলাম। হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত ডাক্তার আমাকে সম্পূর্ণ সুস্থ বলে ঘোষণা করেছেন।
এর নীচে রয়েছে অনেক রিপোর্ট। কীভাবে চিকিৎসা হয়েছে। কে-কে করেছে। ইত্যাদি।
সবার নীচে রয়েছে আসল কাগজগুলো। যেগুলো আমি খুঁজছিলাম।
আমার বার্থ সার্টিফিকেট আর নয়নতারা-য় ভরতি করানোর জন্যে একজন ডাক্তারের সার্টিফিকেট।
এইটাই নিয়ম। রুগির ঠিকুজিকোষ্ঠী জানাতে হয়, যাকে ভরতি করা হচ্ছে–সে পাগল কি না, তা সার্টিফাই করে দিতে হয় একজন ডাক্তারকে।
আমাকে সার্টিফাই করেছিলেন ডাঃ বিষ্ণুপদ নায়েক। ঠিকানাটা টুকে নিলাম। পুরুলিয়া টাউনের জেনারেল ফিজিসিয়ান।
বার্থ সার্টিফিকেটের কপি করে নিলাম, জন্মেছিলাম দিল্লিতে। বাবার আর মায়ের ঠিকানাও রয়েছে দিল্লির।
অ্যাপ্লিকেশন ফর্মে ছবি লাগানো ছিল আমার। ছিঁড়ে নিলাম। এ ফাইল নয়নতারা আর কোনওদিন দেখবে না।
তারপর বারো বছর ধরে আমার বাবা মা আর ডাঃ বিষ্ণুপদ নায়েককে খুঁজছি। প্রথমে তোলপাড় করেছিলাম পুরুলিয়া টাউন। ডাঃ নায়েকের চেম্বারের ঠিকানায় চলে গেছিলাম। কিন্তু তাকে পাইনি। অনেক বছর আগে তিনি ডাক্তারি ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন। যেখানে ডাক্তারখানা ছিল, সেই ঘরে এখন স্টেশনারি দোকান হয়েছে। দোকানি পুরুলিয়ার পুরোনো বাসিন্দা। ডাঃ নায়েককে চিনতেন। তিনিই বললেন, ডাক্তারবাবু তো এখানে ভাড়া থাকতেন। পুরো বাড়িটাই ভাড়া নিয়েছিলেন। তারপর একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার ঘটে গেল। উনি বউ ফেলে বিবাগী হয়ে গেলেন। আর তাকে দেখিনি। সে আজ চুয়ান্ন বছর আগের কথা।
আমি জিগ্যেস করেছিলাম, বিচ্ছিরি ব্যাপারটা কী?
দোকানি রেগে গিয়ে বলেছিলেন, সে খবরে তোমার দরকার কী? এক ফোঁটা ছেলে! ভাগো।
বাস্তবিকই, ষোলো বছরের একটা ছেলের কাছে সেই কেলেঙ্কারি কাহিনি বলা যায় না। ঘটনাটা তখন না জানলেও পরে জেনেছিলাম। পুরো ব্যাপারটা উদ্ধার করতে সময় লেগেছিল প্রায় চারবছর। আমি সেই ষোলো বছর বয়েসেই বুঝতে পেরেছিলাম বাবা, মা আর ডাক্তারবাবুর হদিশ পেতে হলে আমাকে গোটা ভারত টহল দিতে হতে পারে। তাই ভেবেচিন্তে ট্রাভেলিং সেলসম্যানের চাকরি নিয়েছিলাম আঠারো বছর বয়সেই। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েই রোজগারের ধান্দা শুরু করে দিয়েছিলাম। আদুরে মা আমাকে আটকাতে পারেনি। আর লেখাপড়াও করাতে পারেনি। শুয়োরের গোঁ চেপেছিল মাথায়। কেন এই শাস্তি দিয়ে গেছিল আমার বাবা, মা আর ডাঃ বিষ্ণুপদ নায়েক–আমাকে তা জানতেই হবে।
স্বাস্থ্য মজবুত বলে চাকরিও জুটে গেল সহজে। ফেরিওলার কাজে কোয়ালিফিকেশন দরকার হয় না। শরীরটা পেটাই হলেই চলে যায়।
যে নামী কোম্পানির চাকরি জুটিয়েছিলাম, তার সেলসম্যানদের খাতির অনেক মনোহারি দোকানদারদের কাছে। পুরুলিয়া জেলায় একটা নতুন প্রোডাক্ট-এর ক্যাম্পেন করার জন্যে প্রথমেই এলাম সেই দোকানির কাছে যিনি আমাকে ষোলো বছর বয়েসে হাঁকিয়ে দিয়েছিলেন গোঁফদাড়ি ওঠেনি বলে। বিশ বছরের সত্য বসুকে প্রথমে চিনতে পারেননি। আমার চুলের ডগা থেকে বুটের ডগা পর্যন্ত তখন গ্ল্যামার ঝলমল করছে। চোখেমুখে বুকনির ফুলঝুরি ছুটছে। নামী কোম্পানির দামি স্ট্যাম্প আমার চলনে বলনে।
দু-দিনেই দোকানির মন জয় করলাম। তাকে কিছু বিশেষ সুবিধে পাইয়ে দিলাম। গোটা পুরুলিয়া টাউনে স্পেশ্যাল ডিসকাউন্ট শুধু তিনিই পাবেন। তার দুটো শোকেস কোম্পানির তরফ থেকে হাজার টাকায় ভাড়া নিলাম–শুধু কোম্পানির জিনিস দিয়ে শোকেস দুটো সাজানোর জন্যে। ওষুধ ধরে গেল। চার বছর আগে এই ভদ্রলোকই আমার কাছে যা চেপে গেছিলেন, এখন তা রসিয়ে-রসিয়ে বলে গেলেন।
ডাঃ বিষ্ণুপদ নায়েক মন্দ ডাক্তার ছিলেন না। কিন্তু তার দাম্পত্য জীবন খুব মধুর হয়নি। তার সুন্দরী স্ত্রী-কে তিনি সুখে রাখতে পারেননি। দোষটা তার নিজের। বাড়িওলার বউয়ের কেন ছেলেপুলে হচ্ছে না, তার চিকিৎসা করতে গিয়ে সেই মহিলার সঙ্গে পরকীয়া প্রেম শুরু করে দেন। বউটিকে বাঁজা ভাবা হয়েছিল। আসলে বাড়িওলারই শুক্রকীটের সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা ছিল না। ডাঃ বিষ্ণুপদ নায়েক সেটা হাতেকলমে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন বাঁজা বউয়ের গর্ভে ছেলে এনে দিয়ে।
