দু-একটা পাতলা ছবি মাঝে-মাঝে মনের কোণে উঁকি দেয়। একটা ছবি ভাবতে খুব ভালো লাগে। এ ছবিতে আছে অনেক জল। আমার চারপাশে। মাথার ওপর নীল আকাশ। আকাশ আর জল এক হয়ে গেছে।
আর একটা ছবি মনে পড়লেই গা হিম হয়ে আসে। কেন, তা বলতে পারব না। একটা মুখ…যেন ধোঁয়া দিয়ে গড়া কটমট করে চেয়ে রয়েছে আমার দিকে..নৃশংস চাহনি…এর বেশি কিছু মনে নেই।
তারপর যা বেশি করে মনে পড়ে, তা নার্সিং হোমের আদুরে মায়ের ছবি। আমাকে খুব ভালোবাসত। আমার সঙ্গে কত খেলা করত। কত হাসত। পাহাড়ে আর বনে বেড়াতে নিয়ে যেত।
আদুরে মায়ের কাছে শুনেছিলাম…আর একটু বড় হয়ে শুনেছিলাম আমার বাবা আর মা আগে আসত আমাকে দেখতে। মাস ছয়েক পরে আর আসেনি। এলেও দূর থেকে আমাকে দেখত। কাছে আসত না। আমি না কি বাবাকে দেখলেই ডুকরে কেঁদে উঠতাম। ভয় পেতাম।
তারপরের ছবিগুলো খুব স্পষ্ট। তখন তো আমি বড় হয়ে গেছি। নার্সিং হোম থেকে ছাড়া পেয়েছি। আমার বাবা আর মা আমাকে নিতে আসেনি বলে মানুষ হচ্ছি আদুরে মায়ের কাছে। নার্সিং হোমের কাছেই থাকত আমার এই মা। নিজেদের বাড়ি। বাবা ছিলেন স্কুল মাস্টার। তিনি দেহ রাখার পর আদুরে মা একা থাকত। বিয়ে করেনি। আমিই তার সব। তার চোখের মণি।
আমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে, বড় করেছে, এই আদুরে মা। আদুরে মা বলে ডাকতে নিজেই শিখিয়েছিল। বলত, তোকে আদর দিয়ে বাঁদর করব। একটা বাঁদর পোষার শখ আমার অনেক দিনের। তুই আমার সেই বাঁদর।
রঘুনাথপুরে এখন মস্ত মানসিক চিকিৎসালয় তৈরি হচ্ছে। যখন তৈরি হয়ে যাবে, তখন পুব ভারতে এইটাই হবে সবচেয়ে বড় পাগলা গারদ। রাঁচি ম্লান হয়ে যাবে। পুরুলিয়ার গৌরব বাড়বে। এর পেছনে রয়েছে দিল্লির ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ।
কিন্তু মূল আইডিয়াটা এসেছে নয়নতারা মেন্টাল নার্সিং হোম থেকে। পুরোপুরি বেসরকারি উদ্যোগ। সরকারি গ্রান্ট একটা পেত। আজও পায়। পাবেও। বিরাট সরকারি হাসপাতালের পাশেই থাকবে ছোট্ট সুন্দর, একান্ত ঘরোয়া এই বেসরকারি হাসপাতাল।
এই হাসপাতালকে আমি ভালোবাসি, এখানেই ফিরে এসেছিল আমার মানসিক ভারসাম্য। বছর দুই ছিলাম সেখানে। বছরখানেক ধরে চিকিৎসার টাকা পাঠিয়ে দিত বাবা। তারপর তাও বন্ধ হয়ে গেল। গ্রান্ট ছিল বলেই হাসপাতাল আমাকে দূর করে দেয়নি। দেবেই বা কোথায়। অনাথ আশ্রম ছাড়া আমার যাওয়ার আর জায়গা ছিল না। আদুরে মা তা হতে দেয়নি। হাসপাতাল যখন রিলিজ সার্টিফিকেট দিয়ে আমাকে ছেড়ে দিল, আদুরে মা আমাকে তুলল নিজের বাড়িতে।
যখন স্কুলে পড়ছি, তখন প্রথম জানলাম, আদুরে মা আমার সত্যিকারের মা নয়। ন্যাশনাল ট্যালেন্ট স্কলারশিপের একটা পরীক্ষা দিতে হয়েছিল আমাকে। ফর্মে বাবা আর মায়ের নামের জায়গায় ব্র্যাকেট দিয়ে আদুরে মা লিখেছিল একটাই নাম–সুলোচনা দেবী। বাবার নাম ছিল না।
সেই দিন রাতে খাটে শুয়ে আদুরে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, মা, আমার বাবার নাম লিখলে না কেন?
আদুরে মা প্রথমে কিছুই বলতে চায়নি। কিন্তু আমি বড্ড জেদী ছেলেবেলা থেকেই,। অনেক রাত পর্যন্ত ঘ্যানর-ঘ্যানর করে গেছিলাম।
বলেছিলাম, বলতেই হবে তোমাকে। নইলে ঘুমোতে দেব না।
আদুরে মায়ের তখন হাই উঠছিল। সারাদিন ডিউটি দিয়েছে নয়নতারা-য়। রাত্রে না ঘুমোলে পরের দিন ডিউটি দেবে কী করে। ভুলে গেছি, আদুরে মা ছিল নয়নতারা-র নার্স।
শেষকালে রেগেমেগে মা বলেছিল, সত্যিই বাঁদর হয়েছিস তুই। যা শুনে কোনও লাভ নেই, তা যখন শুনতেই চাস, তাহলে শোন।
সেই রাতে সেই প্রথম জানলাম, যার ঔরসে, যার গর্ভে এই ধরায় আমি আবির্ভূত হয়েছি, তাদের নাম যথাক্রমে সুপ্রিয় আর সাধনা। দুজনের কেউই আমার আর খোঁজ খবর নেয় না। আদৌ তারা বেঁচে আছে কি না, সেটাও কারও জানা নেই।
জানলাম আরও একটা খবর। যা জানবার পর থেকেই আমার মাথায় পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আমার বাবা আর মা আমার মাথা খারাপ বলেই নার্সিং হোমে রেখে গেছিল। কিন্তু মাস ছয় কাটবার পর থেকেই ডাক্তারদের মনে ধোঁকা লাগে। সেরকম অ্যাবনরম্যালিটি না কি আমার মধ্যে ছিল না। আর পাঁচটা সুস্থ খোকাখুকুর মতো আমিও সুস্থ। একথা বলবার সময় যখন এল, তখন থেকেই হাসপাতালে আসা বন্ধ করেছিল আমরা বাবা আর মা।
আদুরে মা আমার বুকেপিঠে হাত বুলিয়ে বলেছিল, সতু, ডাক্তারদের সঙ্গে আমিও একমত। গোড়া থেকেই আমার জিম্মায় তুই ছিলি। প্রথম-প্রথম তুই মাঝে-মাঝে সিঁটিয়ে যেতিস। কথা বলে মনের ভাব প্রকাশ করবার ক্ষমতা ওইটুকু বয়েসে থাকে না। মনের কথা যদি বুঝতেই না পারি, তাহলে আমি মা হয়েছি কেন। এটুকু বুঝেছিলাম, তোর ভেতরে কোথায় একটা আতঙ্ক রয়েছে। আস্তে-আস্তে তা মনের মধ্যেই চাপা পড়ে গেল। তখন তো আর তোকে নার্সিংহোমে রেখে দেওয়ার দরকার হল না। আমিই ডাক্তারদের বলে কয়ে তোকে ছাড়িয়ে নিয়ে রেখে দিলাম আমার কাছে। শুধু অবাক হয়েছি তোর ওই চামার বাবা আর মায়ের কথা ভেবে। কীরকম লোক তারা? সুস্থ সন্তানকে পাগলা গারদে ফেলে রেখে চলে গেল?
বাকি রাতটা আমি ঘুমোতে পারিনি। আমার বয়স তখন ষোল। মায়ের সঙ্গে নয়নতারায় যেতাম। একাও যেতাম। আমায় কেউ আটকাত না। বরং দুদিন না গেলেই জিগ্যেস করত শরীর খারাপ হয়েছে কি না। সব্বাই ভালোবাসত। এখনও বাসে। এই ধরনের নার্সিংহোম থেকে যারা ভালো হয়ে বেরিয়ে যায়, সমাজের স্বাভাবিক স্রোতে মিশে যায় তাদের আরও বেশি ভালোবাসে নার্সিংহোমের সবাই। আমি ছিলাম ওদের গর্ব। মাঝে-মাঝে আমি ওদের গ্রুপ স্টাডি অ্যাটেন্ড করতাম। ডাক্তারদের কাজ সহজ করে দিতাম। ভি আই পি-রা হাসপাতাল দেখতে এলে আমাকে তাদের সামনে যেতে হত। আমি ছিলাম নয়নতারা-র গর্ব। এখন আরও বেশি।
