ইন্দ্রনাথ তখন নস্যির ডিবে বের করল। মুডে থাকলে খুব কায়দা করে নস্যি নেওয়া ওর অভ্যেস। আগে টানত কাচি সিগারেট তারপর হল চুরুট, পাইপ কামড়েও স্টাইল মেরেছে অনেক। এখন সব ছেড়ে দিয়ে চালাচ্ছে শুধু তামাকচূর্ণ মস্তিষ্ককে ঝাঁকুনি মেরে মেরে অ্যাকটিভ রাখার জন্যে। কিন্তু নস্যি যখন নেয়, তখন মনে হয় যেন একটা মস্ত শিল্পকর্ম করছে।
আগন্তুক খাবি খাওয়ার ভঙ্গিমায় নাকমুখ দিয়ে অক্সিজেন টানতে-টানতে দুর্লভ এই দৃশ্য অবলোকন করে গেল। ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে এল। একটু কাষ্ঠ হাসি হাসল–এবার আর অট্টহাসি নয়।
বললে, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমার মানসিক চিকিৎসার দরকার। কারণ আমি পাগল।
ইন্দ্রনাথ সিনেমা-নায়কের ঢঙে অপাঙ্গে তাকিয়ে নিয়ে নস্যির কৌটো পকেটে রাখল। দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে বললে, নিজেকে যে পাগল বলে, সে পাগল নয়।
মক্কেল বললে, কিন্তু আমি পাগল। দাগি পাগল।
মানে?
আমি পাগলা গারদে ছিলাম।
ঘর আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মওকা বুঝে একটা গেরস্ত টিকটিকি টিকটিক করে উঠে বোধহয় সর্বজ্ঞ ভূশণ্ডী কাকের মতো বলে উঠল–ঠিক, ঠিক, ঠিক! মক্কেল নির্ঘাত পাগল।
ইন্দ্রনাথের চাহনি এখন সূচ্যগ্র হয়েছে। ছুঁচের ডগার মতো সরু ওই চাহনির মধ্যেই নিহিত রয়েছে ঈগল চোখের ক্ষমতা। অনেকদূর থেকে অনেক কিছু দেখলেই ঈগল ঠিক আসল জায়গাটাকে বিবর্ধিত আকারে দেখতে পায়। ঈশ্বরের কৃপায় শুধু ঈগলই এই ক্ষমতা পায়নি–পেয়েছে নিশ্চয় ইন্দ্রনাথ রুদ্রও। নইলে হাজার গোলমালের স্তূপের মধ্যে থেকে সঠিক গোলমালটা ও টক করে চিনে নেয় কী করে? তারপরেই নির্মূল করে আসল কারণটাকে সঙ্কটের সমাধান ঘটে। মক্কেলের মুখে হাসি ফোটে। ইন্দ্রনাথের পকেটে টাকা আসে।
হ্যাঁ, এটা ওর প্রফেশন। ও বলে। অ্যামেচার ডিটেকটিভদের অস্তিত্ব শুধু গল্পের বইতেই। আসল ডিটেকটিভকে খাটতে হয়। ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে শুধু বুদ্ধির খেল দেখালেই হয় না। সেই সঙ্গে চাই দক্ষিণা, যে যা দিতে পারে।
আগন্তুকের মুখের দিকে এহেন ঈগল চাহনি নিক্ষেপ করে ইন্দ্রনাথ কী সিদ্ধান্তে এল, সেটা মুখের পরতে প্রকাশ পেল না। চোখদুটো শুধু অনুকম্পায় নরম হয়ে এল। কণ্ঠে শোনা গেল তারই অনুরণন।
বললে, পাগলা গারদে ছিলেন?
মক্কেল বললে, হ্যাঁ।
আমাকে দেখে অমন হাসতে গেলেন কেন?
ঠিক তার মতো দেখতে আপনাকে। চমকে উঠেছিলাম, তারপরেই মনে পড়ে গেল, আমি তো পাগল। তাই–
হাসি পেল। হাসির রাজা অট্টহাসি, চমৎকার হাসি, এমন হাসি কজন হাসতে পারে বলুন। এমন হেঁচকিও কেউ তুলতে পারে না।–কোন পাগলা গারদে ছিলেন?
নয়নতারা মেন্টাল নার্সিংহোম।
সেটা কোথায়?
পুরুলিয়ায়। রিলিজ সার্টিফিকেট কবে পেয়েছেন?
সে অনেক বছর আগে।
কত বছর আগে?
কড়িকাঠের দিকে চোখ তুলে বছরের হিসেব করতে লাগল মক্কেল। সেই অবসরে তাকে খুঁটিয়ে দেখে নিল ইন্দ্রনাথ।
হেঁচকির ঢেউ যতক্ষণ ছিল ততক্ষণ মানুষটাকে মনে হয়েছিল বড্ড অসহায়। নিজের দেহমন্দিরকে যে পুরুষ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না, নিজেকে সে নিতান্ত অপদার্থও মনে করে। তাকে দেখলে তখন মায়া হয়, হাসিও পায়।
কিন্তু এখন সে ভাব তিরোহিত হয়েছে তার চোখমুখ থেকে। হাবভাবে ফুটে উঠেছে সুগভীর আত্মপ্রত্যয়।
উচ্চতায় সে নাতিদীর্ঘ। প্রস্থে কিন্তু বিপুল। তার বিশাল কঁধ, বিরাট বুক এক লহমাতেই জানিয়ে দেয় শরীরের আসুরিক শক্তির অস্তিত্ব। মুখমণ্ডলও চৌকো। চোয়ালের হাড় বেশ চওড়া আর মোটা। কঠিন মনোবল ফুটে উঠেছে ঠেলে বেরিয়ে আসা চিবুকেও। ভুরু লোমশ। নাক পাতলা আর রীতিমতো ধারাল। সবচেয়ে আকর্ষণীয় তার চোখ। চওড়া, চ্যাপটা, স্থূলমুখে ঠিক যেন দু-টুকরো সরোবর ভেসে রয়েছে। ভাবমগ্ন, ধ্যানগম্ভীর, স্বপ্নিল সেই চাহনি যার ওপর পড়ে তাকে টলিয়ে দেয়।
আর এই চাহনি দেখে টলেছিল বলেই ইন্দ্রনাথ তার পরিচয় না নিয়েই তাকে আসন গ্রহণ করতে বলেছিল। পরক্ষণেই শুরু হয়েছিল তুমুল অট্টহাসি আর প্রবল হেঁচকি।
এখন সে তার আশ্চর্য চাহনি কড়িকাঠের দিকে মেলে রয়েছে। ভাবছে।
ভাবনা শেষ হল। চোখ নামিয়ে ধীর গম্ভীর গলায় সে বললে, চব্বিশ বছর আগে।
গলার আর বলার ব্যক্তিত্ব মন ছুঁয়ে গেল ইন্দ্রনাথের। নির্নিমেষে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। ব্যক্তিত্বের এহেন চকিত পরিবর্তন মানসিক অস্বাভাবিকতার পরিচায়ক নয় কি?
স্বর মাধুর্য বজায় রাখল ইন্দ্রনাথ। বললে, চব্বিশ বছর আগে? তখন আপনার বয়স কত ছিল?
চার।
ইন্দ্রনাথের চোখের পলক পড়ল না কয়েক সেকেন্ড।
চার বছর বয়েসে মেন্টাল নার্সিং হোমে ছিলেন?
সরোবর চাহনিতে এতটুকু কাঁপন না জাগিয়ে সে বললে, এই ধাঁধার জবাবটাই আপনার কাছে পেতে এসেছি। সত্যিই কি আমি চার বছর বয়েসে পাগল ছিলাম?
এখন জেনে কী লাভ?
এর ওপরেই নির্ভর করছে আমার বিয়ে–
ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে ইন্দ্রনাথ বললে, বলুন আপনার কাহিনি।
বিচিত্র সেই কাহিনি আগন্তুকের জবানিতেই শোনা যাক।
.
আমার নাম সত্য বসু। আমার বাবার নাম সুপ্রিয় বসু। মায়ের নাম সাধনা বসু। স দিয়েই তিনজনের নামের শুরু। তিন-এর এই অভিশাপ আমার গোটা জীবনে জড়িয়ে রয়েছে।
খুব ছোটবেলার স্মৃতি নেই বললেই চলে। যা আছে তা বড় আবছা। কুয়াশার মতো অস্পষ্ট। তা থেকে উদ্ধার করা যায় না। আমি অন্তত পারিনি।
