আমার সামনে।
.
পারমিতা বললে, বছর চারেক হল সত্যনারায়ণ ক্লাবহাউসের চার্জে এসেছে। এক্স আর্মি ম্যান। দাঁতে দাঁতে পিষে, আগে ছিল চন্দন ডাকাত। এখন খুনি।
গায়ত্রীকে ডাকবেন? ইন্দ্রনাথের স্বর আশ্চর্য শান্ত। চোখে কিন্তু হিরের ঝিলিক–সেই রোশনাই, যা বিশেষ উপলক্ষে দেখা দেয়।
সোনার খড়মজোড়া তুলে রাখল পেছনে।
.
গায়ত্রী সামনে দাঁড়িয়ে। ও এখনও জানে না, সত্যনারায়ণ খুনি!
ইন্দ্রনাথ আমার দিকে চাইল। বললে, নৌকোয় রক্ত দেখেছিলে?
হ্যাঁ, বললাম আমি।
পারমিতা, ইন্দ্রনাথ এবার তাকিয়েছে পারমিতার দিকে, রামকুমারের খুনের খবর পেয়ে মরা হাঁস আর পাখিগুলোকে নৌকোয় করে আনা হয়নি? ঘাস বনেই পড়েছিল?
নিশ্চয়। তখন হাঁসের মাংস কে খাবে?
গায়ত্রী, এবার গায়ত্রীর দিকে তাকিয়েছে ইন্দ্রনাথ, ইংরেজি বোঝ?
ঘাড় নেড়ে সায় দিল গায়ত্রী। চোয়াড়ে মুখ শক্ত। যেন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে।
ইন্দ্র বললে, সত্যনারায়ণ তোমাকে বন্দুক চালানো শিখিয়েছিল?
মনে হল, যেন একটা ঝিলিক দেখলাম গায়ত্রীর খরখরে চোখে। সে জবাব দিল না।
ইন্দ্র বললে, তোমার দাঁত ভাঙল কী করে?
গায়ত্রী নিশ্চপ। শরীর তার অল্প-অল্প দুলছে।
আমি বলছি, বলে গেল ইন্দ্রনাথ, নৌকো নিয়ে দুজনে বেরিয়েছিলেন। পারমিতা তখন বিছানায়। পাড়ে জুতোর ছাপ এঁকে গেল সত্যনারায়ণ। পোড়ামাটির ছাঁচ তোমার ঘরে পেয়েছি। মিঃ নাগরাজন–চতুর্থ জিনিস এই নকল জুতোর ছাঁচগাড়ির মধ্যে রেখেছিনিয়ে নেবেন। গায়ত্রী, তারপর তুমি উঠে দাঁড়ালে কাঠের গুঁড়িতে। গুলি চালালে বন্দুকের বাঁট পেছনে ছিটকে এসে তোমার দাঁত ভেঙে দিল–।
শ্বাপদ গর্জন শুনলাম গায়ত্রীর কণ্ঠে। চোখে বাঘিনীর চাহনি। বললে হিসহিসিয়ে, আই ডোন্ট কেয়ার।
কিন্তু কেন? কেন মারলে রামকুমারকে?
আমার ছেলেকে মেরেছিল বলে।
গুলি করে? বারান্দা থেকে? সোনার খড়ম নিয়ে পালানোর সময়ে? ডাকাত ছিল তোমার ছেলে?
পেছন থেকে সোনার খড়ম জোড়া সামনে এনে বাড়িয়ে ধরল ইন্দ্রনাথ।
জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল গায়ত্রী।
*দক্ষিণী বার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত। শারদীয় সংখ্যা।
স্তব্ধ অট্টহাসি
অট্টহাসি বটে একখানা। ঘর বুঝি ফেটে গেল। কড়িকাঠ কেঁপে উঠল। চারদিকের দেওয়ালে ফাট ধরল।
ভুরু কুঁচকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল ইন্দ্রনাথ। ভেবেছিল, ওই একখানা তেজালো হাসি হেসেই ক্ষ্যামা দেবে আগন্তুক।
কিন্তু তা তো হল না। অট্টহাসি যে ক্রনিক হয়ে গেল। একটা থামতে না থামতেই শুরু হয় আর-একটা। ঘর গমগম করছে। আওয়াজে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অট্টহাসি আর থামছে না। থামানো যাচ্ছে না। চেষ্টা করছে আগন্তুক। চোখে জল এসে গেছে। রুমাল বের করে চোখ মুছছে, মুখ চাপা দিচ্ছে, পেট খামচে ধরছে কিন্তু তেড়েমেড়ে অট্টহাসি বেরিয়ে আসছে মুখগহ্বর দিয়ে।
আর, তারপরেই শুরু হল হেঁচকি। প্রবল হেঁচকি। আগন্তুকের অতবড় কলেবরটাকে ভেতর থেকে মুহুর্মুহুঃ কঁকুনি দিয়ে যাচ্ছে পাকস্থলীর তড়কা।
এরকম কাণ্ড ইন্দ্রনাথ রুদ্রর ঘরে কখনও ঘটেনি। রহস্য আর ষড়যন্ত্রে হাবুডুবু খেয়ে যারা আসে, তারা একেবারে মিইয়ে থাকে। উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় আধমরা হয়ে থাকে।
ইন্দ্রনাথ তাদের চাঙা করে। তাদের জটিল সংকট থেকে কুটিল কাঁটা খুঁজে বের করে দেয়। তারা তখন হেসে বাড়ি ফিরে যায়।
কিন্তু এরকম অট্টহাসি তো হাসে না। বিশেষ করে কী ফ্যাসাদে ফেঁসেছে তা ব্যক্ত করার পূর্বমুহূর্তেই এবম্বিধ অট্টহাস্যের উদ্রেক ঘটে না। এভাবে হেঁচকিও তোলে না।
ইন্দ্রনাথ বুঝল, লোকটা হেঁচকিকে আর কন্ট্রোল করতে পারছে না। হেঁচকিই এখন তার প্রভু হয়ে দাঁড়িয়েছে। দম আটকে আসছে, চোখ ঠেলে-ঠেলে বেরিয়ে আসছে, গোটা অন্ননালিটা যেন পটাং করে ছিঁড়ে যেতে চাইছে।
হেঁচকির হাতে মক্কেলকে ছেড়ে দিয়ে পাশের ঘরে গেল ইন্দ্রনাথ। ফিরে এল একটা সাদা রঙের ট্যাবলেট নিয়ে। আর এক গেলাস জল।
বললে, খেয়ে নিন। স্প্যাজম কমবে। হেঁচকি পালাবে। মক্কেলের তখন কথা বলার অবস্থা নেই। এক হাতে জলের গেলাস, আর এক হাতে সাদা বড়ি নিয়ে দুটোই তুলল মুখের কাছে। একটা হেঁচকি যেই উঠেছে আর সময় না দিয়ে তক্ষুনি বড়ির পেছনে খানিকটা জল দিয়ে পেটে চালান করে দিল মহাকায় মানুষটা।
এরপরেও উঠেছিল খান তিনেক হেঁচকি। তারপর চম্পট দিল একেবারেই। ঘর এখন নিস্তব্ধ। অট্টহাসিও যে স্তব্ধ।
ইন্দ্রনাথ বললে, যে বড়িটা আপনাকে দিলাম তা বারালগন। দুটো বড়ি পকেটে সবসময়ে রাখবেন। বেমক্কা হেঁচকিকে শায়েস্তা করতে পারবেন।
লোকটা তখন টানা লম্বা নিশ্বেস নিচ্ছে। ফুসফুসকে ঠান্ডা করে তুলছে। কথা বলতে চাইছে না। হেঁচকির ভয়ে। ফের যদি তেড়ে আসে।
ইন্দ্রনাথ তাই একাই কথা বলে গেল।
মামুলি হেঁচকি এটা নয়। তাই বারালগন দিলাম। নইলে দিতাম ঠান্ডা জল অথবা গরম কফি। নাছোড়বান্দা এ হেঁচকি ওঠে ক্রনিক নার্ভের ইরিটেশন অথবা ইনফ্লেমেশন ঘটলে। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, ইমোশন্যাল শক–সেই থেকেই হেঁচকি-রূপী সাইকোসোম্যাটিক রিঅ্যাকশন। বুঝছেন?
মক্কেল ঘাড় হেলিয়ে জানাল, সে বুঝতে পারছে।
ইন্দ্রনাথ বললে, আপনার তো দেখছি, মানসিক চিকিৎসার দরকার।
মক্কেল জোরে জোরে ঘাড় নেড়ে সায় দিল এই প্রস্তাবে।
