সত্যনারায়ণ বললে, চলুন।
ইন্দ্র বললে, আপনি মিহিরকে হেল্প করুন। লেকের উত্তর পাড় আর দক্ষিণ পাড়–যেখানে যেখানে ওথেলোর জঙ্গল-বুটের ছাপ ফটো চাই। টয়লেটটা ক্লাব হাউসের কোন দিকে?
ডান দিকে।
কষ্ট-বিকৃত মুখে আমাকে ডেকে নিয়ে প্রায় দৌড়েই ক্লাব হাউসে ফিরে এল ইন্দ্রনাথ। গাড়িটাকে ড্রাইভার গেটের মধ্যে এনে রেখেছে। পাঁচিল ঘুরে আমরা ভেতরে ঢুকে দেখলাম, গাড়ির মধ্যেই বসে রয়েছে সে।
ইন্দ্র গলা নামিয়ে বললে, মৃগ, তুমি শিস দিয়ে তোফা গান গাও শুনেছি।
অবাক হলাম, হঠাৎ এ কথা?
ড্রাইভারকে নিয়ে লেকের পাড়ে যাও–নৌকোয় চড়বার অছিলায়।
তারপর?
নৌকোয় চড়বে। পাড়ের কাছেই ঘুরবে। সত্যনারায়ণকে ফিরে আসতে দেখলেই শিস দিয়ে গান গাইবে। খুব জোরে। যাতে আমি শুনতে পাই।
তথাস্তু।
উত্তেজনায় চাহে কোই মুঝে জংলি কহে সুরটা শিস দিয়ে বের করে ফেলেছিলাম–মিহিরকে পেছনে ফেলে সত্যনারায়ণ তখন হনহন করে ফিরছে। আমার শিস শুনেই থমকে দাঁড়াল। তারপরেই আরও জোরে পা চালিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল ক্লাবহাউসের দিকে–গাছপালার মধ্যে।
মিনিট কয়েক পরেই শুনলাম, বন্দুকের আওয়াজ। একবারই।
মিহির আগে দৌড়েছিল। পেছনে আমি আর ড্রাইভার। গেট পেরিয়েই বাঁ-দিকে কেয়ারটেকারের কটেজ–সামনে, চত্বরের ঠিক মাঝখানে, ক্লাবহাউস।
ইন্দ্ৰনাথ দাঁড়িয়ে আছে কটেজের সামনে। ধুতি আর পাঞ্জাবির লণ্ডভণ্ড অবস্থা দেখে বুঝলাম ভয়ানক ধস্তাধস্তি হয়ে গেছে এখুনি।
পারমিতা বললে, সত্যনারায়ণ! খুনি?
কথাটার জবাব না দিয়ে পুলিশ অফিসারকে বললে ইন্দ্রনাথ, শুধু একটা কলারবোন ভেঙে দিয়েছি। আর রদ্দা মেরে অজ্ঞান করে বেঁধে ফেলেছি–নইলে গুলি খেয়ে মরতাম।
ভালোই করেছেন। মুখখানা উল্কট গম্ভীর করে বললেন নাগরাজন। পুলিশ অফিসার। খুব সিরিয়াস হওয়ার চেষ্টা করছেন। কারণ, ভেতরে কৌতূহলে ফেটে পড়েছেন, কিন্তু আঁচ করলেন কী করে?
ওথেলোর পায়ের ছাপ দেখে।
ওথেলো এখন বসে পারমিতার পাশেই। চোখে সেই স্ফুলিঙ্গ আর নেই। শান্ত সরোবর বললেও চলে।
কী ছিল পায়ের ছাপে? নাগরাজনের প্রশ্ন।
সামান্য তফাত। জঙ্গল-বুট পায়ে দিয়ে ওথেলো যখন হেঁটে গেছেন–তখন তার শরীরের ভার সমান ভাবেই পড়েছে সব ছাপে। যে-ছাপের সারি নিয়ে আপনার সন্দেহবা, যা আপনার দোসরা প্রমাণ–
বলুন, বলুন—
ওথেলো নিজের জায়গা থেকে নাকি বেরিয়ে এসে, পাড় বেয়ে রামকুমারের পেছনে গিয়ে, গুলি ছুঁড়ে আবার ফিরে গেছে নিজের জায়গায়।
হা, হ্যাঁ, এই দুই সারি বুটের ছাপ তাই বলে বটে।
না, বলে না।
কেন বলে না?
মিহির ফটো তুলেছে, ক্যামেরা তুলে দেখাল মিহির কাঞ্জিলাল, আপনি বড় প্রিন্টে তফাতটা দেখতে পাবেন।
কী তফাৎ?
বুটের ছাপ কখনও সমান গভীর নয়। কখনও কম, কখনও বেশি। ওথেলো কি কখনও হালকা, কখনও ভারী হয়ে গেছিলেন?
ওথেলো নির্বাক।
নাগরাজনের প্রশ্ন, ছাপটা নকল?
অবশ্যই। হাতে ধরে কেউ নকল ছাঁচ কাদায় চেপে-চেপে বসিয়ে গেছে।
অসম্ভব। তারও পায়ের ছাপ থাকত কাদায়। নিশ্চয় শূন্যে উড়ে আসেনি।
না। জলে এসেছে।
চেয়ে রইলেন নাগরাজন। পাতলা ঠোঁট শক্ত করে চেপে রয়েছেন।
ইন্দ্রনাথ বললে, নৌকোয় করে সে এসেছিল। নৌকো থেকে নীচু হয়ে কাদায় ছাপ আঁকতে আঁকতে গেছে।
গুলিও ছুঁড়েছে নৌকো থেকে? পেছন-আঁকুনিতে টিপ ঠিক থাকে?
জবাব দিল না ইন্দ্রনাথ।
বললে, পেটের অসুখের অছিলায় চলে গেলাম সত্যনারায়ণের কটেজে। গাড়ি থেকে নেমেই সে আগে কটেজে ঢুকেছিল–দরজা ভেজানো ছিল। ভেতরে গেলাম। একটু খুঁজতেই পেলাম চারটে জিনিস।
বন্দুক আর গুলি দেখেছি। একই কোম্পানির তৈরি, একই মাপের, একই গুলি। ওথেলোসাহেবের যা আছে। অনেকদিন ধরেই সত্যনারায়ণ তাহলে তৈরি হচ্ছিল–এক্স আর্মি ম্যান– ফায়ার আর্মস-এর অসুবিধে ছিল না।
হ্যাঁ, অনেকদিন ধরেই তৈরি হচ্ছিল, ইন্দ্রনাথের গলার সুর এখন অন্যরকম। হেঁয়ালি ভাসছে কথার সুরে।
আরও একটু শক্ত হল নাগরাজনের ঠোঁট, তৃতীয় আর চতুর্থ জিনিস কী পেলেন?
এইটা, বলে পাঞ্জাবি তুলে কোমরে ধুতির ফঁক থেকে একজোড়া বস্তু বের করে টেবিলে রাখল ইন্দ্রনাথ।
ঝুঁকে পড়লাম আমরা সকলেই। ফ্ল্যাশ মেরে একখানা ফটোও তুলে নিল মিহির। ঝিলিক মেরে গেল সোনার গায়ে।
সোনার খড়ম। একজোড়া।
ইন্দ্রনাথ বললে, উলটে দেখুন। লেখা আছে রামকুমারকে দিলাম–স্বামী আত্মানন্দ। বাংলায় লেখা। আপনি বুঝবেন না। কিন্তু এটা তো বুঝছেন, খড়মজোড়া রামকুমারের।
স্খলিত স্বরে নাগরাজন বললেন, স্বামী আত্মানন্দ? মিশনের মহারাজা?
আপনি চেনেন?
না। নাম শুনেছি।
মিশনে টেলিফোন নিশ্চয় আছে? ফোনে কনট্যাক্ট করে দেবেন?
স্বামী আত্মানন্দ?
বলছি। আপনি?
ইন্দ্রনাথ রুদ্র। প্রাইভেট ডিটেকটিভ।
বলুন।
রামকুমার সান্যালকে আপনি চেনেন?
চিনি।
তিনি খুন হয়েছেন।
ও। কে করেছে?
জানবার জন্যেই এই ফোন। আপনি এক জোড়া সোনার খড়ম তাকে দিয়েছিলেন?
হ্যাঁ।
আপনার খড়ম?
আমার বটে। রামকুমারেরও বটে।
প্রাঞ্জল করে দেবেন?
এই মিশনের জমি আর বাড়ি রামকুমারের দান–সেইসঙ্গে ওই সোনার খড়ম। আমি তা পায়ে দিয়ে ওরই নাম লিখে উপহার দিয়েছিলাম। কিন্তু তা তো চুরি হয়ে গেছে।
কে চুরি করেছে জানেন?
না। ডাকাত পড়েছিল রামকুমারের বাড়িতে। চন্দনকাঠের ডাকাত। লুঠপাট করাই ছিল মতলব। সোনার খড়ম নিয়ে পালায়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে গুলি চালিয়েছিল রামকুমার। জখমও করেছিল কয়েকজনকে। কিন্তু মেরে ফেলতে পারেনি। সে তো প্রায় পাঁচ বছর আগের কথা। খড়ম কোথায়?
