কবিতা বলে ওঠে, ওর ঠোঁটে কী হয়েছে?
দাঁত ভেঙেছে–মুখ থুবড়ে পড়ে গেছিল। এদিকে এই অবস্থা–ওদিকে ওর মুখ রক্তারক্তি।
এখানেই থাকে?
ক্লাবহাউসে থাকে। সত্যনারায়ণের স্ত্রী। একটাই ছেলে ছিল। বকাটে। মারা গেছে। দুজনেই সব দেখে। আজকে আনিয়েছি দুজনকেই।
গায়ত্রীর পেছন-পেছন ঘরে ঢুকল তিনজন পুরুষ।
প্রথমজনের দাড়িওয়ালা রাগী চেহারা দেখেই মনে হল নিশ্চয় ওথেলো। লম্বায় ইন্দ্রনাথের সমান যায়, দেখতেও প্রায় সেইরকম–দাড়িটা বাড়তি। চোখের চেহারা প্রায় একইরকম। বড়-বড়। ঝকঝকে। মনের ভাষা লুকোতে পারে না। এই মুহূর্তে সেই চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরোচ্ছে।
পারমিতা বললে, ওথেলো, তুমি আমার পাশে বসো। তুমি যে নিরপরাধ, তা প্রমাণ করতে এসে গেছেন ইন্দ্রনাথ রুদ্র। ওঁর এপাশে মৃগাঙ্ক রায়, ওপাশে কবিতা বউদি। এঁকে তো চেনই, মিহির কাঞ্জিলাল–এবারের শিকার অভিযান নিয়ে আর্টিকেল লিখতে এসেছিলেন। ইন্দ্রনাথবাবু, কী দেখছেন?
ইন্দ্রনাথ চেয়েছিল ওথেলোর পেছনের দুই পুরুষমূর্তির দিকে। একজনকে তো চেনাই যাচ্ছে– পুলিশ অফিসার নিঃসন্দেহে পাহারা দিয়ে নিয়ে এসেছে ওথেলোকে। আর একজন? আবলুস কাঠের মতোন তার গায়ের রং। কালো পাথর কুঁদে তৈরি মূর্তি। চোখ দুটো শক্ত আর লালাভ।
সত্যনারায়ণ–পরিচয় করিয়ে দিল পারমিতা। এক্স আর্মি ম্যান। কথাবার্তাও সেইরকম– উগ্ৰক্ষত্রিয় টাইপের।
ইন্দ্রনাথ প্রথমে কথা বলল এর সঙ্গেই–অবশ্য ইংরেজিতে। তারপর কথা হল পুলিশ অফিসারের সঙ্গে। ইতিমধ্যে কফি রেখে গেল গায়ত্রী। কফি শেষ করেই ইন্দ্ৰনাথ উঠে দাঁড়িয়ে বললে, চলুন, সন্দেহজনক পায়ের ছাপের সারি দুটো আগে দেখে আসি। সত্যনারায়ণ, আপনি দেখবেন চলুন। আপনারা বসুন। মিহিরবাবু, আসবেন? আসুন। মৃগ, তুমিও এসো।
ঘণ্টাতিনেক লাগল গাড়িতে করে যেতে। মিহির আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছিল– যাতে বেলাবেলি অকুস্থল দেখা যায়।
চন্দন লেক বাস্তবিকই বড় মনোরম জায়গা। গাড়ি ছাড়া আসা যায় না। চারদিকে শুধু পাহাড় আর উঁচু গাছ, কুয়াশা আর মেঘ। বড় সঁতসেঁতে।
এরই মাঝে চন্দন লেক যেন পটে আঁকা ছবি। ক্লাবহাউসে দাঁড়িয়ে অবশ্য লেক দেখা যায় না। চারদিকে গাছ আর গাছ। উঁচু পাঁচিল। বড় নিভৃত, নিরিবিলি জায়গা।
গাছপালার মধ্যে দিয়ে পথ বেয়ে পৌঁছলাম লেকের পাড়ে।
বিশাল লেক। ওপাড় দেখা যায় না। বহু পাখি উড়ছে। হাঁস ভাসছে জলে।
এপাড়ে ঘাটে বাঁধা একটা নৌকো। দাঁড় তোলা রয়েছে ভেতরে।
আমরা দক্ষিণ পাড় বেয়ে পায়ের ছাপ দেখতে-দেখতে গেলাম। পুব পাড়ে পৌঁছে পদচিহ্ন অনুসরণ করলাম। চারজনের থেকে হল তিনজনের বীরেশ্বর উঠে গেল নিজের জায়গায়। তারপর হল দুজন–তপন গেল। তারপর একজনের রামকুমার গেল ওপরে। একা ওথেলো এগিয়ে গেছে– বিশেষ বন্টু মারা জঙ্গল-বুট পরে।
শুকতলায় বড়-বড় দাগ।
সত্যনারায়ণ বললে, চারজনেই এখানে এসে জুতো পালটে নেন। ক্লাব হাউসেই সব থাকে। বন্দুক, টোটা–সব।
বোবা হয়ে গেছে ইন্দ্রনাথ। মিহির মোহিত হয়েছে নিসর্গ দৃশ্য দেখে। জাপানি ক্যামেরা বের করে ক্লিক-ক্লিক করে ফটো তুলে যাচ্ছে।
হেঁট হয়ে অনেকক্ষণ ওথেলোর পায়ের ছাপের দিকে চেয়ে রইল ইন্দ্রনাথ।
সিধে হল। চোখ কুঁচকে চেয়ে রইল লেকের দিকে। কুয়াশা বুঝি এখনও সরেনি। নিস্তরঙ্গ জল। হাঁস সাঁতরাচ্ছে বলেই একটু যা ঢেউ উঠছে।
ডাকল মিহিরকে। বললে, ছাপগুলোর ক্লোজ আপ ফটো তুলে দেবেন?
নিশ্চয়, ক্যামেরা নামাল মিহির।
ইন্দ্র বললে, ওথেলোর তিনসারি বুটের ছাপ একই প্রিন্টে যাতে আসে, সেইভাবে তুলবেন।
ও-কে, ও-কে।
নিস্তব্ধ সরোবরের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে পাখির ঝক। কোথাও কোনও আওয়াজ নেই। মাঝে-মাঝে ক্যামেরার ক্লিকিং।
ইন্দ্র বললে, সত্যনারায়ণ সাহেব।
ইয়েস স্যার। মিলিটারি কায়দায় অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে গেল আবলুস মূর্তি। আর্মির জাতই আলাদা।
ওথেলো গুলি ছুঁড়েছিলেন রামকুমারের পেছনে গিয়ে?
ইয়েস স্যার।–ওই তো ওইখান থেকে।
প্রায় বিশগজ দুরে লেকের পাড়ে একটা জায়গার দিকে আঙুল তুলে দেখাল সত্যনারায়ণ।
ইন্দ্র বললে, মিহিরবাবু, আপনার এদিকের ফটো তোলা হয়ে গেলে আসবেন।
যাই।
আমরা তিনজনে এগোলাম। সত্যনারায়ণ আঙুল নামিয়ে দেখাল কাদার ওপর অনেকগুলো জঙ্গল-বুটের ছাপ। এলোমেলো। সব কটাই ওথেলোর বুটের ছাপ।
লম্বা ঘাসের মধ্যে দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম তিনজনে। নরম মাটিতে একটা গোলমতো জায়গা দেবে গেছে।
সত্যনারায়ণ বললে, এইখানে রামকুমার সাহেব হাঁটু পেতে বসে বন্দুক ছুঁড়ছিলেন।
সেখানে দাঁড়িয়ে ঘাসের পাঁচিল ভেদ করে লেকের জল দেখা যাচ্ছে বটে। খুব অল্প।
ভুরু কুঁচকে জলের ধারে ফিরে এল ইন্দ্রনাথ। পেছনে আমরা। মিহির এসে গেছে। মন দিয়ে ফটো তুলছে জঙ্গল-বুটের দাগগুলোর। সামনেই একটা বড় লম্বা গুঁড়ি জলে পড়ে রয়েছে। অল্প গভীর জলে কাদায় গেঁথে রয়েছে। একটা প্রান্ত ঠেকে রয়েছে পাড়ে–আর,-একটা প্রান্ত প্রায় দশ হাত দূরে জলে।
ইন্দ্রনাথ এই গুঁড়ির ওপর দিয়ে ব্যালেন্স করে এগিয়ে গেল। ওদিকে পৌঁছে ঘুরে দাঁড়াল। চেয়ে রইল মিহিরের দিকে। তারপর ঘাসবনের দিকে।
তারপরেই মুখটা একটু বিকৃত হল।
যেন একটা কষ্ট চাপবার চেষ্টা করছে। খামচে ধরল পেটটা। গুঁড়ি বেয়ে টলতে টলতে ফিরে এল পাড়ে। বললে, টয়লেট যাব।
