ভেবেছিলাম একত্রে হবে না–অনেক রাত অপেক্ষা করতে হবে। সোনাগাছিতে মদের কারবারে এবং মেয়েদের কারবারে যাদের যাতায়াত নিয়মিত, কিছুক্ষণের জন্যেও এখানে তাদের আসতেই হয় গলা ভিজিয়ে নেওয়ার জন্যে। জহরতের বাক্স পেয়েও যারা জহরতের মালকিনকে পায়নি, সাকিনার সন্ধানে তারা আসবেই আসবে। সাকিনার সন্ধানে না হলেও টাকা ওড়াতে, ফুর্তি করতে আসবেই। এখানে বসে মদ যারা খায় না, বোতল বগলে করে নিয়ে যায় তারা। মোট কথা, আসতেই হবে। অপরাধীদের চরিত্রের এদিকটা আমার ভালোভাবেই জানা।
মৃগাঙ্ক, ভাগ্য সহায় হয় উদ্যোগীদের। বরাবর তাই দেখেছি। সেই সন্ধ্যাতেও তাই দেখলাম। তিনজন শিখ পাঞ্জাবি ঢুকল ঘরে। চনমনে চোখ। বেপরোয়া ভাবভঙ্গি।
চোখের ইশারা করল সাকিনা। বোরখার আড়ালে দেখলাম চোখ জ্বলছে তার।
ধরণী ঘোষাল তৈরি ছিলেন। তিনজনকেই তুললেন আগে থেকে এনে রাখা ভ্যানে।
তিনজনেই কবুল করেছিল বলবন্ত হত্যার অপরাধ। ওরা ছিল চারবন্ধু। মদ সাপ্লাই ওদের মেন বিজনেস। ট্যাক্সি রেখেছিল বলবন্ত সেই কারণেই। কিন্তু একদিন সাকিনাকে প্যাসেঞ্জার তুলে তাকে গেঁথে ফেলেছিল ছিপে। বাড়ি থেকে বার করে জহরতের বাক্সও তুলেছিল বাড়িতে। মতলব ছিল বোম্বেতে পিঠটান দেওয়ার–সাকিনাকে নিয়েই। ফিল্ম হিরোইন বানাতে। কিন্তু তিন দোস্ত বাগড়া দিয়েছিল মদের কারবার লাটে উঠবে দেখে। দেখতে চেয়েছিল সাকিনাকে। দেখায়নি বলবন্ত। বেলেঘাটায় ওই জন্যেই ওকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হয় সাকিনা আর জহরতের ভাগ দাও নইলে জানে মরো। লড়ে গেছিল বলবন্ত–কিন্তু…
তিনজনের একজনের দিকে আমি একদৃষ্টে চেয়েছিলাম। অনেকক্ষণ থেকেই। মাথায় সে ছোটখাটো, শিখদের মতো লম্বা চওড়া নয়। কথাও বলছে না। চুপচাপ।
ধরণী ঘোষালকে আড়ালে ডেকে বলতেই তাকে ছাড়া বাকি দুজনকে সরিয়ে নিয়ে গেছিলেন তিনি ঘর থেকে।
ঘরে তখন সে আর আমি।
আমি চোখে চোখে চেয়ে বলেছিলাম, তুমি বাঙালি?
চমকে উঠেছিল সে।
এ পথে এলে কেন?
কর্কশ গলায় বলেছিল সে, পেটের জ্বালায়।
কিন্তু এখন তো ইন্ডিয়ান পিনাল কোডের ৩০২ ধারা অনুযায়ী, ফাঁসি হবে তোমাদের। ৩৯০ ও ৪০২ ধারা অনুযায়ী রবারি আর ডেকয়টি চার্জেও ফেঁসে যাবে।
নীরবে চেয়ে রইল সে। ভয় পেয়েছে।
দাড়ি গোঁফ রেখেছ কেউ যাতে চিনতে না পারে–কেন? আরও খারাপ কাজ করেছ? কথা নেই।
বিয়ে করেছ?
হ্যাঁ।
বউ আছে?
হ্যাঁ।
ছেলেমেয়ে?
আছে।
এদের ভাসিয়ে দিয়ে যেতে তো হবে এবার।
ভাসিয়ে দিয়েছি অনেকদিন।
বাড়ি ছাড়া? হ্যাঁ।
কেন?
খেতে দিতে পারি না।
এখন তারা খেতে পাচ্ছে?
মাঝে মাঝে টাকা পাঠাই–মুখ আর দেখাই না।
কোথায় থাকে তারা?
জবাব নেই।
তাদের জন্য মন কাঁদে না? দেখতে ইচ্ছে যায় না?
পকেট থেকে একটা ফটো বার করল সে। কোণ দুমড়ানো মলিন। বললে, এইটাই দেখি রোজ।
দেখি।
ইতস্তত করে বাড়িয়ে দিল সে।
আমি দেখলাম এবং চমকে উঠলাম। ছজনের পরিবারের একজনকে আমি চিনি। শ্রাবণী।
মৃগাঙ্ক, তাই আমি পালিয়ে এসেছি। খেতে না পাওয়া মেয়েটাকে এবার আমি বাপহারাও করলাম জন্মের মতো। তাকে টাকা দিয়েছি, খাবারের বন্দোবস্ত করে এসেছি–কিন্তু শুধু আমিই জানি–ইহজীবনে সে আর বাবাকে ফিরে পাবে না।
সাকিনাকে ফিরিয়ে দিয়েছি তার বাবার কাছে। সে ঘড়িটা চিনিয়ে না দিলে, বলবন্ত সিংয়ের হত্যাকারীকে ধরতে পারতাম না। ধরণী ঘোষালরা একদম মাথা খাটান না–এইটাই ওঁদের বড় দোষ। বলবন্ত সিংয়ের কব্জিতে ঘড়ি পরার দাগ ছিল। কিন্তু ঘড়িটা নিয়ে একদম মাথা ঘামাননি। টাকা পয়সাসমেত হত্যাকারীরা সেই ঘড়িটাও তো খুলে নিয়ে গেছিল। একজন না একজন হাতেও নিশ্চয় পরেছিল–নিশ্চয় দামি বলেই নিয়ে যাওয়ার লোভ হয়েছিল। সাকিনাই চিনিয়ে দেয় ঘড়িটা। ক্যাসিয়ে কোয়ার্জ ঘড়ি-মাস, তারিখ, বার, অ্যালার্ম–সব আছে সেই ঘড়িতে। এই একটিমাত্র সূত্র সন্ধানেই সাকিনার সঙ্গে দেখা করেছিলাম এবং দ্বিতীয় প্রশ্নটা করেছিলাম।
যাক সেকথা, শ্রাবণীকে পিতৃহীন করার অপরাধ বুকে নিয়ে পালিয়ে এসেছি এই পাহাড়-বনের নির্জনতায়। বিবেককে জিগ্যেস করছি বারবার, সমাজের ভালো করতে গিয়ে নির্দোষদের সর্বনাশ করার কোনও অধিকার কি আছে আমার? শ্রাবণী তো নিষ্পপ–কেন তার এত বড় ক্ষতি আমি করলাম? খ্যাতি? যশ? কৃতিত্বের অহঙ্কার? মরীচিৎকার পেছনে আর কতদিন ছুটে চলব, মৃগাঙ্ক, বলতে পারো?
* রোমাঞ্চ পত্রিকায় প্রকাশিত।
স্যার আর্থার কোনান ডয়ালের গল্প নিয়ে গোয়েন্দা ধাঁধা
ইঞ্জিনিয়ারের বুড়ো আঙুল। শার্লক হোমস
ওয়াটসনের তখন মরবার সময় নেই। ঘর সংসার নিয়ে ব্যস্ত। সদ্য বিয়ে হয়েছে। একদিকে বউ, আরেক দিকে রুগি। দু-দিক সামলাতে গিয়ে ব্যাচেলর বন্ধু শার্লক হোমসকে পর্যন্ত ভুলতে বসেছে।
ঠিক এই সময়ে একদিন ভোরবেলা ঘুম চোখে নীচে নেমে আসতে হল ওয়াটসনকে। অদ্ভুত একটা রুগি এসে বসে আছে বসবার ঘরে। লোকটা পেশায় হাইড্রলিক ইঞ্জিনিয়ার। বুড়ো আঙুলটা সদ্য কাটা গেছে। রক্তে জবজবে রুমাল জড়ানো।
ব্যান্ডেজ করার পর ইঞ্জিনিয়ার বললে, আমাকে এখুনি পুলিশের কাছে যেতে হবে। কেসটা সিরিয়াস।
ওয়াটসন এই সুযোগে শার্লক হোমসের ওকালতি করে বসল। শুনে লাফিয়ে উঠল আঙুলকাটা ইঞ্জিনিয়ার। পুলিশের চাইতে হোমসের ওপর তার আস্থা বেশি।
