রামকুমার সান্যালও পারমিতার প্রণয় প্রার্থী। যে চারজনকে নিয়ে জঙ্গলের হাওয়া খেতে গেছিল পারমিতা সেই চারজনই ওকে ভালোবাসে। কিন্তু চারজনেই জানে পারমিতা মালা দেবে কার গলায় আর কে হবে পৃথিবীর অন্যতম ঈর্ষণীয় বড়লোক।
এহেন পরিস্থিতিতে জঙ্গলের মধ্যেই গুলিবিদ্ধ হল রামকুমার। ওথেলো ছিল চন্দন লেক এর উত্তর-পূর্ব কোণে। বিশ গজ ডাইনে রামকুমার। রামকুমারের বিশ গজ ডাইনের জায়গাটা খালি ছিল পারমিতার জন্যে। কিন্তু পারমিতা যায়নি–শরীরটা হঠাৎ খারাপ হয়ে পড়ায় বলেছিল, একটু দেরি করে যাবে। এই ফাঁকা জায়গাটার আরও বিশ গজ ডাইনে ছিল তপনমোহন শিকদার, তারও বিশ গজ ডাইনে চন্দন লেকের একদম দক্ষিণ-পূর্ব কোণে বীরেশ্বর ভৌমিক।
অর্থাৎ চন্দন লেকের গোটা পুব পাড়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছিল চারজনে।
এই পাড়ের ঘাসবন প্রায় বারো ফুট উঁচু। কেউ কাউকে দেখতে পায় না। ছোট-খাট জন্তুরা ঘাসে গা লুকিয়ে আসে জল খেতে। তার মধ্যে বড় জন্তু থাকলেও রক্ষে নেই। কারও কিছু বলবার নেই। কেননা, এ তল্লাটের বনজঙ্গল পাহাড় সবই তো পারমিতার বাবার। প্রাইভেট এরিয়া।
সন্ধে সাতটার মধ্যেও পারমিতা যেতে পারেনি শরীরটা বড় ম্যাজম্যাজ করছিল বলে। কিন্তু ফায়ারিং আওয়াজ শুনেছে ক্লাবহাউসে বসেই। সাতটার মধ্যেই সবার ফেরার কথা। সাড়ে সাতটা নাগাদ ফিরে এল তপন, বীরেশ্বর, ওথেলো।
ফিরল না শুধু রামকুমার।
মেয়েদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় একটু বেশি মাত্রায় সজাগ থাকে। তাই খচ করে উঠেছিল পারমিতার বুক।
তপন, বীরেশ্বর, ওথেলো–এই তিনজনেও অবাক হয়েছিল রামকুমারের না ফেরায়। ওরা ভেবেছিল, আগেভাগে পারমিতার কাছে রামকুমার ফিরে এসেছে নিরিবিলিতে পারমিতাকে কাছে পাওয়ার জন্যে।
ছটা পর্যন্ত রামকুমারের বন্দুকের আওয়াজ শুনেছে ওথেলো। ও ছিল বাঁ-দিকে। বিশ গজ দূর থেকেই দেখেছে বারো ফুট লম্বা ঘাসের মাথায় ধপাধপ পড়ছে মরা হাঁস–প্রায় তিরিশ চল্লিশ ফুট ওপরকার উড়ন্ত হাঁস যে ওর গুলি এড়িয়ে যেতে পারছে না–তা তো দেখা যাচ্ছিল।
ছটার পর থেকেই হাঁসেরা উড়ে গেছে রামকুমারের মাথার ওপর দিয়ে। বন্দুকের আওয়াজও তাই শোনা যায়নি। তাই সাতটা বাজতেই চন্দন লেকের উত্তর পাড় ধরে ক্লাবহাউসে ফিরে এসেছে। ওথেলো।
দক্ষিণ পাড় বেয়ে ফিরেছে তপন আর বীরেশ্বর।
এসে দেখল ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে পারমিতা। কাছে দাঁড়িয়ে সত্যনারায়ণ। আগে ছিল আর্মিতে। এখন এই ক্লাবহাউসের কেয়ারটেকার।
রামকুমারের খোঁজে বেরিয়ে গেছিল এই সত্যনারায়ণ।
ডেডবডি সে-ই দেখেছে। বারোফুট উঁচু ঘাসের মধ্যে একটুখানি ফাঁকা জায়গা। রামকুমার মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে সেখানে। গুলি তার পিঠে ঢুকে বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে।
বডি ঘাড়ে করে ফিরে এসেছে সত্যনারায়ণ। পুলিশ এসেছে। তারা পিঠ-বুকের ফুটোর মাপ নিয়েছে। যে মাপের গুলি পিঠ দিয়ে ঢুকে বুক দিয়ে বেরিয়ে গেছে, সেই মাপের গুলিই ওথেলো ছুঁড়েছে মাত্র বিশ গজ দূরে।
ও-মাপের গুলি আর বন্দুক নেই অন্য দুজনের কাছে।
ওথেলোই যে খুনি–তার পয়লা নম্বর প্রমাণ এটা।
নম্বর দুই প্রমাণ ও পায়ের ছাপ।
চার বন্ধুই বন্দুক ঘাড়ে করে চন্দন লেকের দক্ষিণ পাড়ে গেছে যে-যার জায়গায়। জায়গা আগে থেকেই ঠিক করে রেখে দিয়েছিল সত্যনারায়ণ। কাদার ওপর রয়েছে চারজনের পায়ের ছাপ– ফিরেছে দুজন–সেই ছাপ। ওথেলোর পায়ের ছাপ লেকের পুব পাড় বেয়ে সটান চলে গেছে উত্তর পুব কোণ পর্যন্ত নিজের জায়গায়। সেইখান থেকেই একসারি পায়ের ছাপ ফিরে এসেছে উত্তর পাড় বেয়ে–যখন ফিরেছে, তখনকার ছাপ।
এ ছাড়াও রয়েছে আরও দু-সারি পায়ের ছাপ–মানে, জঙ্গল-বুটের ছাপ। ওথেলো নেমে এসেছে নিজের জায়গা ছেড়ে। কাদা মাড়িয়ে ফিরে গেছে রামকুমার যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তার পেছনে লেকের পাড়ে। আবার ফিরে এসেছে নিজের জায়গায়।
যেন, কথা-বলা পায়ের ছাপ। যা বলতে চাইছে। তাই এই : ওথেলো এখান দিয়ে গিয়ে রামকুমারকে পেছন থেকে গুলি করে মেরে ফিরে গেছে নিজের জায়গায়।
তেসরা প্রমাণ জুগিয়েছে তপন আর বীরেশ্বর।
দক্ষিণ পাড় বেয়ে শিকার-অভিযানে যাওয়ার আগে তুমুল ঝগড়া চলছিল রামকুমার আর ওথেলোর মধ্যে। ওরা দুজনে এগিয়ে গেছিল–অনেক পেছনে যাচ্ছিল তপন আর বীরেশ্বর! দু চারটে কথা কানেও এসেছে।
ঝগড়াটা পারমিতাকে নিয়ে।
রামকুমার টিটকিরি দিচ্ছিল ওথেলো-কে। কীরে! শেষকালে টাকার লোভে গলায় মালা পরতে যাচ্ছিস? রেগে আগুন হয়ে গেছিল ওথেলো।
তারপরেই রামকুমার খতম।
এবং ওথেলো গ্রেপ্তার।
পাইপ নামিয়ে বললে ইন্দ্রনাথ, পারমিতা, আপনার কী মনে হয়? ওথেলো খুন করেছে। রামকুমারকে?
পারমিতা ইন্দ্রনাথের চোখে-চোখে চেয়ে বললে, না। ওকে দেখলে বুঝবেন।–দেখবেন?
চার চোখ এক হয়ে রইল কিছুক্ষণ।
আস্তে বললে ইন্দ্রনাথ–তাকে এখানে আনা হয়েছে?
আপনি আসছেন বলে। পুলিশ আমার কথা শোনে।
আনান এখানে।
গায়ত্রী, একটু গলা চড়িয়ে ডাকল পারমিতা।
ঘরে ঢুকল মাঝ বয়সি একটি স্ত্রীলোক। মাইশোরের মেয়ে অবশ্যই। শাড়ি পরা দেখেই মালুম হয়। খুব ফরসা। চোখমুখ একটু চোয়াড়ে। ঠোঁট ফুলে রয়েছে। একহাতে চাপা দিয়ে রয়েছে।
কানাড়া ভাষায় হুকুম দিল পারমিতা। বেরিয়ে গেল গায়ত্রী।
