ইন্দ্রনাথকে চেনে মাইশোরের মেয়ে?
বাঙালি যে। আপনার গল্পের ফ্যান। খুনি সাব্যস্ত করা হয়েছে তার ভাবী বরকে।
মাই গড! তাহলে তো ইন্দ্রনাথকে খোশামোদ করতেই হয়।
করুন। কখন ফোন করব?
আধ ঘণ্টা পরে।
পরের দিন সকাল ছটা কুড়ির ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স-এর বিমানে চেপে ব্যাঙ্গালোরের মাটি ছুঁলাম কাঁটায়-কাঁটায় আটটা পঁয়তাল্লিশে।
ভীষণ উদ্বিগ্ন মুখে অভ্যর্থনা জানাল মিহির কাঞ্জিলাল। যেহেতু ব্যাঙ্গালোর জায়গাটা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আড়াই হাজার ফুট উঁচুতে এবং ধারে কাছে কোথাও সমুদ্র নেই–তাই বেশ নাতিশীতোষ্ণ আর ঘাম-টাম হয় না বললেই চলে। মওকা বুঝে সুট পরার রেওয়াজ ওখানে বেশি। দিশি সাহেব প্রায় প্রত্যেকেই।
মিহির কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে চিরকালের খদ্দরের খয়েরি পাঞ্জাবি আর ধুতি পরে। চুল যেমন থাকে বরাবর–অর্থাৎ উস্কখুস্ক। বয়সের অনুপাতে পেকেছে বেশি। দাড়ি-গোঁফও কামায়নি–বুঝলাম, ঘুম ভেঙেছে এখুনি।
সদা উদ্বিগ্ন থাকা ওর একটা স্বভাব। দুনিয়ার টেনশন যেন মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কবিতাকে দেখেই কিন্তু এহেন টেনশনও মিলিয়ে গেল মুহূর্তে।
বললে সোল্লাসে এবং সহাস্যে, আরে পুঁটলি বউদিও যে।
আমার গিন্নি কবিতা যদিও পুঁটলির ধারকাছ দিয়েও যায় না। বম্বের মেয়ে হয়েও খাঁটি বাঙালি কিন্তু পুটলি নয়।
চোখ পাকিয়ে সে বললে, ফের।
আধ হাত জিভখানা সড়াৎ করে বেরিয়ে এল মিহিরের মুখবিবর থেকে, সরি বৌদি। কিন্তু দাদার কেঁচা ধরে সব সময়ে ঘোরেন তো–
উলটো। আপনার দাদাই আমার আঁচল ধরে ঘোরে।
পেছন থেকে গম্ভীর গলায় ইন্দ্রনাথ বললে, রহস্যালাপ পরে হবে। আগে যাওয়া যাক পারমিতার কাছে।
.
আমরা এখন বসে রয়েছি পারমিতা হাজরার বৈঠকখানায়। ঘরের বর্ণনা আর দেব না– তবে বাড়িটার বর্ণনা এক ঝলকে জানিয়ে দিই। বাকিংহাম প্যালেসে নাকি ৬৬২টা ঘর আছে। ব্যাঙ্গালোরের বাইরের দিকে ম্যাঙ্গালোর যাওয়ার পথে–জঙ্গল ঘেঁষা এই প্রকাণ্ড প্রাসাদেও মনে হল ঘরের সংখ্যা ওইরকমই হবে। কত পয়সা থাকলে এই আক্রাগণ্ডার যুগে এতবড় বাড়ি একটা মানুষ বানাতে পারে–তা ভাবতে গিয়ে মাথা ঘুরে গেছিল। এই মুহূর্তে এই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনীব্যক্তি এখন ব্রুনেই-য়ের সুলতান। ৩,৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের মালিক। পারমিতা হাজরার বাবা কত টাকার মালিক, তা এই দেশের ইনকাম ট্যাক্স অফিসাররাও আঁচ করতে পারে না–ঘাঁটাতে যায় না। যার টাকা আছে, তার ক্ষমতাও আছে–তাকে দূর থেকে পেন্নাম ঠোকাই ভালো। তবে স্ক্যাম এর চার-পাঁচ হাজার কোটি টাকা উনি নাকি ইচ্ছে করলেই মিটিয়ে দিতে পারেন–এমন একটা আভাসও দিয়েছিলেন বন্ধু মহলে।
এমন ব্যক্তির একমাত্র মেয়ে এই পারমিতা। অপ্সরা তো কোনওদিন দেখিনি, পারমিতাকে দেখে আশ মিটিয়ে নিচ্ছিলাম। এত টাকার মালিক বলে মনেই হয় না। কবিতার সঙ্গে জমে গেল চক্ষের নিমেষে।
ইন্দ্রনাথ এখন নস্যি আর পাইপ দুটোই চালাচ্ছে। এই মুহূর্তে ও পাইপ টানছে আর পারমিতার কথা শুনছে। ওর বাবা বিশ্ববন্ধু এখন ইন্ডিয়ায় নেই।
ভদ্রলোকের চন্দন কাঠ আর হাজারো ব্যাবসা নিয়ে মাথা ব্যথা ছিল না পারমিতার। শিক্ষা দীক্ষা সবই তো আমেরিকায়। হার্ভার্ড-এর পড়াশুনা শেষ করে ঢোকে মাইক্রোসফট কর্পোরেশনে, যেখানে কাজ করতে করতে কম্পিউটরের এমন একটা প্রোগ্রামিং আবিষ্কার করে, যা কম্পিউটরের যে কোনও ভাইরাসের যম। ফলে, পৃথিবীর কোটি-কোটি পারসোনাল কমপিউটার-ওয়ালারা ওর এই প্রোগ্রাম কিনছে। বেলজিয়ামের নতুন-নতুন তুখোড় ভাইরাসও কাছে ঘেঁষতে পারছে না।
ব্যাঙ্গালোরেই কিন্তু হেডকোয়ার্টার বানিয়েছে পারমিতা। ইন্ডিয়ার ইলেকট্রনিক সিটি তো এখন ব্যাঙ্গালোর। আগে যার নাম ছিল গার্ডেন সিটি অফ ইন্ডিয়া। পৃথিবীজোড়া কোম্পানির কয়েকশ ব্রাঞ্চে পাঠিয়ে দিচ্ছে নতুন প্রোগ্রামিং সফটওয়্যার রপ্তানি করে দেদার টাকা এনে দিচ্ছে ভারত সরকারকেও।
কাজেই ওর সময় অঢেল। বাপের আর নিজের টাকা আগামী পঞ্চাশ জন্মেও উড়িয়ে পুড়িয়ে শেষ করতে পারবে না বলে ফঁক পেলেই বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আড্ডায় জমে যায়।
ওর প্রিয়তম আচ্ছা হল বনে-বাদাড়ে। শিকার করা মোটামুটি নিষেধ। কিন্তু জঙ্গলে জন্তু থাকলেই বন্দুকধারীদের হাত নিশপিশ করবেই। কখনও হাঁস, কখনও হায়না–এইসব নিয়েই মেতে থাকে। ম্যাঙ্গালোরের দিকে যেতে মার্কারা-র গভীর জঙ্গলে একটা ক্লাব-হাউসও বানিয়ে রেখেছে। জায়গাটা জেনারেল কারিয়াপ্পার বাড়ির কাছেই। সব সময়েই সেখানে মেঘ আর কুয়াশা পাহাড় ঘিরে থাকে। এখানকারই একটা পাহাড়ে বসে ইন্ডিয়ার সেরা সূর্যাস্ত দেখা যায়। বিধান রায়ও দেখে গেছিলেন। সেরা সূর্যোদয় দেখার জায়গাটা টাইগার হিলে সবাই তা জানেন।
এই ক্লাব-হাউসে তিন দিন আগে চার বন্ধুকে নিয়ে সময় কাটাতে গেছিল পারমিতা। ব্যাঙ্গালোরের মালেশ্বরমে বাঙালিদের মস্ত ঘাঁটি আছে। চার বন্ধুই থাকে সেখানে। চারজনেই বাঙালি। চার জনেই জোয়ান পুরুষ।
হ্যাঁ, পুরুষ। নারী বন্ধু একদম পছন্দ করে না পারমিতা।
এই চারজনের একজনের নাম ওথেলো। ওথেলো বোনার্জি। বিলেতে থাকবার সময়ে ব্যানার্জিকে বোনার্জি বানিয়েছে।
ওথেলোকেই বিয়ে করবে পারমিতা এইটাই ঠিক হয়ে রয়েছে, মানে কানাঘুষো সেই রকমই যখন চলছে ঠিক সেই সময়ে ওথেলোকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল রামকুমারকে গুলি করে খুন করার অভিযোগে।
