বাকি কথাগুলো ভূপেশের কথার মতোই–তফাত নেই। দুজনের চেহারাও একরকম। তালঢ্যাঙা, লম্বাচুল, ঢিলে জিন টাইট স্কিনি, ঝোলা গোঁফ। মেয়ে কি মদ্দা বোঝা যায় শুধু ওই গোঁফ দেখে। দুজনেরই পকেটে সমান মাপের দুটো ছুরি। দুজনেই বলছে ছুরি রাখতে হয়েছে আত্মরক্ষার জন্যে। ভূপেশ বলছে, মাইকেল ওকে ছুরি মারবে ক্যাম-মুক্সের মুখে শুনে অবধি সে ছুরি রেখেছে। পকেটে। ঠিক উলটো গীত গাইছে মাইকেল। দুজনকেই ফাটকে ঢুকিয়েছি।
কিন্তু মিথ্যে বলছে কে ধরা যাবে একটি সূত্র ধরে।
কী সুত্র? শুধোল ইন্দ্রনাথ।
মাইকেলের ছুরিতে রক্ত লেগেছিল রুমাল দিয়ে মুছেছে। ওর বুড়ো আঙুলটাও বেশ কেটে গেছে। বলছে হঠাৎ কেটে গেছে। মেডিক্যাল রিপোর্টে ধরা যাবে ছুরির রক্ত আর ক্যাম-মুক্স-এর রক্ত এক গ্রুপের কি না।
ভালো সূত্র, বললে ইন্দ্রনাথ। সেইসঙ্গে আরও একটা পয়েন্ট চেক করিস কাল দিনের আলোয়।
কী?
আজকের বৃষ্টিতে গোরস্থানের ভিজে মাটিতে নিশ্চয় পায়ের ছাপ পড়েছে দুজনের। শ্রীচরণ থেকে জুতোগুলো খুলে নিয়ে গিয়ে মিলিয়ে দেখবি।
তুই বলার আগেই সে ব্যবস্থা হয়ে গেছে। দড়ি দিয়ে জায়গাটা ঘিরে সেপাই বসিয়ে এসেছি। আমি নিজে যাচ্ছি কাল সকালে।
পরের দিন দুপুরবেলা ফের ফোন এল।
ইন্দ্রনাথ? জয়ন্ত বলছি। সব গুবলেট হয়ে গেল।
কেন?
ছুরির রক্ত আর ক্যাম-মুক্স-এর রক্ত এবি গ্রুপের। কিন্তু মাইকেলের রক্তও যে এবি গ্রুপের। সুতরাং কিছুই প্রমাণ করা যাচ্ছে না।
জগাই মাধাইয়ের চরণ চিহ্ন?
সে গুড়েও বালি ব্রাদার। মাসখানেক আগে দু-জনেই একই দিনে একই মাপের বাটার রবারসোল স্পোর্টস শু কিনেছিল। দু-জোড়া জুতোই সমানভাবে ক্ষয়েছে। কবরখানায় প্রিয়ামিলনে গিয়েছিল দু-জনেই ওই জুতো পরে। দুজনের জুতোতেই কাদা মাখামাখি। একী ঘ্যাঁচাকল রে বাবা। কী করি বলত?
একটুও না ভেবে ইন্দ্রনাথ বলল–ভূপেশকে গ্রেপ্তার করবি। রবারসোলের জুতো পরে কেউ ইন অ্যান্ড আউটের সাইকেডেলিক নাচের আসরে যায়? গুল মারবার আর জায়গা পায়নি? *যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত (শারদীয় সংখ্যা, ১৩৮১)।
সোনার খড়ম
কে, মৃগাঙ্ক রায়?
মিহির কাঞ্জিলালের কণ্ঠস্বর মনে হচ্ছে।
অধমের নাম তাই বটে। রায়মশায়ের হাত কি খালি?
নতুন লেখার জন্যে? হবে না–হাতে ব্যথা।
যাচ্চলে। কথাটা শুনবেন তো।
শুনছি। শুনছি। শুনছি।
খেপে আছেন কেন? না, না, গল্প-টল্প চাই না। তবে গল্পের মশলা জুটিয়ে দিতে পারি।
এবার কিঞ্চিৎ আগ্রহ প্রকাশ করতে হল। গোয়েন্দা গল্প লেখা ইদানীং কষ্টকর হয়ে পড়েছে ভালো উপাদানের অভাবে। এখানকার খুনেরা পুলিশদের চেয়ে বেশি ধুরন্ধর তো বটেই, অস্ত্র সম্ভারেও পুলিশদের টেক্কা মেরেছে। এখন তাদেরই হাতিয়ারের প্রদর্শনী দেখতে এবং তা থেকে জ্ঞান অর্জন করতে দৌড়চ্ছে পুলিশের লোক।
সুতরাং পুলিশ মহল থেকে উত্তম মালমশলা পাওয়া দুষ্কর। বন্ধুবর ইন্দ্রনাথ রুদ্রও চ্যালেঞ্জিং কেস ছাড়া মাথা ঘামাতে চাইছে না। ও বলে, অবলা অবোধ নারীই এখন বধ্যভূমিতে অবতীর্ণ হয়ে মানুষ বধ করে চলেছে অবলীলাক্রমে, অতএব আমি আর নেই।
আরে, নেই বললে আমার কি আর চলে। দুটো পাতা লিখলে তবে দুটো পয়সা পাওয়া যায়। পয়সার অবশ্য আমার তেমন দরকার নেই কিন্তু কাজের দরকার তো আছে। কঁহাতক বসে বসে আর গিন্নির সঙ্গে কেঁদল করে দিন কাটানো যায়। বিশেষ করে যে গিন্নি গোয়েন্দা গল্পের নম্বর ওয়ান পোকা এবং আমার কলম দিয়ে আর গোয়েন্দা গল্প বেরুচ্ছে না বলে উদয়াস্ত টিটকিরি দিয়ে চলেছে।
মিহির কাঞ্জিলালের সুমিষ্ট বচন শুনে তাই অন্তরে পুলক অনুভব করলাম।
মিহির আমাদের পুরোনো দোস্ত। একটু-আধটু পলিটিক্স করে বটে, তবে তোক ভালো। সব পলিটিসিয়ান তো হৃদয়হীন নয়। নীতিবোধ, মূল্যবোধ আছে অনেকেরই। এই রকমই এক ব্যক্তির সান্নিধ্যে থেকে এবং ইন্ডিয়া জোড়া এহেন কু-রাজনীতির তুফানের মধ্যে থেকেও গা-বাঁচিয়ে চলছে মিহির; সেইসঙ্গে চুটিয়ে সম্পাদনা চালিয়ে যাচ্ছে একটা কাগজের। সাহিত্যও ভালোবাসে। তাই আমরাও ওকে ভালোবাসি এবং সুযোগ পেলেই মুখ নাড়া দিই।
সেই কাঞ্জিলাল ফোন করেছে গল্পের মশলা দেবে বলে।
অতএব নড়ে বসতে হল।
বললাম, বৎস কাঞ্জিলাল–
বৎস! বয়সে তো মোটে তিন বছরের ছোট—
এই ক্ষেত্রে আপনাকে গো–বৎস বলতে চাইছি। অর্থাৎ বাছুর। ঢুঁ মারা হয়েছে কোথায়?
টেলিফোনের আওয়াজ শুনে ধরতে পারছেন না?
টেলিফোনের আওয়াজে কি টেলিফোন-ভুসির ঠিকানা থাকে?
খুব স্পষ্ট শুনছেন বলে মনে হচ্ছে?
স্পষ্টই তো।
ফোন করছি কিন্তু অনেক দূর থেকে।
কতদূর থেকে?
ব্যাঙ্গালোর থেকে।
থমকে গেলাম। তারপর, কী হয়েছে সেখানে?
খুন।
পুলিশ নেই ব্যাঙ্গালোরে?
আছে। কিন্তু গোয়েন্দা নেই।
আমি গোয়েন্দা নই।
আপনার বন্ধু তো বটে।
ইন্দ্রনাথ? ছ্যাঁচড়ামি ও ছেড়ে দিয়েছে।
বাট দিস ইজ নট ছ্যাঁচড়ামি। একটা মানুষ খুন হয়েছে নিরপরাধ আর একটা মানুষকে নিয়ে পুলিশ টানাহ্যাঁচড়া করছে–
মাইশোরের পুলিশ ওইরকমই করে। চন্দন কাঠ ডাকাতদের নিয়ে কী কাণ্ডটা চলছে দেখছেন তো–
ব্যাপারটা চন্দনকাঠ ঘটিতও হতে পারে। মৃগাঙ্কবাবু, কেস ইজ ইন্টারেস্টিং। এর মধ্যে রয়েছে একটি মেয়ে। বেজায় ধনবতী। পৃথিবীর একশো জন বড়লোকের মধ্যে না হলেও দুশো জনের মধ্যে পড়ে। ইন্দ্রনাথ রুদ্রর সাহায্য চাইছে সে।
