স্বর্ণ পিণ্ডের বিপুল স্তূপ নাকি আজও অভিশপ্ত। বাবার সিন্দুকে একটা চিঠিও পেল কমলিকা। মেয়েকে তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। জীবিতকালে সোনার আতার কথা ইচ্ছে করে বলেননি। কাঁচা বয়েসে লোভের বশে সর্বনাশ আসতে কতক্ষণ? সাবধান! সাবধান! সুদীর্ঘ দুটি শতাব্দী অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু কারা যেন এখনও আগলে রেখেছে স্বর্ণ ভাণ্ডারকে। গোরস্থান অত্যন্ত নিরাপদ বিবেচনা করেই গুপ্তধনকে গুপ্ত রাখা হয়েছিল সেখানে বিশেষ একটি স্মৃতিসৌধের তলায়। কিন্তু কে জানত কবরখানার অতৃপ্ত আত্মারাই পুঞ্জীভূত অশুভ শক্তি নিয়ে আগলে রাখবে রাজরক্তে রঞ্জিত স্বর্ণ ভাণ্ডারকে? কে জানে নিষ্ঠুরভাবে সবংশে নিহত সেই রাজন্যবর্গই যুগ-যুগ ধরে প্রহরা দিচ্ছে কিনা তাদের লুণ্ঠিত কোষাগারকে?
সঠিক কিছুই জানা যায়নি। শুধু জানা গেছে স্বর্ণলোভে উন্মাদ হয়ে যারাই হানা দিয়েছে প্রেতমহল্লায় তারাই মায়া কাটিয়েছে ইহলোকের রাত পোহাতে-না-পোহাতে। হিমকঠিন প্রাণহীন দেহ পাওয়া গিয়েছে কবরখানার জঙ্গলে।
যে দুজন পূর্বপুরুষ এইভাবে প্রাণ হারিয়েছেন তারা ভীতু ছিলেন না। তবুও বিষম ভয়ে দু-জনেরই মুখের চেহারা নাকি পালটে গিয়েছিল। সুতরাং কমলিকা যেন গোরস্থানের ত্রিসীমানাও না মাড়ায় এবং গুপ্তধনের হদিশ গল্পচ্ছলেও কারও কাছে না বলে। সম্পদ থেকেই বিপদ আসে। এবং গুপ্তধন যেন ব্যক্ত না হয়।
কন্যা-অন্ত পিতৃদেবের জ্ঞানগর্ভ পত্র পেয়ে চমকৃত হল কমলিকা। বিলেত ঘুরে এসেও এত কুসংস্কার? ভূতপ্রেত পিশাচ দানো তো মনের বিকার। মাইক্রোসকোপ দিয়ে যাদের দেখা যায় না, স্পেকট্রামে যাদের ঠিকানা থাকে না, ক্যামেরায় যাদের ছবি ওঠে না, তারা আবার আছে নাকি? কবরখানায় যাঁরা অক্কা পেয়েছেন তাঁরা ভয়ের চোটেই টিকিট কেটেছেন। নিশ্চয় হার্টের রোগ ছিল। আগাছায় পা বেঁধে গিয়ে অথবা শেয়ালের তাড়া খেয়ে অথবা পাচার ডানা ঝটপটানিতে অথবা বাদুরের ছায়াপাতে অথবা…ইত্যাদি ইত্যাদি।
পদস্খলন আগেই নিশ্চয় ঘটেছিল। এবার একটু ভালো করেই ঘটল। স্যাম্পেনের ঝেকে সরস আকারে কাহিনিটি পরিবেশন করা হল দুই বয়ফ্রেন্ডের কাছে। ব্যক্ত হল গুপ্তধন।
সাতদিনও গেল না।
ইন্দ্রনাথের মেসে দেখা গেল কমলিকাকে। বলল ত্ৰাস-বিস্ফারিত উদ্বেগ-থরথর চোখে– আমাকে বাঁচান। ওরা হয় নিজেরা মরবে নয় আমাকে মারবে।
কামপঙ্কে নিমজ্জিত কমলিকার কেচ্ছাকালো মুখের দিকেও তাকাতে পারছিল না ইন্দ্রনাথ। নখ খুঁটতে-খুঁটতে বলল, কেন?
গুপ্তধনের খবরটা যাতে আর না ছড়ায়। ভূপেশ আর মাইকেল দুজনেই পকেটে ছুরি নিয়ে ঘুরছে। দুজনেই দুজনকে মারতে চাইছে। তারপর নকশাটা ভোগা মেরে গুপ্তধনের মালিক হতে চাইছে।
নকশাটা কোথায়?
বলব কেন? এমন জায়গায় লুকিয়ে রেখেছি কেউ খুঁজে পাবে না। তাছাড়া সোনার আতার জন্যে তো আসিনি আপনার কাছে।
তবে কেন এসেছেন?
বাঁচতে।
.
কিন্তু বাঁচানো গেল না।
সেইদিনই রাত আটটায় পার্ক সার্কাসের পুরোনো কবরখানায় খতম হয়ে গেল ক্যাম মুক্স। নিভে গেল বংশের প্রদীপ। সম্পূর্ণ হল স্বর্ণপিণ্ডের অভিশাপ। কায়াহীনের মায়াঘেরা কাঞ্চন ভাণ্ডারের রক্ষক স্বয়ং রাজ্যক্ষ কি না তা নিয়ে কিন্তু মোটেই মাথা ঘামাল না ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর জয়ন্ত চৌধুরী।
টেলিফোন এল রাত দশটায়।
ইন্দ্রনাথ? আমি জয়ন্ত বলছি। ক্যাম-মুক্স খুন হয়েছে গোরস্থানের মধ্যে। ওর হ্যান্ডব্যাগে তোর নাম ঠিকানা লেখা একটা কাগজ পেলাম। তুই কিছু জানিস?
জানি। বলে মুখ কালো করে সব বলল ইন্দ্রনাথ। মুখ কালো হল তীব্র গ্লানিতে। মেয়েটা বাঁচতে এসেছিল। কিন্তু…
সব শুনে জয়ন্ত বললে, রাত সাড়ে সাতটার সময়ে লালবাজারে ফোন করে ভূপেশ বলল এইমাত্র নাকি ক্যাম মুক্সকে ছুরি মেরে পালিয়েছে মাইকেল। জিপ নিয়ে ছুটলাম তক্ষুনি। গাড়ি দাঁড়াতে না-দাঁড়াতেই পেট্রল পাম্পের দিক থেকে ছুটে এল ভূপেশ ছোকরা। বেলবটমের মতো লটপটে জিন আর গা কামড়ানো স্কিনি গেঞ্জি। লম্বা-লম্বা চুল আর চিনেম্যানের মতো ঝোলা গোঁফ। ভীষণ উত্তেজিত। সে নাকি গোরস্থানের নিরিবিলিতে বসে গল্প করছিল ক্যাম- মুক্সকে নিয়ে। প্রোগ্রাম ছিল এখান থেকেই সটান যাবে ইন অ্যান্ড আউটয়ের সাইকেডেলিক নাচের আসরে।
এমন সময়ে ঝোঁপের মধ্যে থেকে বিদ্যুৎবেগে বেরিয়ে এল একটা ছায়ামূর্তি। দমাস করে ক্যাম-মুক্স-এর বুকে ঘুসি মেরেই পালিয়ে গেল এঁকেবেঁকে। তারার আলোয় মুখের আদল আর ছোটার ধরন দেখেই মাইকেলকে চিনতে পেরেছিল ভূপেশ।
ঘুসি খেয়ে ছিটকে পড়েও কেন তেড়ে উঠছে না ক্যাম-মুক্স তা দেখবার জন্যে লাইটার জ্বালিয়েছিল ভূপেশ। বুকের বাঁ-দিকে ছুরির ফুটো আর ফিনকি রক্ত দেখেই সটান ছুটেছে পেট্রল পাম্প থেকে লালবাজারে ফোন করতে।
জিগ্যেস করেছিলাম, পার্ক স্ট্রিটের পুলিশ ঘাঁটি তো পাশেই ছিল। লালবাজারে ফোন করা হল কেন? সে বললে, দুদিন আগে ডিসি-ডিডি-র আবেদন পড়েছিল স্টেটসম্যানে–চুরি-ডাকাতি খুন-খারাপির খবরটা তাঁকে সোজা জানালে নাকি অপরাধীকে ঝটপট ধরা যায়।
মেয়েটাকে মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম। ভূপেশকে আরও জেরা করার জন্যে লালবাজারে নিয়ে এলাম। ঘরে ঢুকতেই একটা ছোকরা তেড়ে এসে গলা টিপে ধরল ভূপেশের। সেপাই এসে ছাড়াল। এই ছোকরাই মাইকেল। লালবাজারে এসেছে ভূপেশের কুকীর্তি ফাঁস করতে। পকেট থেকে এক জোড়া মিনার্ভার টিকিট বের করে দেখাল নাইট শোয়ের টিকিট। কথা ছিল ক্যাম-মুক্স সঙ্গে যাবে। তার আগে কবরখানার নিরিবিলিতে বসে একটু ইয়ে করেছিল। এমন সময় ঝোঁপের মধ্যে থেকে বিদ্যুৎ বেগে বেরিয়ে এল একটা ছায়ামূর্তি..
