শেষ দুটো শব্দের প্রশ্ন নিক্ষিপ্ত হল গরাদের ওদিকে ঘরের ভেতর। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন হিতোহিশো, নেভার। আই উইল নট সাইন।
সুজন দেশাই অদ্ভুত চোখে শুধু তাকিয়ে রইলেন। তার গলা দিয়ে এখন ঘড়ঘড় আওয়াজ বেরচ্ছে, ঠান্ডায় জমে যাবেন মনে হচ্ছে।
কসাই, দাঁতে দাঁত পিষে বললে ইন্দ্রনাথ, কে বলুন তো? এবারের প্রশ্ন রাম ঘোষের দিকে। তিনি কোনও জবাব দিলেন না।
বিদ্রোহী বললে, এঁর নাম কী?
যে নামটা আপনার সুন্দরী বউয়ের মুখে শুনে এসেছেন। ইন্দ্রনাথের জবাব।
এবার আর কথা বলল না বিদ্রোহী। শুধু বেরিয়ে পড়ল দাঁতের সারি। নড়ল না ঠোঁট অধর। পার্চমেন্ট মুখের একটা পেশিও কাঁপল না। দুই অঙ্গার চক্ষুতে শুধু জাগ্রত হল পাশবিক চাহনি।
মধুক্ষরা হাসি হেসে ইন্দ্রনাথ বললে, নো, বিদ্রোহী নো, নো মোর মার্ডার। রাম ঘোষকে জ্যান্ত দরকার ইন্ডিয়ার সেকেন্ড গ্রেটেস্ট শেয়ার কেলেঙ্কারি ফাঁস করার জন্য। প্রথমটার নাম আবাল বৃদ্ধ-বনিতা জানে। সেই ঘটনাই প্রেরণা জুগিয়েছে শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত রাম ঘোষকে। চমৎকার পরিকল্পনা। একটাই ভুল করে ফেলেছিল ওঁর সাগরেদরা। টাকার লোভে শুকতারাকে এখানে এনে, আর তার স্বামীকে পোর্টব্লেয়ারে জ্যান্ত পৌঁছে দিয়ে। এটা ঘটেছে ওঁর পারমিশান না নিয়ে, নইলে ফুলপ্রুফ ছিল ওঁর প্ল্যান। নিজের শেয়ার বিক্রি করতেন না। সব শেয়ার নিজেই কিনে নিতেন, এক হাজার কোটি টাকার ক্যাশ রিজার্ভ এসে যেত নিজের কন্ট্রোলে। দুই ডিরেক্টরের যাতে সন্দেহ না হয়, তাই আগেই কিডন্যাপ হয়েছিলেন নিজে। সাজানো কিডন্যাপিং। তারপরেই সত্যিকারের কিডন্যাপিং হল পরপর দুবার। বলে একটু থামল ইন্দ্রনাথ। বললে স্বগতোক্তির সুরে, পরপর দুবার। পরক্ষণেই রাম ঘোষকে উদ্দেশ করে, সেগুলো তো ঘটেছে পরপর দুটো সপ্তাহে। কিন্তু তার আগের সপ্তাহে ডগলাস প্লেন একই প্যাসেঞ্জার নিয়ে কেন রওনা হয়েছিল পোর্টব্লেয়ারের দিকে? ও হো-হো, উকিলকে সামনে না রেখে আপনি কথাই বলবেন না ঠিক করেছেন। তাহলে আমি বলে দিচ্ছি– ট্রায়াল দিচ্ছিলেন। ব্যস, আর কথা নয়। চম্পক, কাকোই, চাবি ভোলা হোক এই দরজার। কিন্তু শ্রীল শ্রীযুক্ত পরম পূজনীয় রাম ঘোষ নজর ছাড়া না হন। চলুন মশায় বিদ্রোহী বর্মন। আপনার সুন্দরী শুকতারাকে আশীর্বাদ করে আসি। আশীর্বাদই তো করব? আপনি তো আমার হাঁটুর বয়সি। সেইসঙ্গে দেখব, তার মনের কথা আমি পড়তে পারি কিনা।
মোল্লার দৌড় যেমন মসজিদ পর্যন্ত, ইন্দ্রনাথের দৌড়ও যে তার বেশি নয়, তা সেই রাত্রেই প্রমাণিত হয়ে গেছিল। অবলা মেয়েদের মনের কথা জানতে পারা কি চাট্টিখানি কথা?
* স্বস্তিকা পত্রিকায় প্রকাশিত। পূজাসংখ্যা, ১৪০২।
সোনার আতা
কে জানত সোনার আতা সত্যিই অভিশপ্ত? কে জানত স্বয়ং যক্ষ এর রক্ষক? কে জানত গোরস্থানেও গুপ্তধন থাকে?
এ-কাহিনি ইন্দ্রনাথের হেরে যাওয়ার কাহিনি–কিন্তু রোমাঞ্চকর। তাই শোনাই।
ক্যাম-মুক্স-এর আসল নাম কমলিকা মুখার্জি। বাবা বিলেত ঘুরে এসেও লুঙ্গি পরতেন। কিন্তু মা বিলেত ফেরত স্বামীর প্রেস্টিজ বজায় রাখলেন। মেয়েকে কনভেন্টে ঢোকালেন। ভাটিয়া-পাঞ্জাবি মাদ্রাজিদের সঙ্গে এলিমেন্টারি বাংলা পড়ালেন। নামটাকে পর্যন্ত পালটে দিলেন।
কমলিকার আড্ডাখানা পার্ক স্ট্রিটে। সেখানকার নাচের আড্ডায়, মদের আড্ডায়, কালচারাল আড্ডায় সে একটি সুপরিচিত ভোমরা। তার সম্পূর্ণ নগ্ন পিঠ এবং প্রায় নগ্ন বক্ষদেশের বিজ্ঞাপনের সঙ্গে পরিচিত সকলেই। চকচকে রঙচঙে তেলতেলে মুখ, এলোমেলো আছাঁটা চুল, ইট-রঙিন রাক্ষুসি নখ এবং নিতম্ব কামড়ানো স্ন্যাকস পরা নাগর জোটানো ক্যাম মুক্সকে চেনে না এমন উজবুক ও পাড়ায় নেই। খোকা-খোকা ক্লাউন সদৃশ নব্যযুবক থেকে আরম্ভ করে হোটেল-বারের বেয়ারা বাবুর্চি পর্যন্ত সবাইকেই সে ধন্য করেছে তার মদির কটাক্ষ আর বিলোল হাসির প্রসাদ দিয়ে। চুম্বনের স্বর্গে পর্যন্ত টেনে তুলেছে কয়েকজন ভাগ্যবানকে–আরও অধঃপতন ঘটেছে কি না জানা নেই।
এমন সময়ে কমলিকা হারাল তার বাবা এবং মাকে একই দিনে সাংঘাতিক মোটর দুর্ঘটনায়। চোখের জল শুকিয়ে যাওয়ার পর খুলল বাবার সিন্দুক। পেল অনেক কিছু। সেই সঙ্গে একটা সোনার আতা আর একটা তাম্রপত্র।
চক্ষুস্থির হল ম্যাড়মেড়ে তাম্রফলককে চকচকে করতেই। খুদে-খুদে ইংরেজি হরফে উত্তীর্ণ একটা উদ্ভট ইতিহাস। আর একটা গুপ্তধনের নকশা। বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির বাজারে তার পরিমাণ প্রায় তিরিশ কোটি টাকা।
সিপাই বিদ্রোহের সময়ে সর্বনাশ করা হয়েছিল এক নেটিভ রাজার। লুষ্ঠিত হয়েছিল তাঁর কুবের সম্পদে ঠাসা কোষাগার। সোনার আতা বোঝাই একটা মস্ত সিন্দুক ছিল ধনরত্নের মধ্যে। বিদ্রোহ থেমে গেলে কলকাতায় বদলি হল ব্রিটিশ অফিসারটি। সঙ্গে এল সোনার আতা। পুঁতে রাখা হল পার্ক স্ট্রিটের পুরোনো কবরখানায় একটি কবরের তলায়।
বংশ পরম্পরায় হাত বদল হয়েছে নকশা আঁকা এই তাম্রফলক। এখন পৌঁছল কমলিকার হাতে। কমলিকার মায়ের পূর্ব-পুরুষই সেই নৃশংস ইংরেজ সেনাপতি। তৈমুর লং নাদির শাকেও সে লজ্জা দিয়েছিল সোনার আতা লুঠ করার সময়ে। শেষকালে অবশ্য ধর্মে মতি হয়েছিল এক হিন্দু বিধবাকে বিয়ে করার পর।
