কেরামতি দেখিয়েছে বটে চম্পক সাহা। খর্বকায় কাকোই-এর কষ্ট দেখে তাকে তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল নিজের তালঢ্যাঙা শরীরের মাথার ওপর। নোঙর আঁকড়ে কাকোই যখন ঝুলছে, তখন তার পা ধরে উঠে এসে নোঙর ধরেছে চম্পকও।
পায়ের মালিকেরা এখন অনেকে। মোট পাঁচজন।
তক্তা বেয়ে উঠতে-উঠতে একজন বললে, বুড়োর জ্ঞান ফিরেছে। এবার টিকটিকিটাকে চাবকাব। এল কী করে এখানে?
দ্বিতীয় জন তক্তায় পা দিয়ে বললে, কিন্তু বোটের লোকেরা গেল কোথায়?
তৃতীয় জন বলে উঠল, জনসাহেব কিন্তু একটু আগেই এসেছেন। কোথায় উনি?
চতুর্থ জন বললে, দাঁড়াও?
আর দাঁড়াও। পাঁচজনকে পাঁচ রকমভাবে টার্গেটের মধ্যে পেয়ে আর কি রোখা যায় কাকোই-কে?
ইন্দ্রনাথের অগোচরে অদ্ভুত একটা যন্ত্র এনে ফেলেছিল হাতের মুঠোয়। স্প্রিং পিস্তল।
পরপর পাঁচজনকে তাগ করে চাপ দিয়ে গেল স্প্রিং-এ। নিঃশব্দে ধেয়ে গেল পাঁচটা ছুঁচ। তিনজন রইল পাথুরে দেওয়ালের সামনে, পাথুরে আলসেতে।
শক্ত গলায় বললে ইন্দ্রনাথ, ফের খুন?
নইলে এরা আমাদেরই খুন করত। নিরুত্তাপ গলায় জবাব দিল কাকোই।
জিনিসটা কী? এই প্রথম অবাক হতে দেখা গেল বিদ্রোহীকে।
সারিন, বললে কাকোই, পটাসিয়াম সায়ানাইডের চাইতে বিশগুণ পাওয়ারফুল। জাপানে নিরীহ লোক মারা হয়েছে এই দিয়ে। আমি ট্রায়াল নিলাম কুলোকের ওপর। সাকসেসফুল।
সারিন বিষে ডোবানো ছুঁচের এত শক্তি? ইন্দ্রনাথ যখন ওর বিস্ময় নিয়ে ব্যস্ত, বিদ্রোহী তখন ছিটকে গেছে তক্তার দিকে।
.
মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত
আলোকিত আলসেতে দাঁড়াতেই দেখা গেছিল পাথরের সিঁড়িটা। পাহাড়ের গায়ে গুহার পাথর কেটে তৈরি সিঁড়ি। একটু উঠেই একটা চাতাল। এখান থেকে দুদিকে উঠেছে সিঁড়ি।
কোনদিকে যাওয়া যায়?
দুভাগ হয়ে গেল চারজনের দল। ইন্দ্রনাথ আর চম্পক একদিকে। কাকোই আর বিদ্রোহী আর একদিকে।
প্রথম দল পনেরো ধাপ ভেঙেই পেল আর একটা চাতাল। চাতালের একদিকে তালা দেওয়া লোহার ফটক। তার ওপাশে কয়েদ ঘরে আলো জ্বলছে। অনেক উঁচুতে গরাদ দেওয়া একটাই জানলা। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে মেঝেতে বসে রয়েছে বিধ্বস্ত চেহারার তিন পুরুষ। একজন বৃদ্ধ। তার পোশাক জলে ভিজে গায়ে লেপটে রয়েছে। দ্বিতীয়জন প্রৌঢ়। মুখ মঙ্গোলীয় ধাঁচের। তৃতীয় বয়স্ক ব্যক্তি নিঃসন্দেহে বাঙালি–পরনে ধুতি আর পাঞ্জাবি।
তৃতীয় ব্যক্তির দিকে চেয়ে লোহার ফটকের এদিক থেকে বললে ইন্দ্রনাথ, আপনি রাম ঘোষ। আপনার পাশে নিশ্চয় হিতোহিশো। ভিজে পোশাকে এখুনি অসুস্থ হবেন সুজন দেশাই। ইনসুলিন এসে গেছে–দরকার কার?
সটান হয়ে বসেছিলেন তিনজনই। মঙ্গোলীয় মুখের অধিকারী হিতোহিশো বললেন, আমার ব্লাডসুগার নরম্যাল। ইনসুলিন নিয়ে কী করব?
জড়িত গলায় ভিজে পোশাকে সুজন দেশাই বললেন, এটা কি রসিকতার সময়। রাম ঘোষ কিছু বললেন না।
ইন্দ্রনাথ তাঁর দিকে চেয়ে শুধু হাসল। পাশ ফিরে বললে চম্পককে, হাঁ করে দেখছ কী? সিঁড়ি তো উঠে গেছে আরও ওপরে, যাও ওঠ।
গিয়ে? কাঠকাঠ গলায় বললে চম্পক।
তালা ঝুলছে, চাবি আনতে হবে না? খবরদার খুন-টুন আর নয়।
খুন। কয়েদ ঘরের ভেতর থেকে বলে উঠলেন রাম ঘোষ ভরাট গম্ভীর গলায়, কে খুন হল?
আপনি চেনেন নাকি সবাইকে? ইন্দ্রনাথের প্রশ্ন।
আমি জানতে চাইছি কে খুন হল?
বলুন কজন খুন হল।
হোয়াট?
মোট আটজন। তার মধ্যে দুজন মোটরবোট চালিয়ে এনেছিল।
বাকি ছজন তো এখানকার লোক।
ছজনের গ্যাং?
ও ইয়েস।
যাচ্ছলে। চাবি কোথায় আছে কে বলবে? আপনাদের বের করব কী করে?
চাবি থাকে জনসাহেবের কাছে। কোমরের বেল্টে৷
মুশকিলে ফেললেন। দুজন তো পড়েছে জলে, এদের মধ্যে জনসাহেব যদি থাকে…
নেই, সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসতে-আসতে বললে বিদ্রোহী। তার পার্চমেন্ট মুখ দেখে কিছু বোঝা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু কালো চোখে ভাসছে হাসি।
সেই চোখে চোখ রেখে বললে ইন্দ্রনাথ, আসা হচ্ছে কোথা থেকে?
শুকতারার ঘর থেকে।
হয়েছে প্রেমালাপ?
মাঝে গরাদ থাকলে ওটা কি হয়?
বটে, বটে। কিন্তু চাবি তো জনসাহেবের কাছে। সে ভদ্রলোক তো পরলোকে। বডিটা কোথায়?
জনসাহেব? বোটে উঠেছিল প্রথমে? তা হলে বোটেই আছে।
চম্পকের দিকে মুখ ফেরাতেই সে হনহন করে নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে।
চাবি নিয়ে একসঙ্গে তিনটে ধাপ টপকে ফিরে এল একটু পরেই। বললে, আগে খুলব কোন দরজা?
জবাব দিল বিদ্রোহী, আগে এই দরজা?
সেকি। আগে তো বউ, মিটিমিটি হেসে বললে ইন্দ্রনাথ।
আগে রহস্যের সমাধান।
সেটা কি এই ঘরের মধ্যে।
আমার তাই মনে হয়। আপনি কি অন্তর্যামী?
আমি নয়-শুকতারা।
তিনি জানেন, রহস্যের সমাধান রয়েছে এই ঘরে?
হ্যাঁ।
কী করে জানলেন?
আপনার মন পড়ে।
আ-আমার মন পড়ে? জীবনে বুঝি এই প্রথম তোতলা হয়ে যায় ইন্দ্রনাথ।
আপনার চিন্তার তীব্রতা যে বড় বেশি, ইন্দ্রনাথবাবু। রয়েছেনও শুকতারার খুব কাছে। তাই আমাকে বললে, তুমি যাঁদের সঙ্গে এসেছ, তাদের একজন খালি একটা নাম মনে-মনে জপে যাচ্ছেন। তিনি নাকি পালের গোদার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন।
পালের গোদাই বটে। ইন্ডো-নিপ্পন কোম্পানির শেয়ার যাঁদের কাছে সবচেয়ে বেশি, তাঁদের সবার কাছ থেকেই কোম্পানি শেয়ার কিনে নিচ্ছে। কিন্তু এই তিন ডিরেক্টরের শেয়ার সংখ্যা জুড়লে সবচেয়ে বেশি হয়। তাই এই তিন ডিরেক্টরকে আনা হয়েছে এখানে জোর করে সই করিয়ে নেওয়ার জন্য। ঠিক কিনা?
