ঠিক এই সময় পায়ের শব্দ শোনা গেল। কেবিনের দুপাশ দিয়ে দুজন এগিয়ে আসছে পেছনের ডেকে।
জ্বলন্ত-চক্ষু মানুষটা নিমেষমধ্যে হিসেব করে নিল, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে রেলিং কতদূর।
রেলিং পর্যন্ত দৌড়ে গিয়ে জলে ঠিকরে যাওয়ার আগেই পদশব্দের অধিকারী দুজন বেরিয়ে আসবে কেবিনের দু-পাশ থেকে। অতএব…
চোখের পলক ফেলবার আগেই ডেকের ওপর বসে পড়ে, দু-পা সামনে ছড়িয়ে দিয়ে, দুই পায়ের প্যান্টের পা টেনে তুলে, দুটো খাপ থেকে বের করল দুটি মারণাস্ত্র।
হাতলবিহীন ছোরা আর সাইলেন্সার লাগানো রিভলভার। বাঁ-হাতের রিভলভার সমেত হাতটা সটান বাড়িয়ে ধরল সামনে। ডান হাতটা কনুইয়ের কাছে বেঁকিয়ে ছোরাটাকে রাখল কানের কাছে। কেবিনের দুপাশ থেকে বেরিয়ে এসেছে পদশব্দের দুই মালিক। এদের একজন কুখ্যাত হাফিজজি, অপরজন তার স্যাঙাৎ। ধরাধামে তাদের আয়ু ছিল ওই পর্যন্তই।
বাঁ-হাতের রিভলভারে আওয়াজ হল খট, ডান হাতের কনুই হয়ে গেল সোজা–ছোরা আর নেই দু-আঙুলের ফাঁকে।
বিঁধেছে হাফিজজির বুকে।
বুলেট উড়িয়ে দিয়েছে তার স্যাঙাতের খুলি।
নিঃশব্দে দুটি মূর্তি আস্তে-আস্তে লুটিয়ে পড়ল ডেকের ওপর।
উঠে গেল বিদ্রোহী বর্মন। ছোরাটা বুক থেকে টেনে নিয়ে জল চামড়ার খাপে। রিভলভার গেল যথাস্থানে। এখনও তিনটে বুলেট রয়েছে সেখানে। কাজ এখনও বাকি।
যেন পিছলে গেল ডেকের ওপর দিয়ে। রেলিং টপকে জলে পড়তেই দু-পাশ থেকে দুটো হাত পড়ল তার কাঁধে।
.
ছুঁচ
জল এখানে মোটে পাঁচফুট গভীর। আপনার হাইট পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি। অতএব দাঁড়িয়ে থাকুন।
কথাগুলো বলা হল কানের কাছে। বক্তার গলা চেনা। চম্পক সাহা।
দাঁড়িয়েই আছি। জবাব দিল বিদ্রোহী, এ পাশে নিশ্চয় কাকোই?
হ্যাঁ জবাবটা কাকোই-এর, আমার হাইট মোটে পাঁচ ফুট। আঙুলের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। আকাশের দিকে মুখ করে আছি। কষ্ট হচ্ছে। ইন্দ্রনাথ রুদ্র ধরা পড়ল মনে হচ্ছে?
উনি ছাড়া গভীর জলে বোটে উঠবে কে? আকাশ থেকে উনিই তো ঝাঁপ দিয়েছিলেন। বাহাদুর বটে। আন্ডারক্যারেজের নকশা আঁকিয়েছিলেন আমাকে দিয়ে। কেন জানি না। গলাটা চম্পক সাহার।
আস্তে। সামনে তাকান। বিদ্রোহীর গলায় চাপা রণদামামা।
বোটের পাশ দিয়ে দেখা যাচ্ছিল অন্ধকারে ঢাকা পাথুরে দেওয়াল। আচমকা সেখানে একটা বাতি দেখা গেল। পাথরের গায়ে একটা ফোকর আবিভূর্ত হয়েছে। কপাট সাইজের খানিকটা পাথর সরে গেছে। সেখান দিয়ে আলো পড়েছে জলে।
একটা লম্বা তক্তা বেরিয়ে এল ফোকর দিয়ে। পড়ল বোটের ডেকে। একটা শিথিল দেহ মানুষকে ধরাধরি করে নামিয়ে নেওয়া হল তক্তার ওপর দিয়ে। ফিরে এল একজন। মোটর বোটের ডেকে উঠে এল পাটাতন বেয়ে। হেঁকে বলল, হাফিজজি।
আবার ক্ষিপ্রগতির পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে দিল বিদ্রোহী বর্মন। বিদ্যুৎ গতিতে দু-পাশের দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে গোটা শরীরটাকে তুলে নিল জল থেকে। দাঁড়িয়ে পড়ল দু-জনের কাঁধে পা রেখে। নোঙর ঝুলছিল মাথার ওপর। দু-হাতে সেটা খামচে ধরে শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে রেলিং টপকে গিয়ে পড়ল ডেকের ওপর।
হেঁট হয়েই পায়ের চামড়ার খাপ থেকে টেনে নিল মারাত্মক হাতিয়ার–দু-দিক ধারাল হাতলবিহীন ছুরিকা।
হাফিজজি সাড়া না দেওয়ায় পদশব্দ যখন এগিয়ে আসছে কেবিনের দিকে, চিতাবাঘের মতন পা টিপে টিপে তখন পদশব্দ লক্ষ করেই এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ-বাঘ বিদ্রোহী বর্মন। অপরিসীম নিষ্ঠুরতায় তুহিন কঠিন হয়ে উঠেছে দুই চক্ষু। শীতল বরফের মধ্যে ধকধকে আগুন যদি কেউ কল্পনাও না করতে পারে, তাহলে সে এখন দেখে নিতে পারে সেই দৃশ্য–বিদ্রোহীর দুই চোখ।
কেবিনের পাশ দিয়ে পায়ের আওয়াজ এগিয়ে এসেই থমকে গেল, পায়ের কাছে লুণ্ঠিত মৃতদেহ নিশ্চয় দেখেছে।
দেখেছে বিদ্রোহীকেও। মুখোমুখি। কিন্তু আর সময় পেল না বাকযন্ত্রকে চালু করার।
তার আগেই হাতটা সটান বাড়িয়ে দিয়ে তার টুটি কেটে দু-টুকরো করে দিল বিদ্রোহী।
আর ঠিক এই মুহূর্তে আকাশের চাঁদের জন্যও আর অপেক্ষা করল না শুকতারার কণ্ঠস্বর। ধ্বনিত হল বিদ্রোহীর ব্রেনের মধ্যে, বিদ্রোহী…বিদ্রোহী…তুমি কোথায়?
নিমেষে স্থাণু হয়ে গেল শ্রোতা।
সামনের ডেকে নড়ে উঠল লুণ্ঠিত মানুষটা। ইন্দ্রনাথ রুদ্র। আচমকা আঘাতে আচ্ছন্ন ব্রেন এতক্ষণে ক্লিয়ার হয়ে এসেছে। হাফিজজিকে ডাকা সে শুনেছে, পায়ের আওয়াজকে এগিয়ে যেতেও শুনেছে, ধপ করে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার আওয়াজও শুনেছে।
তারপর থমথমে নৈঃশব্দ্য।
অতএব সঞ্চরমান হল তার দেহসর্পিল ভঙ্গিমায়। কেবিনের পাশে গিয়ে দেখল পরপর দুটো মৃতদেহ। ওপাশে আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে একটা ছায়া মূর্তি। অন্ধকারে আদল দেখেও বোঝা যাচ্ছে সে কে।
নরম গলায় বললে ইন্দ্রনাথ, বিদ্রোহী, কী বলছে শুকতারা?
পাথুরে দেওয়ালের খুপরিতে ফিরে আসছে পায়ের আওয়াজ। এবার অনেকে। নিমেষে বিদ্রোহীকে ঝাঁকুনি দিয়ে ঘোর কাটিয়ে দিল ইন্দ্রনাথ। পলক ফেলবার আগেই বিদ্রোহীর দু-হাতে উঠে এল দুই মারণাস্ত্র। ইন্দ্রনাথের হাতে তার প্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র।
আর মার্ডার নয়, কড়া গলায় ফিসফিসিয়ে গেল ইন্দ্রনাথ, চম্পক আর কাকোই কোথায়?
এসে গেছি। পেছনে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় বললে কাকোই, নাউ অ্যাকশন, টুগেদার।
