ডলফিন?
একটা মোটরবোট। গত তিন সপ্তাহে তিনবার গভীর রাতে গভীর জলে গেছে।
গত তিন সপ্তাহে তিনবার–গভীর রাতে?
মাছ ধরতে নয়, তাহলে মাঝিমাল্লা থাকত। ডেকে থাকে শুধু দুজন। মালিক আর একজন। যাওয়ার আগে এখান থেকে মদের মোতল নিয়ে যায়, দামে সস্তা বলে। কোথায় যায় অত রাতে
তা কখনও বলেনি হাফিজজি।
হাফিজজি কে?
বোটের মালিক। লোকটার কথাবার্তা আর চোখ দেখে খটকা লেগেছিল মুদির দোকানির, কিন্তু বেশি জানতে চায়নি। প্রাণের ভয় তো আছে। করেকন্মে খাচ্ছে খাক। আমার মনে হয়, হাফিজজির বোট ওইখানেই যায়, যে দ্বীপে আপনি যেতে চাইছেন।
আন্দাজি কথা।
আমি যে দ্বীপটাতে আপনাকে নিয়ে যাচ্ছিলাম, গভীর রাতে ওই দ্বীপের দিক থেকেই হাফিজজির মোটর বোটকে ফিরতে দেখা গেছে। দূর দিয়েই পোর্টব্লেয়ার চলে গেছে। তবে আওয়াজ শুনে মুদির দোকানি ঠিক চিনতে পেরেছে। এখান থেকে যাওয়ার সময় গভীর সমুদ্রের দিকে যায়, ফেরে ওই দ্বীপ হয়ে। কেন, সেটা একটা রহস্য।
তোমার প্ল্যানটা কী?
জঙ্গলে লুকিয়ে থাকুন। ডলফিন যখন আসবে, সাঁতরে পেছন দিয়ে উঠে পড়বেন। মাছ। রাখার অনেক খালি পেটি থাকে। একটায় লুকিয়ে থাকবেন। যেখানে যেতে চান, পৌঁছে যাবেন। তারপর যদি আয়ু থাকে, ওই বোটেই ফিরে যাবেন পোর্টব্লেয়ার।
আমার আয়ু? হাসল বিদ্রোহী। অধর আর ওষ্ঠ নড়ল না।
ভেতর পর্যন্ত কেঁপে উঠল আসগরের। এ যে জীবন্ত বিভীষিকা।
.
বিদ্রোহীর রণমূর্তি
গুটিসুটি মেরে খুবই অল্প জায়গায় নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছিল ইন্দ্রনাথ। কালো আকাশ, কালো জল, ডেকের অন্ধকার, পরনের শার্ট প্যান্টও ডিপ ব্লু। সুতরাং আঁধার তাকে গ্রাস করেছে।
বোটটা লম্বায় তিরিশ ফুট। সামনের উঁচু ডেক জুড়ে রয়েছে আট ফুট। সরু কেবিনটা নিয়েছে পনেরো ফুট জায়গা। তারপরেই পেছন দিক, ভোলা ককপিট।
কেবিনের দু-ফুট নীচে রয়েছে সামনের ডেক। কেবিনের জানলা রয়েছে এইদিকেই। ককপিটে দাঁড়িয়ে যে দুজন মোটরবোট চালাচ্ছে, তাদের দেখতে হচ্ছে কেবিনের কাঁচের জানলা দিয়ে। যেখানে ঘাপটি মেরে রয়েছে ইন্দ্রনাথ সেখান থেকে জায়গাটা খুব কাছে। ককপিটের কেউ যদি বিড়ি ধরায় আলোর আভায় দেখা যাবে ইন্দ্রনাথকে। তবে বিড়ি ধরানোর চেষ্টা কেউ করছে না। মুখে চাবি দিয়ে বোটটাকে ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঘণ্টায় তিরিশ মাইল বেগে। গন্তব্যস্থান বেশি দুর আর নেই।
রেলিং এর ধারে বসে ইন্দ্রনাথ দেখল, অন্ধকার ডাঙা দেখা যাচ্ছে সামনে। রহস্যাবৃত সেই দ্বীপ এসে গেছে। প্লেন থেকে যেখানে প্যারাসুট নামানো হয়েছে, সেখান থেকে বেশি দূরে নয়, আধ মাইলের মধ্যেই। সময়জ্ঞান খুব প্রখর বটে প্লেন চালকের।
মোটর-গজন কমে গেছে। গতি মন্থর হচ্ছে। সামনে খাড়াই পাথর ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না। দ্বীপের এদিকটা যেন ছুরি দিয়ে কেক কাটার মতন কাটা হয়েছে।
বোট আস্তে-আস্তে যাছে খাড়াই দেওয়ালের পাশ দিয়ে। ফঁক ফোকর তো কোথাও নেই। তবুও যাচ্ছে। গোপন গহ্বরের সন্ধানে নাকি?
আচমকা চোখ ধাঁধানো আলো জ্বলে উঠল খাড়াই পাথরের শীর্ষদেশে। সার্চলাইট। সোজা এসে পড়েছে মোটরবোটের ডেকে।
সঙ্গে সঙ্গে হুঙ্কার ভেসে আসে ওপর থেকে, ডেকে ও কে?
চকিতে ডিগবাজি খেয়ে রেলিং টপকে টুপ করে জলে পড়েই তলিয়ে গেল ইন্দ্রনাথ। কিন্তু পার পেল না।
ককপিট থেকে দু-জনেই লাফ দিয়ে নেমে এসেছিল ওপর থেকে হুঙ্কারের সঙ্গে-সঙ্গে। দু জনেই তুলে নিয়েছিল দুটো বোটহুক। লম্বা লগার মাথায় লাগানো। ইন্দ্রনাথ জলে পড়তেই একটা বোটহুক ওর পেছন-পেছন এসে গেছিল জলের মধ্যে।
জল এখানে মাত্র ফুট পাঁচেক গভীর। ঘোলাটে। ডুব সাঁতার কাটা সম্ভব নয়। সে সময়ও পায়নি ইন্দ্রনাথ।
একটা বোটহুক আঁকড়ে ধরল কোমরের বেল্ট। টেনে তুলল জল থেকে বাইরে। আর একটা বোটহুক পাশ থেকে ঘা মারল মাথায়।
মাথা ঘুরে গেল ইন্দ্রনাথের। কিন্তু পুরো সম্বিৎ হারাল না। অবশ হয়ে রইল গোটা দেহ। ওই অবস্থাতেই শুনল ওপরের আর নীচের কথোপকথন।
বোটে উঠল কী করে?
তাই তো ভাবছি।
প্যারাসুট পড়বার সময় আশেপাশে মোটরবোট ছিল?
একেবারেই না।
তবে কি আকাশ থেকে খসে পড়ল?
কী করে জানব?
চোপরাও। বস যখন শুনবে, কাউকে আস্ত রাখবে না। ঠিক এই সময় জল ফুঁড়ে উঠে বসল তোমার বোটে?
চোখ রাঙাবেন না। প্যারাসুটের লোকটাকে নামিয়ে নিন, আমার কাজ শেষ।
খুব যে গরম দেখছি। একাই উঠেছে না আরও কেউ?
খুঁজে দেখতে হবে। ইনসুলিন এনেছ?
সেটা কী?
যে বডিটা জল থেকে তুলেছ, তার গায়ে একটা প্যাকেট বাঁধা আছে?
পেটের কাছে প্লাস্টিক মোড়া একটা প্যাকেট আছে।
ওইটাই ইনসুলিন। বডি আমরা নামাচ্ছি। তোমরা বোট খুঁজে দেখো, আর কেউ আছে কিনা।
ওপরের আর নীচের কথোপকথনের শুরুতেই মোটর বোটের পেছনের ডেকে রাখা দুটো পিপের ওপর থেকে সরতে শুরু করেছিল আলগা কাঠের ঢাকনা দুটো। ফঁক দিয়ে উঁকি মেরেছিল একজোড়া করে চোখ। সার্চলাইটের আলো আর মোটরবোটের ওপর পড়ছে না দেখে আস্তে-আস্তে আরও ওপরে উঠল ঢাকনা দুটো। মার্জার লম্ফনে বেরিয়ে এল দুটি ছায়ামূর্তি। সাপের মতন বুকে হেঁটে গেল ডেকের ওপর দিয়ে। রেলিং টপকে পা ঝুলিয়ে নেমে গেল জলে।
একইসঙ্গে নড়ে উঠল একটা প্যাকিং কেস। বিরাট সাইজ। পাঁচ ফুট বাই তিনফুট। ডেকের পাটাতন ছেড়ে উঠল সামান্য। বাক্সের অন্ধকারে যেন দু-টুকরো আগুন জ্বলছে। আশেপাশে কেউ নেই দেখে মাথার ওপর তুলে ফেলল গোটা প্যাকিং কেসটা। রাখল পাশের আরও প্যাকিং কেসের গাদায়।
