এইভাবেই তেড়চা হয়ে কিছুক্ষণ ঝুলে রইল ইন্দ্রনাথ। টনটনিয়ে উঠল মাসল। কিন্তু কেটে গেল গা-পাক দেওয়া ভাবটা। ঘরে বসে প্ল্যান করা এক জিনিস, আর তার রূপায়ণ আর এক জিনিস। দুটোতেই দরকার ঠান্ডা মাথার। ইন্দ্রনাথের তা আছে।
এবার একহাতে শরীর ঝুলিয়ে রেখে আর এক হাতে খুলে ফেলল গায়ের কোট, টেনে ছিঁড়ে আনল পিঠের প্যাড। হাত বদল করে শরীর ঝুলিয়ে রেখে অপর হাত দিয়ে কোট গলিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল নীচে।
এখন তার পিঠে দেখা যাচ্ছে একটা কমপ্যাক্ট প্যারাসুট। প্যাড সেঁটে এই জিনিসটাকেই কুঁজের আকার দেওয়া হয়েছিল। কুঁজ ছিল তার ছদ্মবেশ।
ট্র্যাপরে ফের খোলা হচ্ছে দেখেই প্লেনের তলপেটে নিজেকে সাঁটিয়ে নিয়েছিল ইন্দ্রনাথ। ওই পজিশনে থাকলে প্লেনের ভেতর থেকে তাকে দেখা যাবে না। ও কিন্তু দেখতে পাবে আবার কি গড়িয়ে নামছে প্লেন থেকে।
অচিরেই দেখা গেল তাকে।
হাত-পা বাঁধা একটা নরদেহ।
নীচে ঠিকরে গেল দেহটা। সাদা মেঘের মতন খুলে গেল প্যারাসুট, হ্রাস পেল পতনবেগ। নিমেষে শূন্যে ঝাঁপ দিল ইন্দ্রনাথ–সাদা মেঘের পেছনে।
বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছিল কপালে। মৃত্যু সামনে কিছু করার নেই।
খুলে গেছে প্যারাসুট। কালো রঙের। দুলছে ইন্দ্রনাথ। কালো রং মিশে গেছে আকাশের কালো রঙের সঙ্গে। ভাগ্যিস এখনও চঁদ ওঠেনি। আকাশে মেঘ থাকায় তারা দেখাও যাচ্ছে না। দেখা দিলে বিপদ বাড়ত। নীচের লোক দেখত বেশ কিছু তারা ঢাকা পড়ে গেছে একটা ধ্যাবড়া কালো জিনিসে।
প্যারাসুট বাতাসে ভেসে নামে বটে, কিন্তু নামে খুব জোরেই। একটু পরেই সাদা প্যারাসুট আছড়ে পড়ল জলে। কাঁধের কর্ক লাইফ বেল্ট ভাসিয়ে রাখল বৃদ্ধকে।
পা নীচের দিকে নামিয়ে সেকেন্ড কয়েক পরেই জলে আছড়ে পড়ল ইন্দ্রনাথ। শরীরটাকে দুমড়ে মুচড়ে বের করে আনল প্যারাসুটের দড়িদড়ার জঙ্গল থেকে।
শোনা যাচ্ছে মোটরবোটের ভটভট আওয়াজ। দ্রুত এগিয়ে আসছে এই দিকেই।
ওই তো প্যারাসুট, সাদা জায়গাটা–বোট থেকে ধ্বনিত হল, পুরুষ কণ্ঠস্বর, ঝটপট…জ্যান্ত তুলতে হবে জল থেকে।
আবলুষ কালো জলে নিঃশব্দে সাঁতরে গেল ইন্দ্রনাথ। বোটের ইঞ্জিনের আওয়াজ লক্ষ করে। ওর ঠিক সামনেই ভাসছে অচেতন বৃদ্ধ। এক লাইনেই উলটো দিক থেকে এগিয়ে আসছে মোটরবোট। আলো নেই বোটে। কালো আকাশ আর কালো জলের পটভূমিকায় দেখা যাচ্ছে শুধু কালো জমাট আঁধার। বোটের বিশাল খোল। রিভার্স গিয়ারে ঘড়ঘড় আওয়াজ হল, স্পিড কমছে বোটের, স্থির হয়ে গেল ভাসমান শরীরটার পাশে এসে।
তোলো।
বোটের উঁচু দিক থেকে নেমে এল একটা বোটহুক। লাইফবেল্টের স্ট্র্যাপে গেঁথে গেল হুক। টেনে তোলা হল শরীরটাকে।
ঠান্ডা মেরে গেছে, তবে বেঁচে আছে, বোটের ডেকে ধ্বনিত হল পুরুষ কণ্ঠস্বর।
আলো না জ্বালিয়েই আন্দামান-নিকোবর দ্বীপের গোলক ধাঁধার দিকে ভটভটিয়ে এগিয়ে গেল মোটরবোট। ততক্ষণে বোটে উঠে পড়েছে আরও এক আরোহী–বোটের মালিক তাকে চেনে না।
বোট যখন দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক তখন দুটো হাত উঠে এসেছিল কালো জল ছেড়ে। নোঙর আঁকড়ে অক্লেশে টেনে তুলেছিল নিজের ব্যায়ামপুষ্ট বডিটাকে। বোট যখন ছুটেছে ঘণ্টায় তিরিশ মাইল গতিবেগে, সে তখন গলুইয়ের তমিস্রায় নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছে।
মাকড়সা ওৎ পেতে বসে থাকে জটিল জালের ঠিক সেন্টারে। ইন্দ্রনাথ রুদ্র চলেছে রহস্যময় সেই কেন্দ্র অভিমুখে।
.
আদর করে দ্বীপটার ডাকনাম হয়েছিল রাজার দ্বীপ। শুনলে মনে হতে পারে রাজা-বাদশাদের আনাগোনা ছিল অতীতকালে। অথবা বাদশাহী কাণ্ডকারখানা চলছে সেখানে এখনও।
কিন্তু এ দ্বীপে রাজকীয় কাজকারবার নেই একেবারেই।
ছোট্ট দ্বীপ। খান কয়েক কাঠের গুঁড়ির কেবিন। দ্বীপে দিন গুজরানের অভিলাষ যাদের, তাদের জন্য একটা মুদির দোকান।
মোহান্তর ডেকে দাঁড়িয়ে নিমেষহীন চোখে এই দ্বীপটার দিকেই তাকিয়েছিল বিদ্রোহী।
পাশে দাঁড়িয়ে আসগর বললে, আপনার প্ল্যানটা কী?
দ্বীপে হানা দেওয়া।
পণ্ডশ্রম হবে। প্রাণটাও যেতে পারে। এখানকার খুদে-খুদে দ্বীপে অনেক ব্যাপার চলে, পুলিশ আসতেও সাহস পায় না। দ্বীপে নামতেই পারবেন না। বুলেট ছুটে আসবে।
ভয় পেয়েছ?
আপনার হঠকারিতা বন্ধ করার চেষ্টা করছি। আপনার স্ত্রী ছাড়াও আরও অনেককে যারা ওখানে আটকে রেখেছে, তারা নিশ্চয় বাইরের লোককে দ্বীপের ধারেকাছে আসতে দেবে না। নামবার জায়গা খোঁজার জন্য আমাকে টহল দিতেই হবে। খবর চলে যাবে।
যাক।
আপনি যা করতে চাইছেন, সেটা তো হবে না।
তোমার প্ল্যান কী?
রাজার দ্বীপে নেমে পড়ুন। মুদির দোকানে খোঁজ নিন। আশপাশের ছোটখাটো দ্বীপের মানুষ কেনাকাটার জন্য পোর্টব্লেয়ার যায় না। খোঁজ পেয়ে যাবেন।
আসগরের বুদ্ধির তারিফ করতেই হল বিদ্রোহীকে। একটু চুপ করে থেকে বললে, তার চাইতে ভালো হয়, যদি তুমি নামো।
নেমে?
আমার মুখ দেখলে সবাই ভয় পায়। তোমাকে দেখলে ঠিক তার বিপরীত হবে। প্রাণ খুলে কথা বলবে।
ঠিক আছে।
বাঁশের তৈরি জেটিতে মোহান্তকে বেঁধে রেখে আসগর নেমে গেল। ফিরে এল ঘণ্টাখানেক পরে।
ছোট্ট কেবিনে নিশূপ দেহে বসেছিল বিদ্রোহী। যেন পাথরের চিনেম্যান। আসগর বললে, আপনাকে আঘাটায় নামিয়ে দিচ্ছি।
তারপর?
খাবার এনেছি দোকান থেকে, চিড়ে গুড়। খেয়ে নিন। এই নিন জলের বোতল। জঙ্গলে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। সন্ধের পর ডলফিন আসবে এখানে।
