কুঁজে ঠেস দিয়ে আরও আরামে বসল ইন্দ্রনাথ এবং রইল প্রতীক্ষায়।
ক্রিমিনালদের হেডকোয়ার্টার আবিষ্কারের বিপদসঙ্কুল এই পরিকল্পনাটা তার নিজস্ব। বলেছিল প্রেমচাঁদকে, যাব একই প্লেনে, একই জায়গায়। দেখি তোর মুরোদ, পারবি না পথ পরিষ্কার করে দিতে?
প্রেমচাঁদ তার খেল দেখিয়েছে।
এবার এসেছে ইন্দ্রনাথের খেলা দেখানোর সময়।
বসেছে বিদ্রোহী যেখানে বসেছিল একমাস আগে, ঠিক সেই জায়গায়। বুদ্ধির ভেলকিতে যদি হারাতে পারে প্রতিপক্ষকে, প্রাণে বাঁচবে, নইলে…
দুঃসাহসের প্রথম পর্বটা সহজেই পেরিয়ে আসা গেছে। এবার বাকি দ্বিতীয় পর্ব, সবচেয়ে কঠিন পর্ব। আন্দামান বেশি দূর নেই।
লক্ষ করে যাচ্ছে আট আরোহীর প্রত্যেকের প্রতিটি মুভমেন্ট।
বেশি নজর কিন্তু পাশে বসা লোকটার দিকে। বিপদের সম্ভাবনা এই তরফেই। একটু আগেই প্লেনের পেছনে গিয়ে রুমাল বের করেছে ব্রিফকেস থেকে।
পাশের দিকে বড় বেশি নজর দিয়েছিল বলেই একটু শৈথিল্য দিয়েছিল পেছনের দিকে। কানজোড়াকে ততটা সজাগ রাখেনি। তাই বুঝতেও পারল না, একদম পেছনের সিট থেকে অতিশয় মামুলি চেহারার একটা লোক সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। বেড়ালের মতন নিঃশব্দে এসে গেছে পেছনে, বগল থেকে একটা রিভলভার বের করে আচমকা ঝুঁকে পড়েছে সামনের দিকে।
খরনজরে পাশের লোককে দেখতে-দেখতে হঠাই টের পেল ইন্দ্রনাথ, হিমশীতল একটা বস্তু ঠেকেছে কানের পেছনে। এখন একটু নড়লেই উড়ে যাবে মগজ। সুতরাং সে একদম অনড় হয়ে রইল।
নড়ল না কেউই। কথাও বলল না। ডিটেকটিভ ধরা পড়েছে। আর কি?
খুব আস্তে, নিরন্তর নিঃশব্দ হাসি-আঁটা মুখটা ঘুরে গেল ইন্দ্রর দিকে। হাসতে হাসতেই সে রুমাল বের করেছে পকেট থেকে। শক্ত চোয়াল, শক্ত নাক, শক্ত চোখওয়ালা মেয়েটা বিষম ভয়ের ভান করছে। আর সবাই দাঁত খিঁচিয়ে হাসছে।
হাসি মুখ লোকটা একহাতের শিশি উপুড় করে ধরেছে আর এক হাতের রুমালের ওপর। ক্লোরোফর্মের উৎকট গন্ধে ভরে গেল কেবিন।
পাইলট। বিকট গলায় হেঁকে উঠল ইন্দ্রনাথ। এর বেশি কিছু করা সম্ভব নয়। নলচে ঠেকে রয়েছে কানের পেছনে।
ক্লোরোফর্ম ভিজোনো রুমাল চেপে বসল তার নাকে আর মুখে। ধস্তাধস্তি করেছিল ইন্দ্রনাথ। প্রথমে জোরে, তারপর ক্ষীণভাবে। শেষে নিস্তেজ হয়ে গেল সর্বাঙ্গ। রুমাল আরও চেপে বসল নাকে মুখে।
সিটে এলিয়ে পড়ল কুঁজো।
দুজন গিয়ে ট্র্যাপডোর খুলছে। ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে ভেতরে। আয়তাকার গর্তের দিকে শিথিল দেহটাকে ঠেলে এগিয়ে দেয় বেশ কয়েকজন।
দু-হাজার ফুট নীচে বঙ্গোপসাগরের আবলুষ কালো জল ফুটপাথের মতনই কঠিন, এত উঁচু থেকে যে আছড়ে পড়বে, সে পড়বে যেন গ্রানাইটের ওপর।
ঢালু পথে গড়িয়ে দেওয়া হল ইন্দ্রনাথকে। ঢাল নেমে গেছে প্লেনের পেছন দিকে। আর তাকে দেখা গেল না। গর্জন অব্যাহত রেখে এগিয়ে গেল বায়ুযান।
.
ইন্দ্রনাথ কোথায়?
বিমানের মধ্যে তখন চলছে বিপুল তৎপরতা। চলছে দু-হাজার ফুট নীচের জলেও। অনেক দূরে পিনের ডগার মতন একটা আলোক বিন্দু দেখা গেছে জলের ওপর। দেখেছে নিরবচ্ছিন্ন হাস্যমুখর চুরুটধারী।
কুচক্রীদের গোপন বিবরের নিশানা এই আলোর কণা।
প্লেনের পেছন থেকে হিড়হিড় করে টেনে আনা হল কালো ট্রাঙ্ক। ডালা খুলে ধরাধরি করে বের করা হল একটা মনুষ্যদেহ। বৃদ্ধ অথচ তার হাত মুখ পা কষে বাঁধা। জ্ঞানহীন এই বৃদ্ধ সুজন দেশাই।
কর্কলাইট বেল্ট এঁটে দেওয়া হল বৃদ্ধের কাঁধে।
সামনের কম্পার্টমেন্টের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে পাইলট। হাঁক দিচ্ছে সেখান থেকেই, তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি।
দ্রুত হাত চালিয়ে একটা প্যারাসুট বেঁধে দেওয়া হল সুজন দেশাইয়ের শরীরে। বয়ে নিয়ে যাওয়া হল খোলা ট্র্যাপডোরের পাশে।
আলোকবিন্দু এখন প্লেনের ঠিক নীচে। হেঁকে ওঠে পাইলট, ফেলুন।
ঢালু দরজার ঢালে পিছলে নামিয়ে দেওয়া হল দেহটাকে।
প্যারাসুটটা খুললে হয়। অস্বস্তির সুরে বললে একজন।
এর আগেও যখন খুলেছে, এবারও খুলবে, জবাব দিল আর একজন।
বলতে-বলতেই দেখা গেল প্যারাসুট খুলে গেছে। বঙ্গোপসাগরের জলের দিকে হেলেদুলে নেমে যাচ্ছে সুজন দেশাইয়ের অচেতন দেহ।
সাদা ব্যাঙের ছাতার মতন এই প্যারাসুটের অদুরে খুলে গেল আর একটা ব্যাঙের ছাতা, এটা কুচকুচে কালো রঙের।
প্লেন থেকে পতনের ঝুঁকিটা অকারণে নেয়নি ইন্দ্রনাথ।
মাথা খাঁটিয়েছে আগেই। ডগলাস প্লেনের আন্ডারক্যারেজের নকশা আঁকিয়ে নিয়েছিল চম্পককে দিয়ে।
এ প্লেন ল্যান্ডিং করে ট্রাইসাইকেল কায়দায়। পেছনের চাকাজোড়াকে জুড়ে রেখেছে যে ডান্ডাটা সেটা থাকে ট্র্যাপডোরের পেছন প্রান্তে। হাত বাড়ালে নাগাল পেলেও পাওয়া যেতে পারে।
নাকেমুখে ক্লোরোফর্ম দেওয়ার সময় দমবন্ধ রেখেছিল ইন্দ্রনাথ। তা সত্ত্বেও শেষের দিকে যৎকিঞ্চিৎ নাকে ঢুকেছিল, তাতেই কুয়াশা জমেছিল ব্রেনে। লোপ পেয়েছিল জ্ঞান।
ট্র্যাপডোরের মারাত্মক ঢালু পথে পিছলে নামবার সময় ঠান্ডা হাওয়ার ঝাঁপটায় পরিষ্কার হয়ে গেছিল মগজ। পা নীচের দিকে করে পাশ ফিরে হড়কে নেমে যাচ্ছে, বুঝতে পেরেছিল। দরজার ঢাল থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসার সঙ্গে-সঙ্গে মোচড় দিল শরীরে।
সেকেন্ডে দুশো ফুট গতিবেগে এরোপ্লেনটা মাথার ওপর থেকে সরে যেতেই বাতাসের ধাক্কায় একটু কমেছিল ওর পতনের বেগ। ওইটুকু সময়ের মধ্যেই হাত বাড়িয়ে আঙুলের ডগা দিয়ে ধরে নিয়েছিল পেছনের চাকা জোড়ার মাঝের ডান্ডা। বাতাসের ধাক্কায় সঙ্গে-সঙ্গে উড়ন্ত প্লেনের সঙ্গে সমান্তরাল হয়ে গেল শরীর, আঙুলের আঁকশি কিন্তু শিথিল হয়নি। বরং আরও জবর মুঠোয় চেপে ধরেছে ডান্ডা।
