হত্যাকারীরা তাহলে বলবন্তের বন্ধু। বাড়ির ঠিকানা জানত। কিন্তু ট্যাক্সি নিয়ে উত্তর কলকাতার দিকে যাচ্ছিল কেন? সটান ভবানীপুরে এল না কেন?
খুনটার মোটিভ তাহলে ট্যাক্সি ছিনতাই নয়–জহরত লুঠ। শুনে নিশ্চিন্ত হলেন ধরণী ঘোষাল–ট্যাক্সি ড্রাইভারদের হামলা এবার রোখা যাবে।
আমার মনটা কিন্তু খচখচ করতে লাগল। বলবন্তর বন্ধুরা অত রাতে বেলেঘাটাতেই বা এল কেন, খুন-টুন করে ভবানীপুরের দিকে না গিয়ে আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার সামনেই বা গেল কেন?
ধরণী ঘোষালকে নিয়ে এলাম আমহার্স্ট স্ট্রিট থানায়। দেখলাম ট্যাক্সিখানা। পেছনের ট্রাঙ্ক খুলে দেখলাম, থরে থরে সাজানো টায়ার। অনেকগুলো মোটর সাইকেলের টিউবও রয়েছে ভেতরে। টায়ার আর টিউব, দুটো থেকেই বেরোচ্ছে দিশি মদের গন্ধ। চোলাই মদ। টিউবে ভরে টায়ারের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে যাওয়া হত। সবকটা টিউবই খালি। অর্থাৎ ট্যাক্সি করে মাল পাচার করে ফিরছিল বলবন্ত সিং। কোথায় ফিরছিল?
ধরণী ঘোষালকে নিয়ে চলে এলাম বেলেঘাটায়। চোলাই মদের ডিপো এখানে একটা নয়–একাধিক। ডোবায় পোঁতা থাকে বোতল, জালা। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসের ধারে ধারে ধাপা-বানতলা পর্যন্ত চলছে এই ব্যবসা। দিনদুপুরেও দূর থেকে দেখা যায় ঝোঁপের মধ্যে জলা-জায়গায় ধোঁয়া উঠছে। ধরণী ঘোষাল দেখলাম আমার চাইতেও বেশি খবর রাখেন। মার্কামারা কয়েকটি আড়তে হানা দিলেন সবার আগে। অভয় দিতে এক জায়গায় বললে, বলবন্ত সিং খুন হয় যে রাতে, সেইদিন একগাড়ি মাল নিয়ে গেছিল। সঙ্গে ছিল তিনজন পাঞ্জাবি দোস্ত। শিখ।
ধরণী ঘোষাল উল্লসিত হলেও আমি হইনি। এত বড় শহরে তিনজন শিখ খুনেকে খুঁজে বার করা সম্ভব নয় কোনওমতেই। কিন্তু তাই বলে তো হাল ছেড়ে দেওয়াও যায় না। একগাড়ি মাল ডেলিভারী দিয়ে বলবন্ত বন্ধুদের নিয়ে আবার আসছিল নিশ্চয় আর একগাড়ি মাল নিতে–অন্তত বন্ধুরা তাই বুঝিয়েছিল বলবন্তকে। তারপর বচসা হয়েছে–খুন হয়েছে বলবন্ত। কিন্তু কলহটা কি নিয়ে? সাকিনাকে নিয়ে নয়তো? উপপত্নীর ভাগ তো দোস্তরাই চায়। সাকিনা তাহলে কোথায়? ট্যাক্সি পাওয়া গেছে উত্তরমুখো অবস্থায়। বলবন্তকে সরিয়ে দোস্তরা প্রথমেই সাকিনা সন্ধানেই যাচ্ছিল নিশ্চয়–ভেবেছিল রূপ আর রূপো এক জায়গাতেই পাওয়া যাবে। তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় ফিরে এসেছে বলবন্তের ঘরে। জহরত পেয়েছে কিনা জানা যাচ্ছে না–কিন্তু সাকিনাকে পেয়েছে কি?
বলবন্তর যা চরিত্র, তা থেকে বোঝা যায় উত্তর কলকাতার একটা নিষিদ্ধ পল্লীতে তার যাতায়াত থাকা স্বাভাবিক। সোনাগাছিতে। চোরাই মদের কারবারটাও সেখানে চলে ভালো। ট্যাক্সি নিশ্চয় যাচ্ছিল সেই দিকেই। বলবন্ত নিজের ঘরে তোলেনি সাকিনাকে হয়তো রেখে এসেছে নিষিদ্ধ পল্লীরই কোনও নিশ্চিন্ত ডেরায়।
গেলাম সোনাগাছিতে। হেদিয়ে পড়েছিলেন ধরণী ঘোষাল। কিন্তু ঘনঘন নস্যি নিচ্ছিলেন আর দিচ্ছিলেন আমাকে। চার্চিল…চার্চিল স্বগতোক্তি শুনে যাচ্ছিলাম সমানে। মৃগাঙ্ক, তুমি সোনাগাছি কখনো যাওনি আমি জানি। কিন্তু আমার লাইনটাই খারাপ। সব খবরই রাখতে হয়। বারবনিতাদেরও ক্যাটেগরি আছে। রূপ আর পশার অনুযায়ী এক-এক বাড়িতে এক-এক দলের নিবাস। নতুনদের তোলা হয় আবার বিশেষ বিশেষ জায়গায়। বাঙালি, হিন্দুস্থানী, মুসলিম, চাইনিজদের এলাকা আলাদা আলাদা। নিয়মিত খদ্দেররা মোটামুটি খবর রাখে দালালদের দৌলতে–দালালরাও সব খবর ভাঙে না। পুলিশের ভয়ে। কিন্তু রামকেষ্ট আমার হাতের লোক। কোনওকালে তার একটা উপকার করে ফেলেছিলাম–আজও সেই উপকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে সে এক পায়ে খাড়া। ধরণী ঘোষালকে জিপে বসিয়ে এই রামকেষ্টকেই খুঁজে বার করলাম। কথা ফুরোনোর আগেই সে শুধু সাকিনার ডেসক্রিপশন শুনে বলে দিলে, মালটা কদিন আগেই এসেছে বটে কিন্তু বাজারে নামেনি এখনো। প্রাইভেট মাল। প্রাইভেটদের এলাকায় আছে বহাল তবিয়তে। সোনাগাছির অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী সেখানে কাউকে নিয়ে যাওয়া যাবে না।
কিন্তু রামকেষ্ট তো আমাকে চেনে। সোনাগাছির সততা সম্বন্ধে আমাকে সমঝে দেওয়ার পর নিয়ে গেল সাকিনার ঘরে। পঞ্চদশী মেয়েটা যেন আগুন দিয়ে গড়া। হেলেনের জন্য ট্রয়, পদ্মিনীর জন্যে চিতোর ধ্বংসের পর সাকিনার জন্যেও কলকাতা ধ্বংস হয়ে গেলে আশ্চর্য হব না। বলবন্ত তো গেলই–এবার যাবে তার হত্যাকারীরা।
আমাকে দেখেই ভুরু কুঁচকেছিল সাকিনা। রামকেষ্ট অভয় দেওয়ার পর ভুরু সরল হয়েছিল। বলবন্ত যে আর নেই, প্রথমে তা ভাঙি না। শুধু দুটো প্রশ্ন করেছিলাম–জহরতের বাক্সটা কোথায়?
বলবন্তর কাছে, বলেছিল সাকিনা। অত দামি বাক্স এ অঞ্চলে রাখতে চায়নি। কিন্তু আজ এলেই বলবে বাক্স ফিরিয়ে আনতে।
দ্বিতীয় প্রশ্নটা করতেই বললে, হা, হা, চিনব না কেন? আমারই দেওয়া তো।
দ্বিতীয় প্রশ্নটা কি যদি আঁচ করতে পারো, মৃগাঙ্ক, তাহলে বুঝব তুমি বড় গোয়েন্দা-লেখক। আর যদি না পারো, ধৈর্য ধরো।
তখন সন্ধে হয়েছে। সোনাগাছির মদের আড্ডায় ভিড় শুরু হয়েছে। রামকেষ্টকে দিয়ে দোকানদারকে ম্যানেজ করিয়ে কাউন্টারের পেছনে সাকিনাকে বসিয়ে রাখলাম বোরখা পরিয়ে। সাকিনা এসেছিল–বলবন্ত আর ফিরবে না শুনে রাগে ফুঁসতে ফুসতে এসেছিল। মদ খেতে আসবে শুনে এক কথাতেই রাজি হয়ে গেছিল।
