টাকার কার্পেট পেতে রেখেছে নাকি লোকটা? নাকি ওপর মহলের নির্দেশ?
ডগলাস বিমান তখন ওড়বার জন্য তৈরি হচ্ছে, লোকটাও ভাঙা গলায় চেঁচাচ্ছে, আটকাও, আটকাও। প্লেনটাকে ধরো। পোর্টব্লেয়ার যেতে হবে আমাকে, এখুনি।
বিমানের ভেতরে চুরুটধারী পুরুষ সবেগে ছিটকে গেল পাইলটের কম্পার্টমেন্টে, চালাও। আবার এসেছে একটা গাধা।
চিৎকার করে ওঠে পাইলট, চালাব কী করে? চাকার তলা থেকে কাঠ না সরালে চাকা ঘুরবে কী করে? বলতে বলতে উদ্দামভাবে হাতের ইশারা করতে থাকে নীচের লোকজনদের, কাঠের ব্লক সরিয়ে নেওয়ার জন্য।
প্লেনের দরজা পর্যন্ত লাগানো সিঁড়ি তখনও সরানো হয়নি। কুঁজো এসে দাঁড়িয়েছে সিঁড়ির গোড়ায়। হাত-পা ছুঁড়ে তর্ক জুড়েছে ফিল্ড অ্যাটেনড্যান্টের সঙ্গে।
প্লেন হাউসফুল তো আমার কি? যেতে আমাকে হবেই। প্লেনের ল্যাজে বসে থাকব। এতবড় একটা প্লেন বাড়তি একজনকে নিয়ে যেতে পারবে না বললেই হল? আরও হাফটন ওজন নিয়ে শুন্যে উড়ে যেতে পারে এ প্লেন। কী ভেবেছ আমাকে? গাড়ল?
তা সত্ত্বেও পথ রুখে দাঁড়িয়েছিল অ্যাটেনডেন্ট। ঠিক এই সময় একটা লাল জিপ এসে দাঁড়াল পাশে। ভেতরে থেকে শোনা গেল কড়া গলা, ঝামেলা কীসের? যেতে চাচ্ছে যাক।
জোঁকের মুখ নুন পড়ল যেন। সরে গেল অ্যাটেনড্যান্ট। সিঁড়ি বেয়ে তরতরিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে বিড়বিড় করে বললে কুঁজো, সাবাস প্রেমচাঁদ। তোর হাত এত লম্বা?
গলাটা ইন্দ্রনাথ রুদ্রর।
প্লেনের দরজা তখন বন্ধ হচ্ছে। ভেতর থেকে তিনজন বন্ধ করতে চাইছে। বাইরে থেকে কুঁজো একাই দরজা খুলে রাখছে। ঢুকেও গেল ঝটকানি মেরে। তিনজনকে এক হাতে রুখে দেওয়া তার কাছে নেহাতই ছেলেখেলা।
ঢুকেই অবশ্য পানরঞ্জিত বিচ্ছিরি দাঁত বের করে বলে উঠল, সরি ফর ডিসটার্বান্স, বাট আই হ্যাভ টু গো।
চুরুটধারী তখনও রয়েছে পাইলটের কম্পার্টমেন্টে। পাইলট শুনেছে কুঁজো ঢুকে পড়েছে ভেতরে।
বললে খাটো গলায়, একটু দাঁড়িয়ে যাব? ঠেলে ফেলে দেবেন?
না। জিপের অফিসার আমাদের ঘুষের লিস্টে নেই। কুঁজোর ব্যবস্থা করছি–ওঠাও প্লেন।
দমাস করে বন্ধ হল দরজা। রানওয়ের ওপর দিয়ে দৌড়ে গিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিমায় গগনবিহারী হল ডগলাস প্লেন।
শূন্য একটা সিটে ততক্ষণে পরম আরামে বসে পড়েছে কুঁজো।
আমোদ ঝলমল করছে গোটা বদন জুড়ে। যেন ভীষণ একটা মজা হয়ে গেল, এমনিভাবে তাকাচ্ছে আট আরোহীর দিকে।
চুরুটধারীকে শুধু একটাই প্রশ্ন করল, পাইলট কোথায়?
প্রথমটাকে ফেলবার ঠিক আগে–দূরে আলোর সিগন্যাল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। আগের মেয়েটাকে প্যারাসুট দিয়েছিলাম। এটাকে তাও দেব না। তার হাজব্যান্ডকে পোর্টব্লেয়ার পৌঁছে দিয়েছিলাম, এটাকে জলে ফেলে দেব। টাকার মালিক বলে তো মনে হয় না–জঘন্য।
দাঁত বের করে আমুদে হাসি হাসতে-হাসতে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল জঘন্য কুঁজো।
আর, সাধারণ প্যাসেঞ্জারদের মতনই ঝিমোতে শুরু করে দিল প্লেনের আটজন আরোহী। নিদারুণ একঘেয়েমির ভাব মুখচ্ছবিতেই সুস্পষ্ট। লোমশহস্ত বিশালবপু লোকটা মাঝেমধ্যে সামনে ঝুঁকছে, কী যেন বলছে সামনে সলিডবপু খর্বকায় চুরুটধারীকে। দ্বিতীয় ব্যক্তি ঠোঁট বেঁকিয়ে মৃদু মৃদু হেসেই চলেছে, হাসিহীন কিন্তু মুখাবয়বের বাদবাকি অংশ। এই হাসিটুকুই একমাত্র প্রাণস্পন্দন হয়ে রয়েছে আট আরোহীর মধ্যে। বাকি সবাই যেন নিষ্প্রাণ।
ভয়ানক উত্তেজনার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কেবল বৃষস্কন্ধ কুজ ব্যক্তিটির সর্বাঙ্গে। এমনভাবে ইতিউতি তাকাচ্ছে যেন জীবনে এই প্রথম বিমানে চেপেছে। জানলার ওপর দিয়ে তাকাচ্ছে, নীচ দিয়ে তাকাচ্ছে, অন্ধকারে কত কিছু দেখবার চেষ্টা করছে দু-চোখ কুঁচকে। তারপরেই বত্রিশপাটি দাঁত বের করে তাকাচ্ছে সহযাত্রীদের দিকে। যেন একটা বৃহদাকার বালক। নিরবচ্ছিন্ন শব্দহীন হাসিতে ঠাসা লোকটা কিন্তু এই ভড়কিতে ভোলেনি।
চর্বির পাহাড় বসেছিল ঠিক তার সামনেই। ঈষৎ ঝুঁকে বললে নিম্নকণ্ঠে, এবার চিনেছি বাছাধনকে। সেই টিকটিকিটা ইন্দ্রনাথ রুদ্র। ওই চোখ কি ভোলো যায়?
সত্যি, তাড়াহুড়োয় ওই একটা ভুল করেছিল ইন্দ্রনাথ। কনট্যাক্ট লেন্স ছদ্মবেশ বাক্সে তো ছিলই।
তবে মানুষ মাত্রেরই ভুল হয়।
নিঃশব্দে শিস দিয়ে ওঠে চর্বির পাহাড়, আশ্চর্য। কুঁজ দেখে ভুলেছি সবাই।
বিদ্রোহীর লোক। টাকার লোভে রাস্কেলটাকে ছেড়ে দেওয়াটা ভুল হয়েছে। কী করা যায়?
বাড়াবাড়ি করলে ট্র্যাপডোর তো রয়েছেই।
ভয়ানক জোর গায়ে–দরজাটা একহাতে খুলল কী করে দেখলেন তো?
টিট করার পথ আমি জানি। সুটকেশে আছে তো জিনিসটা?
নিশ্চয়।
তাহলে ওঠা যাক।
দ্যাখন হাসি, লোকটা দাঁড়িয়ে উঠে গেল প্লেনের পেছন দিকে। ফুরফুরে চেহারার বিমান সেবিকা এগিয়ে এল একইরকম সেঁতো হাসি হেসে–পোর্টব্লেয়ারের এই সফরে প্রতিবারেই এই ললনাকেই দেখা যায় এই প্লেনে। এগিয়ে দিল দ্যাখন হাসির ব্রিফকেস। নিরীহ দর্শন একটা রুমাল বের করে সশব্দে তাতে নাক ঝেড়ে নিল দ্যাখন হাসি। কিন্তু ব্রিফকেস বন্ধ করার সময় যখন রুমাল গুঁজল পকেটে, তখনই বর্ণহীন তরল পদার্থ ভরতি ছোট্ট একটা শিশি চালান হয়ে গেল রুমালের ফাঁকে।
স্বস্থানে ফিরে এসে পাশের জানলা দিয়ে কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইল দ্যাখন হাসি। তারপর উঠে এসে বসল কুঁজোর পাশের খালি সিটে। জানলা দিয়ে চেয়ে রইল বাইরে। যেন অদৃশ্য কোনও বস্তু নিরীক্ষণের আপ্রাণ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।
