বিদ্রোহী ঠোঁট আর অধর না কাঁপয়ে বললে, তাই চলো।
চিনেম্যান মেকআপ এখনও পালটায়নি বিদ্রোহী। চিনেম্যানের মুখে এত পরিষ্কার বাংলা আশা করেনি আসগর। তাই চেয়ে রইল সাদা চুল, সাদা মুখ আর কালো চোখের দিকে।
দুই চোখের অমানবিক শীতলতা শিহরিত করল আসগরের মতন আসুরিক শক্তির মানুষকেও।
মোহান্ত বেরিয়ে গেল বঙ্গোপসাগরের বুকে।
.
ইনসুলিন, বললে ইন্দ্রনাথ কলকাতায় প্রেমাদের অফিসে বসে, দরকার হয় হাই ডাইবিটিজ পেসেন্টের জন্য। সেন্ড ইনসুলিন লেখা কাগজটা পাওয়া গিয়েছিল সুজন দেশাইয়ের বাড়িতে। কেমন?
প্রেমচাঁদ বললে, শুনছি।
নিশ্চয় ধস্তাধস্তির সময় চার গুন্ডার পকেট থেকে পড়ে গেছিল? সুজন দেশাইয়ের গৃহরক্ষী কিন্তু ইনসুলিন কি জিনিস, তা জানে না। তার বস সুজন দেশাইয়েরও ডায়াবিটিজ নেই। হাউস ফিজিসিয়ানের কাছে খবর নিয়েছি।
বলে যা।
শুকতারা টেলিপ্যাথিক মেসেজ পাঠায় বিদ্রোহীকে। ব্যাপারটা বিজ্ঞানসম্মত নয়, কিন্তু ঘটছে। বিজ্ঞান যার ব্যাখ্যা করতে পারে না, এমন অনেক জ্ঞানই আমাদের গিলতে হচ্ছে। স্রেফ ঘটে যাচ্ছে বলে। শুকতারার অসাধারণ ক্ষমতাকেও তাই মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছি।
বেশ।
শেষ বার্তায় শুকতারা জানিয়েছিল, ফোনে হুকুম দেওয়া হবে–নেক্সট প্লেনে ইনসুলিন পাঠানোর জন্য। নেক্সট প্লেন যাচ্ছে আজকে। যার মধ্যে যাচ্ছি আমি, স্রেফ গায়ের জোরে।
জানি।
ইনসুলিনও যাচ্ছে এই প্লেনে। কার জন্য?
যার ডায়াবিটিজ আছে তার জন্য?
মাই ডিয়ার প্রেমচাঁদ, এই হেঁয়ালিটার সমাধান করেছি স্রেফ ব্রেন ওয়ার্ক করে। তুই কি কিঞ্চিৎ লেগ ওয়ার্ক করে আমার সিদ্ধান্তটার সমর্থন এনে দিবি?
সিওর, উজ্জ্বল চোখে বললে প্রেমচাঁদ, যাদের কিডন্যাপ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাদের কি কারুর জন্যে দরদ উথলে উঠল কিডন্যাপারদের–এইটাই তো জানতে চাস?
রাইট ইউ আর, মাইডিয়ার মাথামোটা প্রেমচাঁদ।
.
কুঁজোর হঠকারিতা
ট্রান্সপোর্ট প্লেনে রাতের জার্নি খুব সুখকর হয় না। বিমান ভ্রমণের উত্তেজনা এতে নেই। গতিবেগ হয় মন্থর, জানলা দিয়ে বাইরে কিছু দেখাও যায় না। মোটরের চাপা একঘেয়ে গজরানিতে ঘুম এসে যায়। প্যাসেঞ্জাররা ঢুলতে পারলে বেঁচে যায়।
অথচ রাতের মালবাহী বিমানেই উঠেছে এতগুলি মানুষ।
প্রথমে এসেছিল চারজন। ট্যাক্সিতে। চার পুরুষ। একজন বিশালকায় এবং স্থূলকায়। বাড়তি চর্বি জমেছে শরীরের সব জায়গায়। দ্বিতীয় জন বিশাল, তবে চর্বির পাহাড় নয়, এর হাতে রয়েছে। গুচ্ছ-গুচ্ছ কালো চুল। তৃতীয় জন খর্বকায়, সলিড বপু, দাঁতের ফাঁকে-ফাঁকে মোটা চুরুট। চতুর্থ জন ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার মতন মামুলি চেহারার অধিকারী।
এরা চারজনেই ছিল সেই রাতে–যে রাতে শুকতারা নিখোঁজ হয়েছিল উড়ন্ত প্লেন থেকে।
ট্যাক্সি থেকে নামবার আগে চুরুট প্রিয় খর্বকায় ব্যক্তি যেন বলেছিল নিজের মনেই, ট্রাঙ্কটা কার কাছে?
রিনির কাছে। জবাব দিল চর্বির পাহাড়।
ট্যাক্সি থেকে নেমে চার মূর্তিমান স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিমায় ঢুকে গেল ভেতরে। চারজনেরই হাতে ছোট ব্রিফকেস–যেমন থাকে প্যাসেঞ্জারদের হাতে। বিবিধ বিধি নিষেধের গণ্ডি টপকিয়ে চারজনেই এগিয়ে গেল ডগলাস বিমানের দিকে। কিন্তু তাড়াহুড়ো নেই।
ঝড়ের বেগে আর একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল গাড়ির লাইনে। গাড়ি থেকে নামল চারজন। তিনজন মামুলি চেহারার পুরুষ, চতুর্থজন এক মহিলা। আকর্ষণীয়া। কিন্তু চোখ শক্ত, নাক শক্ত। চোয়াল শক্ত। এগুলির জন্যই তাকে পুরোপুরি বিউটি কুইন বলা যাচ্ছে না।
তিন পুরুষ আরোহীর একজন বললে দ্রুত কণ্ঠে রিনি ট্রাঙ্কটা। বাগড়া পড়বে না তো ভেতরে ঢোকাতে?
কঠোর হেসে রিনি বললে, এই বডি দেখিয়ে সব পথই চিচিং ফাঁক করে রেখেছি। এর আগের দুবার কী অসুবিধে হয়েছে?
টিকটিকি লেগেছে যে পেছনে।
টাকাও ছড়াচ্ছি আমি, প্লাস মাই বডি। ডোন্ট ওরি। গো অ্যাহেড। ট্রাঙ্ক নিয়ে তিনজনে পেছনে। বিধি নিষেধের গণ্ডিগুলো ভোজবাজির মতন মিলিয়ে যাচ্ছে রিনির খটখটাখট জুতোর হিলের আওয়াজ শোনার সঙ্গে-সঙ্গে। খোদ প্রাইম মিনিস্টার গেলেও এভাবে শশব্যস্তে কেউ পথ ছেড়ে সরে দাঁড়ায় না।
ধীরপদে হাঁটছিল যে চারজন, ট্রাঙ্কবাহী দলটা তাদের নাগাল ধরে ফেলতেই ট্রাঙ্কের ওজন নিয়ে আর কারও মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। আট যাত্রী, এক ট্রাঙ্ক। অসুবিধাটা কোথায়?
আগে ট্রাঙ্ক উঠে গেল বিমানে, যাত্রীরা উঠল তার পরে। এবার রওনা হওয়ার পালা।
উল্কাবেগে একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল বাইরে। ছিটকে বেরিয়ে এল বিদঘুঁটে এক মূর্তি। লম্বা সে বিলক্ষণ সন্দেহ নেই, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না কুঁজো হয়ে থাকায়। উটের কুঁজের মতনই বিশাল বক্রপিঠ বেচারিকে ঝুঁকিয়ে রেখেছে সামনে। কিন্তু সে হাঁটছে অবিশ্বাস্য গতিবেগে। দৌড়চ্ছে বললেই চলে। তার কাঁধ খুব চওড়া, পায়ে চর্কি লাগায় এই কঁধ দুলছে সমান তালে। মুখ তার থসথসে চবির্তে ঠাসা। পুরু নাক, লোমশ ভুরু। ঠোঁটের দু-কষ বেয়ে পানের রস গড়াচ্ছে। পরনের ঢোল প্যান্ট আর ঢোলা বুশ শার্ট বালিশের খোলের সঙ্গে তুলনীয়।
কী আশ্চর্য! এমন একটা কিম্ভুতকিমাকার মূর্তি কিন্তু ছুটতে ছুটতেই পেরিয়ে গেল গেটের পর গেট, কেউ ফিরেও তাকাল না।
