চম্পক বলল, আকাশ থেকে ড্রপ করে ঝক্কি বাড়ানোর দরকারটা কি? পোর্টব্লেয়ারে নেমে মোটর বোটে করে পাঠিয়ে দিলেই তো ল্যাটা চুকে যায়। অনেক সহজ হয়।
হয় না। বললে প্রেমচাঁদ, পোর্টব্লেয়ার ছোট জায়গা। প্রতি সপ্তাহে সেখানে একটা ট্রাঙ্ক প্লেন থেকে নেমে যদি মোটর বোটে উঠে বিশেষ একটা দ্বীপের দিকে যায়, কাস্টমস-এর চোখে পড়বেই। তার চেয়ে অনেক নিরাপদ আকাশ থেকে ট্রাঙ্কের লোকটাকে ফেলে দেওয়া, জল থেকে তুলে নিয়ে তাকে দ্বীপে পৌঁছে দেওয়া। পোর্টব্লেয়ারে মোটরবোট যখন ফিরে যাবে, দেখা যাবে, বেরুনোর সময়ও ট্রাঙ্ক ছিল না ফিরে আসার পরেও নেই।
তাহলে বিশেষ একটা মোটরবোট পোর্টব্লেয়ার থেকে রাতে বেরিয়ে আবার রাতেই ফিরে আসছে, বললে ইন্দ্রনাথ।
হ্যাঁ। সায় দিল প্রেমচাঁদ।
অতএব আরও একটু লেগ ওয়ার্ক করো বন্ধু।
বান্দা তৈরি। দোস্ত, তুমি যা বলতে চাও তা বোঝা হয়ে গেছে। ওয়্যারলেসে খবর পাঠাচ্ছি পোর্টব্লেয়ার অফিসে। ওখানকার অজস্র মোটরবোটের কোন মোটরবোটটি গত তিন সপ্তাহের বিশেষ এক রাত্রে বিশেষ একটা সময়ে বেরিয়েছে এবং ফিরে এসেছে–এই তো?
কাল সকালেই খবর চাই–বেরুনোর আগে।
কোথায় বেরুবি? এই যে বললি, আট দুশমনের সঙ্গে একই প্লেনে ট্র্যাভেল করবি?
সে তো আমি করব। বিদ্রোহী, চম্পক আর কাকোই যাবে আমার আগেই। চার্টার প্লেনে। তিনজনের কাজ হবে তিন রকম। বলছি, কান পেতে শোন।
ভোরের দিকে ধাতুর পাখিটা উড়ে গেল পোর্টব্লেয়ারের দিকে। যথাসময়ে নেমে পড়ল সেখানে। তালঢ্যাঙা লম্বকর্ণ এক ব্যক্তি তুষোমুখে নেমে এসে চার্লি চ্যাপলিন কায়দায় হেঁটে গিয়ে উঠে পড়ল ট্যাক্সিতে। তার একটু পরে নামল জীবন্ত যন্ত্রের মতন এক পুরুষ। হাইট মোটে পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি। মুখখানা অবিকল চিনে ম্যানের মতন। চামড়া তো নয় যেন সাদা পার্চমেন্ট কাগজ। চোখ দুটোতেই কেবল প্রাণ আছে বলে মনে হয়। বুঝি নরকাগ্নি জ্বলছে সে চোখে। সভয়ে এ হেন পুরুষের দিকে চেয়ে রইল বিমানক্ষেত্রের কর্মীরা। ধীর চরণে গিয়ে সে উঠল অন্য একটা ট্যাক্সিতে। মিনিট খানেক পরেই হন্তদন্ত হয়ে প্লেন থেকে নেমে এল খর্বকায় এক জাপানি। ভাবখানা যেন, ট্রেন ফেল হয়ে যেতে পারে আর একটু আস্তে পা চালালেই। চোখে আর ঠোঁটে কৌতুকের ঝরনাধারা ছুটিয়ে দিয়ে, হাত নেড়ে বিমানক্ষেত্রের কর্মীদের অভিবাদন জানিয়ে, সে একরকম ছুটেই বেরিয়ে গিয়ে উঠে পড়ল তৃতীয় একটা ট্যাক্সিতে। আগের দুটো ট্যাক্সি দাঁড়িয়েছিল এতক্ষণ। এবার তিনটে ট্যাক্সিই যাত্রা শুরু করল একযোগে। ঘুরেফিরে গিয়ে দাঁড়াল একটাই হোটেলের সামনে।
তিনমূর্তি তিনটে ট্যাক্সি থেকে নেমে এসে ঢুকল হোটেলে। উঠল একটাই কামরায়। সেখানে ইজিচেয়ারে জানলার ধারে বসে পাইপ টানছিলেন পক্ককেশ এক বৃদ্ধ। তাঁর নাক চোখা, চিবুক ঠেলে বের করা, সাদা চুল টেনে আঁচড়ানো। পরনের সাদা স্যুটে লাল নেকটাই মানিয়েছে ভালো।
তিনমূর্তি কুচকাওয়াজ করে ঘরে ঢুকতেই মুখের পাইপ নামিয়ে বাঁধানো সাদা দাঁত বের করে প্রায় দাঁত খিঁচিয়েই হাসলেন বৃদ্ধ। বললেন, ক্যাপ্টেন ডিক্সিট স্পিকিং। আপনাদের জন্য একটা মোটরবোট রেডি অ্যাট জেটি। গায়ে লেখা আছে দেখবেন মোহান্ত। এতে কে যাবেন?
বিদ্রোহীর বীভৎস মুখাবয়বের দিকে তাকিয়েই প্রশ্নটা করেছিলেন তিনি। তার মানে, তিনি জানতেন প্রায় অমানুষ আকৃতি এই মানুষটাই যাবে এহেন অসম্ভব অভিযানে।
বিদ্রোহী দাঁড়িয়ে থেকেই বলল, আমি যাব।
তাহলে চলে যান। মোহান্তর পাইলটের নাম আসগর। তাকে আমার এই ভিজিটিং কার্ড দেবেন। সে আপনার জন্য জান দেবে। ও কে।
বিদ্রোহী আর বসলই না। বেরিয়ে গেল।
কৌতুক নাচানো চোখে বিদ্রোহীর অপসৃয়মান মেশিন বডির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল কাকোই। বসল খাটের ওপর। টেনে বসাল চম্পককে।
বললে ক্যাপ্টেন ডিক্সিটকে, আমাদের হিল্লে কী করলেন?
বেশ বাংলা বলেন তো আপনি? পাইপে ফের কামড় দিয়ে বললেন ক্যাপ্টেন ডিক্সিট, আমি অবশ্য ছটা ল্যাংগুয়েজে চোস্ত। বেঙ্গলি ইজ সুইটেস্ট অফ অল। শুনুন মশাইরা, ডলফিন নামে একটা মোটর বোটের গতিবিধি আমার চোখে ভালো ঠেকেনি। গত তিন সপ্তাহে রোজই গভীর জলে পাড়ি দিয়েছে মাছ ধরার জন্য। ভোররাতে বেরোয়, মাঝদুপুরে ফেরে। তখন থাকে মাঝিমাল্লা। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে একটি দিন বোটের মালিক ছুটি নেয়। সেদিন আর ভোররাতে বেরোয় না। গভীর রাতে যায় গভীর জলে। যায় দুজনে, ফিরেও আসে দুজনে। অতএব মাই ডিয়ার জেন্টেলমেন, আপনারা দুজনেই ডলফিনে উঠে লুকিয়ে থাকুন মাছ রাখবার পেটিতে। জেটিতে ভাসছে, মালিকের নাম হাফিজজি। মাথার চুল সব সাদা। কিন্তু গা-গতরে বেশ জোয়ান। সামলেসুমলে চলবেন। এগোেন। বেগতিক দেখলে ফিরে আসবেন। এই ঘরটাই আমাদের ঘাঁটি। আপনারা ফিরে না আসা পর্যন্ত। আর ওই যে অদ্ভুত লোকটা, কী যেন ওর নাম? বিদ্রোহী বর্মন। মনে হয় না উনি দ্বীপে ঢুকে একলা ফিরতে পারবেন, যদি ফেরেন, নিয়ে আসবেন এখানে। আর কিছু জানার আছে? নেই? তাহলে নমস্কার।
আসগর লোকটাকে রামগড়ুরের ছানা বললেই চলে। রোদেজলে ঝামা চেহারা। শুকনো প্যাকটি। তবে হাত-পা-কাঁধের দড়ি দড়ি মাসল দেখলে সম্ভ্রম হয়। এ লোক প্রয়োজনে হাতি টেনে রাখতে পারে। বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশ হবে। গোড়ালি থেকে জিনস-এর প্যান্ট গুটিয়ে খালি গায়ে দাঁড়িয়েছিল মোহান্তর সামনে। বিদ্রোহী এগিয়ে আসতেই তার সঙ্গে কথা না বলে তক্তা বেয়ে উঠে গেল ডেকে। পেছন-পেছন উঠে গেল বিদ্রোহী। দুজনেই ঢুকল কেবিন রুমে। সেখানে একটা চার্ট পাতা ছিল। একটা দ্বীপের ওপর আঙুল রেখে বললে আসগর, এই একটা দ্বীপের একটা দিক জল থেকে সোজা ওপরে উঠে গেছে। পাথরের দেওয়াল, খাঁজ কাটা। কাছে যাইনি, দূর থেকে দেখেছি। এদিক দিয়ে দ্বীপে ওঠা যাবে না। আমাদের যেতে হবে অনেক ঘুরে। এখন বেরোনো দরকার।
