হিতোহিশোর ইন্টারেস্ট দেখার জন্য আমাকে অ্যাপয়েন্ট করা হয়েছে জাপান থেকে। কারণ, এ কোম্পানির ক্যাশ রিজার্ভে আছে এক হাজার কোটি টাকা।
অবাক হচ্ছেন? হবেন না, জাপান যখন কোনও দেশে টাকা লগ্নী করতে চায়, সেই দেশে বাণিজ্যের ফসল ফলাতে চায়, তখন টাকা ঢালে আর জমায় এইভাবে।
ক্যাশ রিজার্ভের কথা অ্যানুয়াল রিপোর্টে খুব কায়দা করে সংক্ষেপে লেখা আছে। এমনিতেই এ কোম্পানির সুনাম যথেষ্ট। বাজারে শেয়ার পড়তে পায় না। অথচ গোপনে কোম্পানির অফিসেই শেয়ার কিনে নেওয়া হচ্ছে শুনে আমার টনক নড়েছিল।
আমি লোক পাঠিয়েছিলাম। অফিস ক্লার্ক জানিয়েছিল, কোম্পানি উঠে যাওয়ার আপাতত কোনও সম্ভাবনা নেই। তবে অঘটন ঘটে যেতে পারে, এরকম একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাই কোম্পানি গুটিয়ে নিচ্ছে কাকপক্ষীকে না জানিয়ে, যেন পাবলিকের ক্ষতি না হয়।
ঠিক এর পরেই পরপর তিনজন ডিরেক্টরই নিরুদ্দেশ হয়েছেন। প্রথম জন রাম ঘোষ। পরের সপ্তাহে সুজন দেশাই টেলিফোন করেন হিতাহিশোকে। বাড়িতে আসতে বলেন। খুব জরুরি কথা আছে। আর ফিরে আসেননি। মিসেস হিতোহিশো আমাকে খবর দেন। আমি যাই সুজন দেশাইয়ের জোকার ভিলায়। গিয়ে দেখি বাড়ি খাঁ-খাঁ করছে। জিনিসপত্র লণ্ডভণ্ড। উনি একা থাকতেন ভিলায়। ফ্যামিলি থাকে বম্বেতে। এ বাড়ির সব দেখাশুনা করে যে লোকটা, তাকে অর্ধমৃত অবস্থায় দেখতে পাই গ্যারেজে। গাড়ির মধ্যে হাত-পা বাঁধা অবস্থায়।
তার কাছেই শুনলাম, হিতেহিশো যাননি ও বাড়িতে। চারজন ষণ্ডা প্রকৃতি লোক সুজন দেশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে আসে তার আগের দিন। চৌকাঠ পেরিয়েই প্রথমেই গৃহরক্ষীকে নাকে ক্লোরোফর্ম ভিজানো রুমাল চেপে ধরে অজ্ঞান করতে যায়। বাগে আনতে না পেরে চলে মারপিট। তারপর আর কিছু মনে নেই তার।
সুজন দেশাই বাড়িতে নেই শুনে হতভম্ব হয়ে যায় সে।
বুঝলাম, কিডন্যাপ করা হয়েছে তাকে।
চলে আসার আগে গোটা বাড়ি সার্চ করেছিলাম। বাইরের ঘরে একটা কাগজ পেলাম। এই ঘরেই তুমুল হাতাহাতি হয়েছিল চার গুন্ডার সঙ্গে ভিলা রক্ষকের।
কাগজে লেখা ছিল শুধু দুটি শব্দ–SEND INSULIN।
.
বন্দির জন্য দরদ?
চাঁদের দিকে তাকিয়ে কাকোই-এর কথা শুনছিল বিদ্রোহী। শেষ শব্দ দুটো শোনবার সঙ্গে-সঙ্গে দুহাতে রগ টিপে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল চাঁদের দিকেই। ওর ওই কালো শক্ত চোখে এরকম বিমূঢ় চাহনি এর আগে দেখেনি ইন্দ্রনাথ। ইশারায় চম্পক, কাকোই আর প্রেমচাঁদকে মুখ বন্ধ রাখতে বলে চেয়ে রইল বিদ্রোহীর চোখের দিকে।
যেন দম আটকে বসে রইল বিদ্রোহী। মিনিট কয়েক, তারপর পাঁজর খালি করা নিশ্বাস ফেলে চাইল ইন্দ্রনাথের দিকে। ফিরে আসছে চোখের স্বাভাবিক চাহনি।
মৃদুকণ্ঠে বললে ইন্দ্রনাথ, শুকতারার মেসেজ?
হ্যাঁ। ততোধিক মৃদু কণ্ঠে জবাব দিল বিদ্রোহী।
কী বলছে?
কথা কও, কথা কও। হে বিদ্রোহী, কথা নেই কেন তোমার কণ্ঠেঃ তুমি কি বোবা? তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ না? তোমার কাছে মুক্তিপণের দাবি নিয়ে কেউ কি যায়নি? বিশ লক্ষ টাকা দিতে তুমি পেছপা নও আমি জানি। কিন্তু সাড়া দিচ্ছ না কেন? নাকি বীরত্ব ফলাতে যাচ্ছ? বউ আগে না বীরত্ব আগে? ওরা এখনও আমার সতীত্ব বজায় রেখেছে। তবে ওদের একজনের চোখে আমি লোভের আগুন দেখেছি। হাজার হোক, তোমার শুকতারা তো সুন্দরী? বিশ্বসুন্দরী না হলেও সুন্দরী। সুন্দরীদের জীবন সুন্দর হয় না। যদি না স্বামী পাশে থাকে। আমার জীবনও বোধহয় অসুন্দর হতে চলেছে। লাবণ্যবৃদ্ধির কসমেটিক্স তো অনেক কিনে দিয়েছিলে, কাল হয়েছিল সেইটাই। লোকটা এখুনি এসেছিল, দরজা খোলার আগে কাকে যেন বলল–ফোনে বলে দাও, ইনসুলিন পাঠাক নেক্সট প্লেনে। তারপরেই ঘরে ঢুকে শুধু বলে গেল বেশি সময় আর দেওয়া যাবে না। বিদ্রোহী, ইনসুলিন কি জিনিস? ড্রাগ? আমার আত্মরক্ষার শক্তি কেড়ে নেওয়ার ওষুধ? বিদ্রোহী…বিদ্রোহী..আমার ভয় করছে…বড় ভয় করছে…
ছাদের কেউ আর এখন কথা বলছে না। গোটা পৃথিবীটা যেন মরে গেছে। জীবন্ত শুধু বুঝি ওই চাঁদ। যার অতিপ্রাকৃত প্রভাবে সাগরপার থেকে ভেসে আসছে শুকতারার হাহাকার।
থমথমে নৈঃশব্দ্য ভঙ্গ করল প্রেমচাঁদ।
বললে নিবিড় ভরাট গলায়, আরও একটা খবর এনেছি।
জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় সবাই।
কাল আবার প্লেনটা যাচ্ছে পোর্টব্লেয়ার।
যেন একটা হ্যাঁচকা টান লাগল বিদ্রোহীর শিরদাঁড়ায়। চাঁদের কিরণ দ্বিগুণ তেজে প্রতিফলিত হল চোখের কালো অঙ্গার থেকে।
বলে গেল প্রেমচাঁদ, যথারীতি আটজন প্যাসেঞ্জার যাচ্ছে।
সাতজন পুরুষ, একজন মহিলা? মেশিনের মতো বলে গেল বিদ্রোহী।
হ্যাঁ। দুটো সিট খালি আছে।
একটায় যাব আমি, খুব আস্তে বললে ইন্দ্রনাথ। চম্পক, ডগলাস প্লেনের আন্ডারক্যারেজের স্কেচ এঁকে দেখাতে পারবে?
চাঁদের আলোয় ম্যাপ দেখা সম্ভব হল না। নেমে আসতে হল একতলার ঘরে। ম্যাপ বিছিয়ে বসল প্রেমচাঁদ। আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অগুন্তি দ্বীপগুলোর কোনটি আকাশ পথে দমদম এয়ারপোর্ট থেকে সবচেয়ে কাছে, জলপথে পোর্টব্লেয়ার থেকেও কাছে এমন একটি দ্বীপ আগে থেকেই চিহ্নিত করে রেখেছিল প্রেম। এখন সেখানে আঙুল রেখে বলল, এই সেই দ্বীপ, যার কাছাকাছি আকাশ থেকে প্যারাসুটে করে কাউকে ফেলে দিলে, পোর্টব্লেয়ার থেকে স্পিড বোট নিয়ে তাকে উদ্ধার করে এই দ্বীপে তোলা যায়।
