তাহলেই দ্যাখ, প্রাইভেট ডিটেকটিভদের চেয়ে প্রফেশন্যাল ডিটেকটিভরা কত ফাস্ট ইন অ্যাকশন।
সেটা জানা আছে বলেই তোকে এ লাইনে এনেছি। লেগওয়ার্ক করা প্রাইভেট ব্রেনে সম্ভব নয়, তারা করবে ব্রেনওয়ার্ক।
বিদ্রোহী নীরস গলায় বললে, ঝগড়া পরে হবে। মিঃ মালহোত্র, খবরটা পেলেন কী করে?
বিলবার আগে আপনার জিনিস দুটো নিন, ইন্দ্রনাথ অর্ডার দিয়েছিল আপনার ফরমাস মাফিক। ঠিক আছে?
সতরঞ্চির ওপর দুটো চামড়ার খাপ রাখল প্রেমচাঁদ। লম্বাটে খাপ। কুচকুচে কালো চামড়া দিয়ে তৈরি।
দুটো খাপেরই একদিকে সূচ্যগ্র, আর একদিক খোলা। খোলা দিকে বেরিয়ে রয়েছে একটা করে আংটা।
প্রেমচাঁদের চোখে চোখ রেখে বিদ্রোহী বললে, জোগাড় করলেন কোত্থেকে?
মুচকি হেসে প্রেমচাঁদ বললে, ওটা আমার ট্রেড সিক্রেট। তবে আপনাকে বলতে বাধা নেই। তার আগে একটা প্রশ্ন, এ দুটোর ব্যবহার শিখেছিলেন কোথায়?
টোকিওতে। আমার গুরুর নাম মিৎসুবিসি।
আমিও তাই আঁচ করেছিলাম। এই শহরেই আছেন জাপানিজ সিক্রেট এজেন্ট। দুটো জিনিসই পেয়েছি তার কাছ থেকে।
দাম?
নেয়নি। তিনিও যে মিৎসুবিসির শিষ্য। তাই একটা অনুরোধ করেছেন। এ জিনিস যেন যত্রতত্র ব্যবহার করা না হয়। আর যদি নিতান্তই প্রয়োজন হয় তাকে তলব করলে তিনি আপনার পাশে এসে দাঁড়াবেন।
নাম কী তার?
প্রেমচাঁদ তক্ষুনি কোনও জবাব দিল না। দূরে চাঁদের আলোয় ধোওয়া গাছপালার দিকে তাকিয়ে রইল। অর্থব্যঞ্জক চাহনি।
চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বললে, তাঁকে দেখতে চান?
মুখে দু-আঙুল পুরে শিস দিয়েছিল প্রেমচাঁদ। কোকিলের কুহু কুহু রব ভেসে গেছিল গাছপালার ওপর দিয়ে নাচতে নাচতে দূরে বহুদূরে। সেই আওয়াজ মিলোতে-না-মিলোতেই কুহু কুহু রব জেগেছিল জঙ্গলের মধ্যে। তারপরেই দেখা গেল তাঁকে।
খর্বকায় শ্বেতবসন এক মূর্তি এগিয়ে আসছে সরু ফিতের মতন পথের ওপর দিয়ে।
নাম তার কাকোই। বয়স চল্লিশ। কিন্তু তিরিশের বেশি মনে হয় না। কদমছাট চুল নিতান্তই শ্রীহীন। হলদে পার্চমেন্টের মতন মুখের চামড়া। ছোট-ছোট দু-চোখ, কিন্তু কৌতুকময়। হাসিতেও কৌতুক। এ জগৎটা যেন বড়ই রঙ্গময় তার কাছে।
তিনি ছাদে উঠে এসে সতরঞ্চির ওপর পাতলেন একটা কাঠের পাটাতন। যা দিয়ে বাড়ি তৈরি চলছে। আর একটা পাটাতন খাড়া করে রাখলেন চিলেকোঠার গায়ে। খাপ থেকে আংটায় টান দিয়ে বের করলেন দুটি জিনিস, দুটোতেই চাঁদের আলো লেগে ঠিকরে গেল।
প্রথমটি একটি ছোরা। দ্বিতীয়টি একটি রিভলভার।
দুটোই অতিশয় অদ্ভুত ধরনের।
এ ছোরার বাঁট নেই। পুরোটাই ফলা। মাঝে মোটা, দু প্রান্তে সরু। দুদিকেই ধার। একপ্রান্তে ছোট্ট একটা আংটা এক বর্গ ইঞ্চি ধাতুর ফলকে আটকানো। হাতল বলা চলে এই ফলকটাকেই। খুব জোর দু-আঙুলে ধরা যায়।
বিদ্রোহী তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে চেপে ধরল ছোরার ছুঁচোলো দিকটা। ঝোলাল শূন্য সতরঞ্চিতে পাতা কাঠের তক্তার তিনফুট উঁচুতে। আংটা লাগানো ধাতুর ফলকটা রইল নীচের দিকে। বললে, এখন ছোরা ছেড়ে দিলে কী হওয়া উচিত। আংটার দিকটা একটু ভারী বলে ওই দিকটাই তক্তায় পড়বে তাই তো? দেখুন কী হয়।
তর্জনী আর বুড়ো আঙুল শিথিল করতেই খসে পড়ল আজব ছোরা। কিন্তু ওই তিন ফুটের মধ্যেই পরিষ্কার একটা ডিগবাজি খেয়ে ছুঁচোলো দিকটা নামিয়ে আনল নিচে, ঘাত করে গেঁথে গেল কাঠের তক্তায়।
শুকনো গলায় বিদ্রোহী বললে, আবিষ্কারটা গুরু মিৎসুবিসির। ছোরার সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি এমন জায়গায় রাখা হয়েছে যে ছুঁচোলো দিকটা শূন্যে ঘুরে গিয়ে সবসময় থাকবে সামনের দিকে। দেখুন।
ফলকের দিকটা দু-আঙুলে ধরে কাঠ থেকে টেনে তুলে নিয়েই দূরের চিলেকোঠার খাড়া করা কাঠের তক্তার দিকে ঘুরিয়ে ছুঁড়ে দিল বিদ্রোহী। চাঁদের আলোয় ঝিলিক তুলে ছোরা ধেয়ে গেল সামনে, ছুঁচোলো দিকটা গেঁথে গেল তক্তায়। যদিও মরা আলোয় তক্তা দেখা যাচ্ছিল না ভালোভাবে।
নীরবে দ্বিতীয় বস্তুটা তুলে নিল বিদ্রোহী। লম্বাটে চোঙা বললেই চলে। মাঝখানটা স্ফীত। এইখানে আঙুল রেখে বিদ্রোহী বললে, চারটে বুলেট আছে এখানে। সামনে রয়েছে সাইলেন্সার। হাতল বেঁকিয়ে রাখার দরকার হয় না। কারণ, এটা বাঁধা থাকে এখানে। বলে ডান পায়ের প্যান্টের তলা গুটিয়ে নিয়ে পায়ের ডিমের ঠিক তলার খাঁজে চামড়ার খাপটা সেঁটে দিল স্ট্র্যাপ টেনে। চোঙা রিভলভার গুঁজে রাখল তার মধ্যে। বললে, হাতলের পেছনের এই বোতামে বাঁ-পায়ের চাপ দিলে গুলি ছুটে যাবে নিঃশব্দে। দুহাত ব্যবহারের দরকার হবে না। বলতে-বলতে উঠে গিয়ে তক্তা থেকে ছোরা টেনে নিয়ে ফিরে এর সতরঞ্চির ওপর। খাপে ঢুকিয়ে বেঁধে নিল বাঁ-পায়ের ডিমের খাঁজে। বললে অবিচলিত কণ্ঠে, মিঃ মালহোত্র, গত তিন সপ্তাহে তিনজন শেয়ার জায়ান্ট নিখোঁজ হয়েছে বলছিলেন। খবরটা পেলেন কী করে, সে প্রশ্নের উত্তরটা এখনও দেননি। এখন দেবেন?
প্রেমচাঁদ তাকাল কাকোই-এর দিকে। কাকোই বলে গেল পরিষ্কার কথ্য বাংলায়।
ইন্ডো-নিপ্পন কোম্পানির শেয়ার চড়া দামেই বিকিকিনি হচ্ছিল খোলা বাজারে। তা সত্ত্বেও খবর এল আমার কাছে, খুব গোপনে শেয়ার কেনা হচ্ছে কোম্পানি অফিসেই।
এ কোম্পানির তিন ডিরেক্টরের মধ্যে একজন জাপানের এক শিল্পপতি হিতোহিশো। বাকি দুজনের একজন সুজন দেশাই। তৃতীয় জন রাম ঘোষ।
