ফুলবাবু, মানে ইন্দ্রনাথ রুদ্র বললে, ঢুকেছিলে? ট্র্যাপোের দেখে এলে?
আছে। কার্পেট ঢাকা। এককোণ ধরে টানলেই উঠে আসে। তবে ওরা প্লেনের নাম্বার পালটেছে। ছিল S-402 এখন হয়েছে S-404।
ট্যাক্সি ড্রাইভার এতক্ষণ ছিল বাইরে, এগিয়ে আসছে ট্যাক্সির দিকে। তাড়াতাড়ি বললে ইন্দ্রনাথ, তোমাকে ঢুকতে দেখেছে হ্যাঁঙারে?
দুজন আটকাতে এসেছিল–শুইয়ে এসেছি।
কেষ্টপুরের প্রায় গ্রাম্য অঞ্চলের একটা একতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল ট্যাক্সি। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকে সোজা ছাদে উঠে গেল দুজনে। সেখানে ডেক চেয়ারে বসে বিদ্রোহী বর্মন চেয়ে আছে চাঁদের দিকে। আবিষ্ট চাহনি।
ইন্দ্রনাথ বললে, মেসেজ আসছে শুকতারার কাছ থেকে?
আস্তে বললে বিদ্রোহী, মাঝে-মাঝে–তেমন জোরাল নয়…ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক..শুধু জিগ্যেস করে যাচ্ছে…আমার জবাব শুনতে পাচ্ছে না..বেঁচে আছে…নিশ্চয় বেঁচে আছে…
বিদ্রোহী, নরম কিন্তু দৃঢ় স্বরে বললে ইন্দ্রনাথ, এবার কাজের কথা হোক।
চোখ নামিয়ে বিদ্রোহী বললে, হোক।
প্লেনে ট্র্যাপডোর আছে।
গুড।
আমরা যখন নতুন তৈরি এই বাড়িতে পালিয়ে লুকিয়ে আছি, আমাদের খোঁজ ওরা পাবে না। কিন্তু ওদের খোঁজ আমি নেবই, কাল সকালে।
নিন। কিন্তু শুকতারাকে ওরা ট্র্যাপডোর দিয়ে ফেলে দিল কেন?
শুকতারা কিছু দেখে ফেলেছিল বলে।
কী দেখেছিল?
অনুমান করে বলতে পারি।
বলুন।
অতবড় ট্রাঙ্কে মানুষের বডি পুরে নিয়ে যাওয়া যায়। সেই রকমই কারও বডি নিয়ে গিয়ে যখন ফেলা হচ্ছে, শুকতারা তা দেখে ফেলেছিল, ট্র্যাপোর ছিল ওর পেছনে, কিন্তু ঘাড় ঘুরিয়েছিল নিশ্চয়।
বটে।
শুকতারাকেও তখন ট্র্যাপডোর দিয়ে বেরিয়ে যেতে হয়, নিশ্চয় প্যারাসুট দিয়েছিল, নইলে বেঁচে থাকবে কেন, নিশ্চয় নীচে বঙ্গোপসাগরের জল থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়েছিল, কিন্তু কেন? সুন্দরী বলে?
কয়লাচক্ষু জ্বলে উঠল বিদ্রোহীর। পরক্ষণেই দু-রগ টিপে মাথা কেঁকাল সামনে। এখন সে নিঝুম।
ইন্দ্রনাথ আর চম্পক দাঁড়িয়ে দুপাশে। শুধু চেয়ে আছে।
আস্তে আস্তে রগ থেকে হাত নামাল বিদ্রোহী। বললে, মেসেজ আসছে। একতরফা, কিন্তু আপনার প্রশ্নের জবাব এর মধ্যে রয়েছে।
নির্নিমেষে চেয়ে রইল ইন্দ্রনাথ।
বলে গেল বিদ্রোহী, মুক্তিপণ চাইছে…শুকতারা বলেছিল, আমি সুন্দরী। কিন্তু আমার ধর্ম নষ্ট করো না…করলে তোমরা কেউ পার পাবে না…বরং মুক্তিপণ চাও…আমার স্বামীর অনেক টাকা… একথা হয়েছিল প্লেনে…তাই আমাকে জলে ফেলে দেয়নি…নানাভাবে কবজায় আনবার চেষ্টা করছে।
শুকতারা কোথায় আছে, তা কি বলছে?
না, শুধু কাঁদছে। বলছে, যেখানেই থাকো, ওদের টাকা দাও, ছাড়িয়ে নিয়ে যাও দ্বীপ থেকে। দ্বীপ?
আন্দামান নিকোবরের অসংখ্য দ্বীপেই ওদের ঘাঁটি। সে হদিশ আমি বের করে নেব। তার আগে জানতে চাই, ট্রাঙ্কে করে পাচার করছে কাদের?
কালকেই জানবেন।
হ্যাঁ। এ শহর থেকে গত তিন সপ্তাহে অন্তত তিনজন নামী-দামি লোক নিরুদ্দেশ হয়েছে, তাদের নামধাম জানা কি খুব কঠিন?
ডাঙাতেই অনেক জায়গা আছে, পাঁকের তলায় বডি পুঁতে দিলেই তো হত। এত খরচ করে, প্লেন ভাড়া করে সমুদ্রে ফেলছে কেন?
জ্যান্ত কয়েদ করে রাখবে বলে।
প্যারাসুট দিয়ে নামিয়ে দিচ্ছে? যেমন দিয়েছে শুকতারাকে?
নিশ্চয়। জিল থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে মোটরবোট?
আমারও তাই বিশ্বাস।
পোর্টব্লেয়ারে নেমে ট্রাঙ্ক পাচার করছে না কেন?
ছোট জায়গা। অনেকেরই চোখে পড়তে পারে। তার চেয়ে বড় কারণ যেখানে সমুদ্রে ফেলছে, সেখান থেকে দ্বীপের ঘাঁটি নিশ্চয় খুব কাছে। পোর্টব্লেয়ার থেকে দূরে। অসংখ্য দ্বীপ ও অঞ্চলে। সব দ্বীপে সভ্য মানুষ আজও নামতে চায় না। কে আসছে?
চাঁদনি রাতে দূরের গাছপালার ঝাপসা অন্ধকার থেকে ভটভট করে বেরিয়ে এল একটা থ্রি পয়েন্ট ফাইভ বুলেট মোটর সাইকেল। সরু মেঠোপথটা সাদা ফিতের মতন ঝকমক করছে। লাল মোটর বাইকের নিকেল করা বনেটও ঝকঝক করছে। চালকের মাথার রূপোলি স্পেস হেলমেটও ঝকঝক করছে।
প্রেমচাঁদ মালহোত্র আসছে। ইন্দ্রনাথের হিরে চোখ ঝকমকিয়ে উঠল চাঁদের আলোয়।
ঠিক এই সময় শুকতারা গুনগুন করে উঠল বিদ্রোহীর ব্রেনের মধ্যে–আন্দামান…আন্দামান…শুধু এইটুকু শুনলাম…দ্বীপের নামটা বলতে চাইছে না। ওরা তোমাকে জ্যান্ত ধরতে চায়…গুলি করে মেরে ফেলার নাটক করে গেছে…সত্যিই তোমাকে গুলি করতে চায় না…কিন্তু তুমি কথা বলছ না কেন? বিদ্রোহী..ও বিদ্রোহী…আমার কথা কি শুনতে পাচ্ছ না?…বৃথাই কি বকে যাচ্ছি আমি?
.
ইনসুলিন রহস্য
পাঞ্জাব-তনয় প্রেমৰ্চাদের পেল্লায় সিলভার হেলমেট এখন ছাদের ওপর পাতা সতরঞ্চিতে ঝকমক করছে। চারজনে বসে মুখোমুখি। প্রেমাদের মাথা উঠে রয়েছে সবার ওপরে। কতখানি ঢ্যাঙা, তা বোঝা যাচ্ছে।
বিরাগ মুখে ইন্দ্রনাথ বললে, প্রেম, তোর এখানে আসা উচিত হয়নি।
ইন্দ্র, বললে প্রেমচাঁদ, খবর আছে। টেলিফোন নেই বলে চলে এলাম।
কী খবর?
শেয়ার মার্কেট নিয়ে কি কাণ্ড চলছে গোটা ইন্ডিয়ার, তা তুই জানিস?
জানবার চেষ্টা করি না। তবুও চোখে পড়ে, কাগজে।
গত তিন সপ্তাহে তিনজন শেয়ার জায়ান্ট নিখোঁজ হয়েছে।
মাই গড! সোজা হয়ে গেল ইন্দ্রনাথের মেরুদণ্ড, এইরকমই একটা খবর বের করার জন্য কাল সকালেই যাচ্ছিলাম তোর কাছে।
