নীরব হল বিদ্রোহী। সামান্য হাঁফাচ্ছে। উত্তেজনায়।
শান্ত স্বরে ইন্দ্রনাথ বললে, কাজের কথা হোক।
বাধা দিয়ে বললে বিদ্রোহী, আরও একটা মোক্ষম অস্ত্র হাতে এসেছে আমার। ব্রেনে চোট মেরেছিল এরা। মুখের মাসল কন্ট্রোলের নার্ভ আর কাজ করছে না। দেখুন।
বলতে-বলতে টেবিলের ওপর থেকে তুললে ছোট্ট আয়না। স্ট্যান্ডের ওপর রেখে ঘুরিয়ে দিল নিজের দিকে। আঙুল দিয়ে টিপে ঠোঁটের দুপাশ ঝুলিয়ে দিল নীচের দিকে। চোখের তলদেশ তুলে দিল ওপর দিকে। নরুনচেরা চোখে সে এখন চাইনিজ ম্যান।
থ হয়ে চেয়ে রইল চম্পক।
তোফা। বললে ইন্দ্রনাথ, এমনটা কখনও দেখিনি।
আঙুল চালিয়ে মুখের আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনল বিদ্রোহী। বললে ইন্দ্রনাথকে, এবার শুরু করতে পারেন কাজের কথা।
ইন্দ্রনাথ বললে, চম্পক, এই যে প্লেনটা থেকে বিদ্রোহীর বউ উবে গেল, এই প্লেন সম্বন্ধে বিশেষ কোনও খবর তোমার জানা আছে? ফ্লাইংপ্লেনে কোথাও কোনও চোরা দরজা আছে কি? যে দরজা খুলে মিসেস বর্মনকে ঠেলে ফেলে দেওয়া যায় বাইরে?
সশব্দে নিশ্বাস নিয়ে চুপ করে রইল বিদ্রোহী। সম্ভাবনাটা তার মাথায় আসেনি। ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে। যদি চোরা দরজা থাকে, শুকতারা তাহলে বেঁচে নেই।
সোজা সামনের দিকে সেকেন্ড কয়েক চেয়ে থেকে যেন দম নিল চম্পক সাহা। বলে গেল থেমে থেমে, এই প্লেনের মালিক হচ্ছে বে অফ বেঙ্গল এয়ারলাইন্স। এদের সব প্লেনই সেকেন্ড হ্যান্ড। এই প্লেনটাকে কিনেছিল ইউনাইটেড স্টেটস কোস্ট সারভিস থেকে। ম্যাপ তৈরির কাজে লাগত প্লেনটা। বে অফ বেঙ্গল এয়ারলাইন্স এই প্লেনেই গত বছর ফুড ড্রপ করেছিল বন্যার সময়। গভর্নমেন্ট ভাড়া নিয়েছিল।
সিধে হয়ে বসল ইন্দ্রনাথ। ম্যাপ আঁকার প্লেন ফুড ড্রপ করা হয়েছে। তাহলে তো মেঝেতে চোরা দরজা আছে।
সূত্র নম্বর ওয়ান, বিড়বিড় করে বলে গেল বিদ্রোহী, তদন্ত হল শুরু। তার আগে আমার দুটো জিনিস দরকার। ওয়াইল্ড কান্ট্রিতে কাজে লেগেছিল, কুবের হওয়ার পর আর অ্যাডভেঞ্চারের দরকার হবে না বলে রাখিনি। ইন্দ্রনাথ রুদ্র, জোগাড় করে দেবেন জিনিস দুটো?
কী জিনিস? বললে ইন্দ্রনাথ।
নাম বলে গেল বিদ্রোহী।
.
ট্যাপডোর প্লেন
চম্পক ভার নিল চোরা দরজা দেখে আসার। এয়ারফিল্ডে তার যাতায়াত কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করবে না।
কিন্তু কর্মস্থলে পা দিয়েই শুনল, তার চাকরি নেই।
কথা বাড়াল চম্পক। যাদের ঠেঙিয়েছে, তাদের লোক তাকেও এয়ারফিল্ডে ঢুকতে দিতে চায় না। সেটা যখন বোঝাই গেল, তখন এবার ঘুরপথে কাজ শুরু করা যাক।
চম্পক সাহা জানে, কীভাবে চেহারা পালটাতে হয়।
দমদম এয়ারপোর্টের এজেন্ট দুই চোখে বিপুল কৌতূহল জাগিয়ে চেয়ে রইল আগন্তুকের দিকে, লোকটাকে কোথায় যেন দেখেছে, এমনি একটা আবছা ধারণা মনের মধ্যে জাগছে বটে, কিন্তু বুঝে উঠতে পারছে না। সে কে হতে পারে।
আগন্তুক কমসেকম ছফুট লম্বা। কঁধ দুটো ভয়ানক চওড়া। কলেবরও বিপুল। পরনে স্যুট, মাথায় চওড়া কিনারা টুপি, চোখে হালকা নীল কাঁচের চশমা। দেখে তো মনে হচ্ছে ফরেন ট্যুরিস্ট, হিপিটিপিও হতে পারে।
লম্বা-লম্বা পা ফেলে লোকটা যখন সামনে দিয়ে হেঁটে গেল তখনই চক্ষু বিস্ফারিত হয়েছে। এজেন্টের।
এতবড় পায়ের পাতা আছে শুধু একজনের হাঁটার ধরনও সিনেমার চার্লি চ্যাপলিনের মতন।
আস্তে-আস্তে খুপরি ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছে, এমন সময় মুগার পাঞ্জাবি আর চুনোট করা ধুতি পরা সেই ফুলবাবুটি এসে দাঁড়াল সামনে। মুখে ভাসছে দ্যাখন হাসি। বললে মধুক্ষরা গলায়, আরে বসুন, বসুন। আপনার সঙ্গে কথা আছে।
কী কথা? তাড়াতাড়ি বলুন।
বলছি, বলছি। একটা একশো টাকার নোট এগিয়ে দেয় ফুলবাবুটি, যেখানকার যা দস্তুর… বুঝলেন কিনা…পান খাওয়ার জন্য রাখুন…পোর্টব্লেয়ার যেতে চাই…গোটা একটা প্লেন নিয়ে…কীরকম প্লেন জানেন?…যার মেঝেতে ট্র্যাপোর আছে।
ট্রাপডোর?
আরে ওই হল গিয়ে…চোরা দরজা…চোরা দরজা..বুঝলেন কিনা? আন্দামানে একটা দ্বীপে আগ্নেয়গিরি আছে না? ওখানকার ছবি তুলব আকাশ থেকে…আজ্ঞে…আমি প্রোডিউসারও বটে, ডিরেক্টরও বটে…ডকুমেন্টারি তুলছি..ইন্ডিয়ার ওই তো সবেধন নীলমণি একটাই আগ্নেয়গিরি…খাসা হবে ডকুমেন্টারিটা।
এরকম প্লেন, এরকম প্লেন, দ্বিধায় পড়ে এজেন্ট, আছে বলে তো আমার জানা নেই।
নেই? তাহলে আর জ্বালাব না..না-না, ও নোটটা আপনার…আমার তো নয়…আচ্ছা আসি।
তালঢ্যাঙা বৃষস্কন্ধ লোকটা চার্লি চ্যাপলিনের মতন হেঁটে বেরিয়ে গেল সামনে দিয়ে। ফুলবাবু মিটিমিটি হেসে গেল পেছন পেছন।
দেখেশুনে একটু ভাবল এজেন্ট। চাইল হাতের নোটখানার দিকে। বসে পড়ল আস্তে আস্তে। ক্ষেত্র বিশেষে মুখে চাবি দিয়ে থাকাই সঙ্গত।
.
বাইরে দাঁড়ানো ট্যাক্সিতে একদিক দিয়ে উঠল বৃষস্কন্ধ, আর একদিক দিয়ে ফুলবাবু। প্রথম জন মাথার হ্যাট খুলতেই বেরিয়ে পড়ল বিটকেল দুটো কান আর চাপ-চাপ নিগ্রো চুল। কাঁধের স্প্রিং-এ চাপ দিতেই সোঁ-সোঁ করে হাওয়া বেরিয়ে গেল যেন বেলুন থেকে। চুপসে ছোট্ট হয়ে গেল কঁধ। মেকি কঁধ। হাওয়া দিয়ে ফোলানো থাকে। চশমা খুলতেই বেরিয়ে এল খয়েরি চোখ।
শক্ত মুখে বললে ফুলবাবুকে, ভাগ্যিস এজেন্টকে আটকে রেখেছিলেন, নইলে হ্যাঁঙারেই ঢুকতে পারতাম না।
