.
লকআপে তিনজনকে ঢুকিয়ে দিয়ে রেডরোজ হোটেলের ডাইনিং রুমে এল ইন্দ্রনাথ, বিদ্রোহীকে নিয়ে। টেলিফোন এল প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে।
তিন আততায়ীকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে থানা থেকে, খুবই উঁচু মহলের নির্দেশে–সে মহলের নাম বলা যাবে না।
এই তিনজনকেও যে আর সশরীরে দেখা যাবে না তাও নিমেষে বুঝল ইন্দ্রনাথ। লম্বকর্ণ উৎকর্ণ হয়ে বসেছিল কোণের টেবিলে।
.
নয়া স্যাঙাৎ
নাম তার চম্পক সাহা। ছফুট ঢ্যাঙা। মাথায় চাপ-চাপ চুল। নিগ্রোদের চুলের মতন ঘন আর কোঁচকানো। চোখ দুটো ঈষৎ খয়েরি। দু-হাতের মুঠো মুগুরের সঙ্গে তুলনীয়। পায়ের পাতা বিরাট, চার্লি চ্যাপলিন বেঁচে থাকলে অবাক হতেন। এমনকী তার হাঁটার ঢঙও চার্লির মতন। এটা অবশ্য বিমানক্ষেত্রেই লক্ষ করেছিল ইন্দ্রনাথ আর বিদ্রোহী।
টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে সে। বিদ্রোহীর মুখ শিহরণ জাগায় সব মানুষেরই চোখে। গত কদিন ধরে তা লক্ষ করে আসছে বিদ্রোহী। কিন্তু এই লোকটা শিহরতি হয়নি। বিলক্ষণ নির্বিকার, ভয় বস্তুটা যেন তার ধাতে নেই। ব্রণ কলঙ্কিত মুখ আর রেখাজটিল ললাট অবিকৃত, খয়েরি চোখ পাথরের চোখ বলে মনে হচ্ছে। দুর্জয়, মানুষ, নিঃসন্দেহে।
শুষ্ক কণ্ঠে বললে বিদ্রোহী, স্ত্রীকে নিয়ে প্লেনে উঠতে আমাকে দেখেছিলে?
দেখেছিলাম।
ইন্দ্রনাথ চেয়েছিল চম্পক সাহার ডানহাতের আঙুলের গাঁটের দিকে। চামড়া উঠে গেছে সেখান থেকে। কপালেও কালসিটের দাগ।
সদ্য মারপিটের চিহ্ন মনে হচ্ছে? প্রশ্নটা ইন্দ্রনাথের।
আজ্ঞে হ্যাঁ। এয়ারপোর্টে আপনাদের সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম তখন তা লক্ষ করা হয়েছিল। বেরোতেই দুজন ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুজনকেই ফেলে এসেছি রাস্তায়।
ধক করে ওঠে বিদ্রোহীর চোখ। কিন্তু মজা নাচছে ইন্দ্রনাথের চোখে। বললে, টাকার হরির লুঠ চলছে দেখছি। টাকা দিয়ে বলানো হচ্ছে, প্লেনে ওঠেনি বিদ্রোহীর স্ত্রী।
ঠিক, কঠোর কণ্ঠে বললে চম্পক।
রাস্তায় শুইয়ে না দিয়ে দুজনকে পুলিশের হাতে দিলে না কেন?
পুলিশের সঙ্গে খেলা শেষ করে এসেছি বলে।
জেল খেটেছিলে?
না। কিন্তু পুলিশের চরিত্র জেনে গেছি।
কীভাবে?
এয়ারপোর্টে আমি লেবারার, তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু এক সময় চাঁদনিচকে ছিল আমার ওষুধের দোকান। ঘরে ছিল বউ আর দুই ছেলে। ভালোই ছিলাম। একদিন ওরা এল। মাসে চারশো টাকা চাইল। ওদের দলের মেম্বারশিপ ফী। নইলে বোমা মেরে দোকান উড়িয়ে দেবে। আমি তাদের মেরে তাড়ালাম।
চোখ জ্বলছে চম্পকের। খয়েরি মশাল। কথা আটকে গেছে।
নরম গলায় ইন্দ্রনাথ বললে, তারপর?
দোকানের পিছনেই থাকতাম বউ বেটা নিয়ে। ভোর ছটায় বোমা ফাটল। দোকান উড়ে গেল। বউ আর বেটা দুটো কড়িকাঠ চাপা পড়ল। সেই থেকে আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। খেটে খাই। মস্তান দেখলেই ঠ্যাঙাই। পুলিশের হাতে দিয়ে কী করব?
বিদ্রোহী নির্বাক। এতদিনে পেয়েছে মনের মতন দোসর। পুলিশের কাছে যেতে চায় না চম্পক, চায় না বিদ্রোহী।
অনড় রইল অধর আর ওষ্ঠ, কথাগুলো বেরিয়ে এল দাঁতের ফাঁক দিয়ে, মনে হয় আমরা তোমার কাজে লাগব। তুমিও আমাদের কাজে লাগবে। রাজি?
হ্যাঁ।
ইন্দ্রনাথ বললে, তাহলে বলো, ম্যাডাম উধাও হল কেন? কার পাকা ধানে মই দিয়েছিল। আমার এই বন্ধুটি? কী সেই চক্রান্ত? জোর করে প্লেনে উঠেছিল স্বামী-স্ত্রী। স্ত্রীকে লোপাট করা হল কেন? এত লোককে টাকা খাইয়ে মিথ্যে বলাচ্ছে কারা? এয়ারপোর্টে কাদের লোক অ্যাটাক করেছিল তোমাকে? এখানে আসবার সময় তিনজন অ্যাটাক করেছিল আমাদেরও। এরাই বা কাদের লোক?
নি*গ্রো চুলে আঙুল চালনা করে চম্পক বললে, জানলে বলতাম।
কিছুই জানো না?
অন্য ব্যাপার জানি। গত তিনটে সপ্তাহে একটাই দল বিশেষ ওই প্লেনটায় চেপে পোর্টব্লেয়ার গেছে। প্রতিবার প্লেনের সব সিট বুক করেছে, কিন্তু দুটো-তিনটে সিট খালি রেখেছে। ট্রাঙ্ক নিয়ে সচরাচর কেউ প্লেনে ওঠে না, কিন্তু এই দলটার কাছে থাকে একটা ট্রাঙ্ক।
এতক্ষণ কথা হচ্ছিল বসে। চম্পকের কথা শেষ হতেই শুধু উঠে দাঁড়াল বিদ্রোহী। পেশি ফুলে উঠেছে বাঘের পেশির মতন। হাত নাড়াতেই কিলবিল করে উঠল কাঁধের দলা পাকানো মাসল। সাদা মড়ার মুখে দুটো গর্তে জ্বলছে কালো আগুন।
ট্রাঙ্ক। টেল কম্পার্টমেন্টে আমিও দেখেছি। শুকতারাকে সেই ট্রাঙ্কে ঢুকিয়ে পোর্টব্লেয়ার নিয়ে যায়নি তো?
বলেই বসে পড়ল আস্তে-আস্তে। ডালা খুলে উলটানো ছিল–সুতরাং বউকে তার মধ্যে পুরে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা টিকছে না।
আদৌ বেঁচে আছে কি শুকতারা?
গলার স্বর বুজে আসে কথা বলতে গিয়ে, হয়তো মেরেই ফেলেছে। তাই যদি হয় এদের কারও রক্ষে নেই।
তিনজনের পক্ষে তা কি সম্ভব? খয়েরি চোখ শক্ত করে বলে গেল চম্পক, ওদের দল ভারী, অনেক টাকা, অনেক উঁচু মহল হাতের মুঠোয়।
দেখা যাক।
লড়বেন কীসের জোরে?
টাকার জোরে। অভাব নেই আমার। সঙ্গে আছেন ইনি ইন্দ্রনাথকে দেখিয়ে বলে, আর তুমি। পারব না?
আরও জোর দরকার।
চম্পক, মড়ার মুখোশের মতন অচঞ্চল মুখে প্রত্যেকটা শব্দের মধ্যে বুঝি বোমা ফাটিয়ে গেল বিদ্রোহী, আমি টাকা রোজগার করেছি ইন্ডিয়ার বাইরে। এমন সব জায়গা যেখানে সভ্যদেশের কানুন খাটে না। মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষেছি দিনেরাতে সমানে। যাদের সঙ্গে টক্কর দিয়েছি তাদের কাছে বড় বড় শহরের বড় বড় মস্তানরা নিতান্তই শিশু। বরফের দেশ মেরু অঞ্চলে খনি আবিষ্কার করেছি, ব্রেজিল থেকে পান্না নিয়ে এসেছি, মালয়ের জঙ্গল থেকে জাহাজ ভরতি জানোয়ার এনে চড়া দামে ক্লিভল্যান্ড চিড়িয়াখানায় বেচেছি, তেইশ দিন ধরে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর নৌ-বিদ্রোহ ঠেকিয়েছি। বেশি কথার মানুষ আমি নই। কাজে দেখাই আমি কী করতে পারি। এই এঁর মতন। ইন্দ্রনাথকে দেখিয়ে–একে দেখে যেমন বোঝা যায় না দরকার হলে উনি চিতাবাঘ হতে পারেন, আমার পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি হাইট দেখেও তোমার ছফুট বডি ধারণাও করতে পারবে না কী রয়েছে। আমার মধ্যে।
