ঠোঁটের কোণ দিয়ে কথাগুলো বলে গেল লম্বকর্ণ–পা না থামিয়ে।
দূরত্ব বজায় রেখে রুদ্ধশ্বাসে বললে বিদ্রোহী, তোমাকে…
পেটে অনেক কথা জমা আছে। বলতে চাই। এখান থেকে বেরোলেই।
হোটেল রেডরোজ। ডাইনিং রুম। চাপা গলায় বলে গেল বিদ্রোহী। যে হোটেলে উঠেছে এটা সে হোটেল নয়। ইন্দ্রনাথ ওকে হাত ধরে টানছে বাইরের দিকে। উত্তেজনায় দুজনের কেউই লক্ষ করল না তিন মূর্তিকে।
অনুসরণ করছে বেশ তফাতে থেকে। তিনজনের একজন বগলের নীচে ঝোলানো রিভলভারে হাত দিয়েছিল। অপর দুজন অলস নয়নে বিমান ক্ষেত্রের দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে ঘাড় নাড়ল নীরবে। গুলি বর্ষণের জায়গা এটা নয়।
.
ট্যাক্সি ছুটছে হোটেলের দিকে। জানলা দিয়ে উদাস চোখে বাইরে তাকিয়ে ইন্দ্রনাথ। বিদ্রোহীর ধমনীতে উত্তাল হয়েছে রুধির। এই বোধহয় শেষ সুযোগ। লম্বকর্ণের আচরণে প্রতিভাত হয়েছে। সততা। শুকতারার সন্ধান সে জানে।
ট্যাক্সির ডানপাশ দিয়ে বেগে বেরিয়ে গেল একটা সবুজ ফিয়াট। ব্রেক টিপে ধরেছে ট্যাক্সি ড্রাইভার। ঘূণ্যৰ্মান চাকার আচমকা গতিরোধের আর্তনাদ সচকিত করেছে ইন্দ্রনাথকে।
দেখল, ট্যাক্সি এসে পড়েছে জনবিরল রাস্তায়। দুপাশে ঝোঁপ আর জঙ্গল। দূরে-দূরে ফ্যাক্টরির শেড।
গ্রীন ফিয়াট ড্যাশ করেছে সামনে দিয়ে ট্যাক্সিকে এনে ফেলেছে রাস্তার পাশে। রিফ্লেক্স অ্যাকশন চনমনে করে তুলেছে বিদ্রোহীকে। হাত চলে গেছে লুকোনো রিভলভারের সন্ধানে।
কিন্তু রিভলভার নেই সেখানে। পোর্টব্লেয়ার স্যানিটারিয়ামে বের করে নেওয়া হয়েছে। ইন্দ্রনাথ নিজেও নিরস্ত্র।
তাই শুধু বললে চাপা গর্জনে, মারো ধাক্কা।
আসন্ন সংঘাত বিমূঢ় করে তুলেছিল ট্যাক্সি ড্রাইভারকে। তাই বোধহয় শুনতে পায়নি ইন্দ্রনাথের আদেশ। আরও মন্থরগতি হয় ট্যাক্সি।
পাঞ্জাবি পরা নবনীত কোমল মানুষটার ডান হাত ধেয়ে যায়, ইস্পাত কঠিন আঙুল দিয়ে খামচে ধরে ড্রাইভারের কণ্ঠদেশ। ঝটকান দিয়ে মুণ্ডু সুদ্ধ ঘাড় বেঁকিয়ে আনে পেছন দিকে।
ব্রেক থেকে পা পিছলে যায় ড্রাইভারের। লাফিয়ে উঠে ট্যাক্সি ধেয়ে যায় সামনে।
গ্রিন ফিয়াটের তিন আরোহীর হাতে উঠে এসেছে রিভলভার। দুই গাড়ির মধ্যে ব্যবধান দ্রুত কমছে দেখেই ট্যাক্সি ড্রাইভার স্টিয়ারিং কাটিয়েছে–ডাইনে সংঘাত এড়ানোর শেষ চেষ্টা। রুখে দেওয়ার চেষ্টায় ঘুরেছে গ্রিন ফিয়াটও। কঁকুনিতে লক্ষ ঠিক রাখতে পারল না দুই বন্দুকবাজ। শূন্যে ঠিকরে গেল দুটো বুলেট।
সবুজ ফিয়াটের ওপর আছড়ে পড়ল ট্যাক্সি।
কলিশনের শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই ট্যাক্সির দুদিকের দরজা খুলে ছিটকে গেছিল ইন্দ্রনাথ আর বিদ্রোহী। লাফিয়ে এগিয়ে গেছিল সবুজ ফিয়াটের দিকে। প্রথমজনের চোখ এখন হীরক-উজ্জ্বল। দ্বিতীয় জনের চোখ তুহিন শীতল–প্রতিহিংসা স্পৃহায় নির্মম। শুকতারা অন্তর্ধানের সূত্র এখন প্রায় হাতের মুঠোর মধ্যে। ঠোঁটের কোণে ভাসছে বরফকঠিন হাসি।
ধাক্কা খেয়ে ট্যাক্সি থেকে দূরে ছিটকে গিয়ে সবুজ ফিয়াট ডানদিকের দুই চাকার ওপর প্রায় উলটে যাচ্ছিল। মুহূর্তের মধ্যে সিধে হয়ে গেল চার চাকার ওপর। ভেতরের প্রাণী তিনজন ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার আগেই গাড়ির দুপাশে আবির্ভূত হল ইন্দ্রনাথ আর বিদ্রোহী।
প্ৰথমজন যেন ননী দিয়ে গড়া দ্বিতীয় জনের উচ্চতা মোটে পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি। কিন্তু নিরীহদর্শন এই দুটি কলেবরের মধ্যে যে এত শক্তি লুকিয়ে আছে, তা কি জানত ফিয়াটের আরোহী তিনজন?
জানত কি পরিমাণে স্বল্প হলেও কিছু কিছু পেশিতে সঞ্চিত থাকে রুদ্রশক্তি? বিজ্ঞান তার ব্যাখ্যা জোগাতে অক্ষম। পেশির এই প্রচ্ছন্ন ভয়াল শক্তি অবিশ্বাস্য প্রলয় ঘটিয়ে দিতে পারে সময় এলেই।
এখনও তাই ঘটল। মাত্র দশ সেকেন্ডের মধ্যে।
বাঁ-হাতে সবুজ ফিয়াটের দরজা খুলে ধরে রেখে ডানহাতটাকে বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে দিল বিদ্রোহী। মাত্র দশ ইঞ্চি দূরে ছিল একজনের চোয়াল। বর্শার ডগায় লাগানো যেন লোহার বল আছড়ে পড়ল সেখানে। গুলিবিদ্ধ মানুষের মতনই লোকটা ঠিকরে গেল পাশের সঙ্গীর ওপর।
ড্রাইভার ততক্ষণে রিভলভার তাগ করেছে বিদ্রোহীর দিকে। কিন্তু খেয়াল করেনি খুলে গেছে পাশের দরজা। কবজি খামচে ধরেছে ইন্দ্রনাথ। শুধু খামচে ধরেছে। আর একটু মোচড় মেরেছে। কাতরে উঠেও ট্রিগার টিপেছিল ড্রাইভার। কিন্তু গুলি বেরিয়ে গেল ফিয়াটের ছাদ ফুটো করে। একহাতেই আরও মোচড় দিচ্ছে ইন্দ্রনাথ। বিকট চেঁচিয়ে উঠে সিটে লুটিয়ে পড়েছে ড্রাইভার।
পেছনের সিটে সঙ্গীর দেহভার কাটিয়ে সবে ধাতস্থ হয়েছে তৃতীয় মূর্তি। গুলিবর্ষণ অসম্ভব বুঝেই কাত হয়ে থেকেও লাথি ছুঁড়েছিল বিদ্রোহীর দিকে।
ভুল করেছিল সেইখানেই।
খপ করে ডান হাতে তার পায়ের ডিম চেপে ধরল বিদ্রোহী। তারপর মোচড় আর মোচড়। আতীব্র যন্ত্রণা উঠে গেল স্নায়ুকেন্দ্রে। রক্ত জল করা চিৎকার শুনেও মোচড়ানি অব্যাহত রাখল বিদ্রোহী, যতক্ষণ না জ্ঞান লোপ পায়।
দশ সেকেন্ডের মধ্যে সব স্তদ্ধ। পাংশুমুখে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ট্যাক্সি ড্রাইভার। ভয়ার্ত চোখে তাকাচ্ছে ইন্দ্রনাথ আর বিদ্রোহীর দিকে। দুজনেরই শ্বাসপ্রশ্বাসে ছন্দপতন ঘটেনি।
স্বাভাবিক গলায় বললে প্রথম জন, চলো থানায়।
