দমদম এয়ারপোর্ট।
দুজনে?
আজ্ঞে না।
তা হলে?
উনি তো একা গেলেন। বিদ্রোহীকে তর্জনী সঙ্কেতে দেখায় ট্যাক্সি ড্রইভার ম্যাডাম যাননি।
বিদ্রোহীর সাঁড়াশি আঙুল নিশপিশিয়ে উঠেছে লক্ষ করেই তার কাঁধে হাত রেখে ট্যাক্সি ড্রাইভারকে মন্ত্রমন্থর কণ্ঠে বললে ইন্দ্রনাথ, ঠিক আছে। আসতে পারো।
.
লোকটাকে ছেড়ে দিলেন আপনি–আমি কিন্তু মার্ক করে রাখলাম। ইস্পাত গলায় বললে বিদ্রোহী বর্মন ছুটন্ত ট্যাক্সির মধ্যে।
ট্যাক্সি উড়ে যাচ্ছে দমদম এয়ারপোর্টের দিকে।
ইন্দ্রনাথ নীরব। স্বপ্নিল চাহনিতে সুদূরের প্ল্যান।
অ্যাকশন শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই।
দু-জনের কেউই খেয়াল করেনি সবুজ ফিয়াটটাকে। আসছে ট্যাক্সির পেছন পেছন–অনেক দূরে থেকে ফলো করে চলেছে। ফিয়াটের মধ্যে তিন জোড়া চোখ নিবদ্ধ সামনের ধাবমান ট্যাক্সির দিকে।
দমদম এয়ারপোর্ট।
অভিজাত আকৃতির ধুতি পাঞ্জাবি পরা অতীব সুদর্শন বাঙালিবাবুকে এগিয়ে আসতে দেখে টলেনি এজেন্ট। কিন্তু মুখের পেশি কেঁপে উঠল নাতিদীর্ঘ মানুষটাকে ঠিক পাশেই যন্ত্রদানবের মতন হেঁটে আসতে দেখে। ধাতু দিয়ে গড়া নাকি? মুখভাব অতীব ভয়াল। গনগনে চোখে চেয়ে আছে। এজেন্টের দিকে।
জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে শুনে গেল বাঙালিবাবুর প্রথম প্রশ্ন, চেয়ে রইল কিন্তু জাগুয়ার আকৃতির মানুষটার দিকে। দুলছে ডাইনে-বাঁয়ে। লাফিয়ে পড়ার আগের মুভমেন্ট।
বিদ্রোহীকে দেখিয়েই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়েছিল ইন্দ্রনাথ, এঁকে চিনতে পারছেন?
ঢোঁক গিলে বললে এজেন্ট, ইয়েস স্যার।
একমাস আগে এসেছিলেন এখানে। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী। যাচ্ছিলেন পোর্টব্লেয়ার। প্লেনে সিট চেয়েছিলেন দুটো।
ম্যালেরিয়া রুগির জ্বর প্রকল্প শুরু হয়ে গেছে এজেন্টের সারা শরীরে। অতি কষ্টে অকম্পিত রাখল কণ্ঠস্বর, উনি তো একা এসেছিলেন।
স্ত্রী ছিলেন না সঙ্গে?
না। পোর্টব্লেয়ার থেকে ওয়ারলেসে জানতে চেয়েছিলেন একই কথা, যা তখন বলেছি, এখনও তাই বলছি।
একাই এসেছিলেন?
সাদা হয়ে গেল এজেন্টের মুখ। গলার স্বর এবার কাঁপছে, আজ্ঞে হ্যাঁ।
পলকহীন চোখে শুধু চেয়ে রইল বিদ্রোহী। ভয়ানক একটা চক্রান্তের গন্ধ আর চেপে রাখা যাচ্ছে না। এজেন্টের চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। শুধু বিদ্রোহী নয়, শুকতারাকেও সে দেখেছে। অথচ ভীষণ ভয়ে তা স্বীকার করতে সাহস পাচ্ছে না। এই ভয় গ্রাস করেছিল ট্যাক্সি ড্রাইভারকেও। সত্যি স্বীকার করতে পারেনি।
এরা দুজনেই জানে খলনায়কদের।
কিন্তু ইন্দ্রনাথ কথা বলতে দিচ্ছে না বিদ্রোহীকে। হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল এয়ারফিল্ডে। নিরক্ত মুখে ওদের দিকে চেয়ে রইল এজেন্ট।
সবুজ ফিয়াট থেকে তিন ষণ্ডামার্কা ওদের পেছন নিয়ে ঢুকেছিল ভেতরে। ওরা এগিয়ে যেতেই এজেন্টের খুপরিতে গিয়ে ঢুকল তিনজনে।
শোচনীয় হয়ে ওঠে এজেন্টের মুখচ্ছবি।
তিন মূর্তির একজন বললে, মুখ খুললে কী ঘটবে মনে আছে?
গলা ভেঙে গেল এজেন্টের–আ-আমি তো মুখ খুলিনি। সাফ বলে দিয়েছি একা এসেছিলেন, কেউ ছিল না সঙ্গে।
দ্বিতীয় ব্যক্তির রিভলভারের চোঙাটা চেপে বসে এজেন্টের তলপেটে, কাকে ভয় বেশি? একে না ওই দু-জনকে?
শিউরে উঠে বললে এজেন্ট, ধুতি পাঞ্জাবিকে তো ভয় পাইনি, পাশের লোকটার মুখটা ওরকম কেন? রাইফেলের চাইতেও ভয়ঙ্কর।
.
সবচেয়ে কাছের হ্যাঁঙারে পৌঁছে গেছে ইন্দ্রনাথ আর বিদ্রোহী। ওদের এগিয়ে আসতে দেখেছে একদল পুরুষ। কৌতূহলী চোখে চেয়ে আছে বিদ্রোহীর মরা মুখের পানে–অস্বস্তি বোধ করছে মশাল চক্ষু দেখে।
প্রশ্নবাণ নিক্ষিপ্ত হল, বিদ্রোহীর অনড় অধরোষ্ঠের ফাঁক দিয়ে। অধর নড়ছে না, ওষ্ঠ নড়ছে না–শব্দগুলো শুধু বেরিয়ে আসছে মুখবিবর থেকে।
ভয়াবহ সেই মুখচ্ছবি দেখে কম্পিত কলেবর প্রত্যেকেই।
শুধোয় বিদ্রোহী, ঠিক একমাস আগের ঘটনা। প্লেনে উঠেছিলাম পোর্টব্লেয়ার যাব বলে। সঙ্গে ছিল আমার স্ত্রী। কেউ কি মনে করতে পারছেন?
ধীরে-ধীরে মাথা নাড়ে প্রত্যেকেই। মনে করতে অক্ষম প্রত্যেকেই।
যেন কুয়াশার সঙ্গে লড়ছে বিদ্রোহী। আঘাতে-আঘাতে পর্যদস্ত করেও টলানো যাচ্ছে না কাউকে। এক্ষেত্রে এরা অবশ্য অসত্য বলছে বলে মনে হচ্ছে না। অশুভ সেইদিনে এদের কাউকে দেখেনি বিদ্রোহী।
হ্যাঙার ছেড়ে সরে আসে ইন্দ্রনাথ। টেনে নিয়ে আসে পরাজিত বিদ্রোহীকে। লম্বকর্ণ এক পুরুষকে দেখেই ইন্দ্রনাথ কৌতূহলী হয়েছে। লোকটা দূরে দাঁড়িয়েছিল এতক্ষণ। অন্যদিকে পাশ ফিরে থাকলেও তার নজর যে ওদের দুজনের দিকেই, তা চোখের কোণ দিয়ে বুঝেছে ইন্দ্রনাথ।
লোকটার কান দুটো অদ্ভুত লম্বা। নৌকোর পালের মতন যেন পতপত করে উড়ছে দুপাশে। বেজায় পুরু গদান। ষাঁড়ের গানের সঙ্গে তুলনীয়। ইন্দ্রনাথ যে চোখের কোণ দিয়ে তাকে লক্ষ করছে, সে নিজেও যেন তা বুঝেছে। হঠাৎ তাই পায়ে-পায়ে সরে গেল তফাতে।
ইঙ্গিতটা সুস্পষ্ট। যেন পেছন ধরতে বলছে।
বিদ্রোহী এতক্ষণে তাকে নজরে এনেছে। স্মৃতির বিদ্যুৎ ঝলসে দিয়ে গেল মনের গগনকে। লোকটাকে চেনে সে। দেখেছে এই এয়ারফিল্ডেই।
লম্বকর্ণ হাঁটছিল ধীরপদে। ওরা দুজন হনহনিয়ে নাগাল ধরে ফেলতেই ঘাড় না ফিরিয়ে, সামনে চোখ রেখে, সে বললে, পেছনে আসছেন কেন জানি। কিন্তু এখানে কোনও প্রশ্ন নয়। হ্যাঁঙার থেকে দূরে সরে যাচ্ছি এই কারণেই। এখানে ধুলোরও কান আছে। কোন হোটেলে উঠেছেন?
